T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় ডরোথী দাশ বিশ্বাস

আশ্বিনের শারদপ্রাতে

ঝুম বর্ষা শুরু হলো, আকাশ কালো মেঘে ঢাকা, সারাদিন ঝিরঝির ঝমঝম একটানা বৃষ্টি, সন্ধ্যাবেলা বৃষ্টি থামলেও আকাশের মুখ ভার। এ কি শরত? এ যে বর্ষাকাল না হয়ে যায় না। চারিদিকে জল থই থই, মাঠ ঘাট জলে জলময়। করলা, বুড়ি তিস্তা ব্রীজের নীচ দিয়ে বয়ে চলা কলাইনদীতে বেশ জল দেখলাম। বিলে কচুরীপানার ভিড়ের মাঝে ছোট্ট ছোট্ট শালুক পাতার সহাবস্থান। কচুরীপানার নীল ফুল ফুটে রয়েছে সর্বত্র, তবে শালুক ফুলের দেখা নেই। একগুচ্ছ পুষ্ট কাশফুল জলে ভিজে ভারি হয়ে নুয়ে পড়েছে জলার ধারে। বহির্বাড়ির উঠোনে পোয়ালপুঞ্জী ভিজে জবজবে, একটা চালার নীচে দাঁড়িয়ে তিন চারটে গরু বৃষ্টিতে ভিজে আড়ষ্ট। বিকেলে দেখি, জলার ধারে একটা বক নিশ্চুপ হয়ে এদিক ওদিক দেখছে। আরও কিছু দূরে আরও একটা বক। একটা বাজে পোড়া পত্রবিহীন গাছের প্রত্যেকটি ডালে প্রচুর পাখি- কিন্তু তাদের ডাক শোনা যাচ্ছে না। সিসের মতো রঙ ধরেছে আকাশ। এ বর্ষাকাল না হয়ে যায় না। অথচ আজ ভোরেই মহালয়া- ভাবা যায়? শরতের চেনা রূপ কোথায়!!! “আনন্দধারা বহিছে ভুবনে”- মনে হয়? “বাজলো তোমার আলোর বেণু”? মনে পড়ে সেই ছোটবেলার কথা। মহালয়ার আগেই দাদু তাঁর ১৯৩৪ – সালে কেনা হিজ মাস্টার্স ভয়েস্ কোম্পানীর গ্রামোফোনে বাজাতেন- ধীরেন দাসের কন্ঠে “দি টুইন”- কোম্পানীর রেকর্ড “আজি শঙ্খে শঙ্খে মঙ্গল গাও জননী এসেছে দ্বারে…” যার অপর পিঠে ছিলো, “আজ আগমনীর আবাহনে, কি সুর উঠেছে বেজে…” সাথে শব্দবাজীর একটানা শব্দ— হ্যাঁ, এই শব্দবাজী পোড়ানো- এটা জলপাইগুড়ির নিজস্ব ঐতিহ্য।

যুগ যুগ ধরে জলপাইগুড়ি শহরের বৈশিষ্ট্য যা পরিলক্ষিত হয় তা হলো এখানে মহালয়া তিথিতে প্রচুর শব্দবাজী পোড়ানো হয়। কিভাবে এর প্রচলন হলো তার কারণ খুঁজতে গিয়ে যা প্রকাশ তা হলো বহু যুগ আগে এই তিথিতে তিস্তার ভয়াল রূপকে স্তবে স্তুতিতে শান্ত করার লক্ষ্যে তিস্তাবুড়ির পুজো হতো। তখন নদীর দু’পাড়ে বিস্তীর্ণ অঞ্চল অরণ্যসঙ্কুল ছিলো বলে শেয়াল, বাঘ প্রভৃতি বন্য পশুর আক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে মানুষ শব্দবাজী পোড়াতো। এ কথা প্রসঙ্গে বলি— ১৯৬৮ সালে তিস্তার বাঁধ ভেঙে ভয়াবহ বন্যা এই আশ্বিনেই ঘটেছিলো। সেদিন ছিলো ৪ঠা অক্টোবর, লক্ষ্মীপুজোর আগের রাত।

যাই হোক— শৈশবের কথা বলি— আমি আর বোন খুব ছোট তখন। মহালয়ার আগে রাত্রে জেগে পড়াশুনায় ব্যস্ত থাকা, মনে আগমনীর আগমনে চোরা আনন্দস্রোত বয়ে চলা। চোখে কি আর ঘুমের ঘোর লাগত না? লাগত বৈ কি। তবে রাত ভোর হলেই মহালয়া তো, তাই জাগতে হবে মনে করেই জেগে থাকা। আজ বড় বেশী করে মনে পড়ে ফেলে আসা সেই দিনগুলির কথা। ভাড়া বাড়ি, এক ঘরে দুটো খাট পাতা। পিতল দিয়ে সুদৃশ্য কাজ করা লোহার স্প্রীং-এর শৌখিন খাট একটা – সেটা দাদুর। আর একটা সেগুন কাঠের বড়সড় খাটে আমি, দিদা, মাসী ও বুনু। ভাই মামণি বাবার সাথে থাকতো অন্য ঘরে। আমরা যে ঘরে থাকতাম সে ঘরে একটা ছোট্ট কাঠের আলমারী ছিলো। তাতে দাদুর চিঁড়া, সাবু, চিনি, গুড়, কদমা, বাতাসা, কলা- থাকতো। রাতের খাবার খাওয়া হলে মাটির রান্নাঘর থেকে ধোওয়া কাঁসার বাসনপত্র এনে এই শোবার ঘরের খাটের নীচে রাখা হতো। ফুটোনো খাবার জল থাকতো ঘরে। সিমেন্ট করা মেঝেতে আসন পেতে বসে লন্ঠনের আলোয় পড়তাম আমি আর বোন। রাত জাগলে খিদে পাবেই, তাই আলমারী থেকে সাবু বের করে ধুয়ে ভিজিয়ে রাখতাম। মহালয়া শুরুর আগেই মামণি- ও উঠে পড়তেন, স্নান করে সেই পুণ্যলগ্নে শঙ্খ বাজাতেন। আমরাও চিনি কলা দিয়ে সাবু মেখে খেয়ে নিতাম দু’জনে। নিজের আবিষ্কার ও নিজ হাতে তৈরী এই খাওয়াই যেন তখন অমৃত মনে হতো। পড়তে পড়তে রাত যত বাড়ত তত ভোরের শিশির ভেজা সবুজ ঘাস, মাটির ওপর টুপটুপ ঝরে পড়া শেফালি, তিস্তা স্পারের কাশ, রাজবাড়ির পদ্মদীঘির পদ্ম যেন ইশারায় ডাকতো, মন আনচান করে উঠতো, ওদিকে রেডিওতে “আশ্বিণের শারদ প্রাতে… বাজলো তোমার আলোর বেনু … জাগো, তুমি জাগো …” আর এদিকে সাথিদের আগে থেকে বলে রাখা নির্ধারিত সময়ে টুক করে বেরিয়ে পড়া। জবা, সবিতা, টুলু, আমি, বুনু- এই পাঁচজনের দল এক সাথে হৈ হৈ করতে করতে আমাদের খেলার স্থান লাইফ ইন্সিওরেন্স বিল্ডিং পার হয়ে শান্তিপাড়া বাসস্ট্যান্ড ছাড়িয়ে মাসকলাই বাড়ি হনুমানজীর মন্দিরকে বাঁ- এ রেখে ডাইনে শ্মশানকালীবাড়ি ছাড়িয়ে করলাব্রীজে ওঠা। এর একদিকে মহাশ্মশান, অপর দিকে বিসর্জনের ঘাট। বিসর্জনের ঘাট যেদিকে সেদিকে জলে নেমে তর্পণ করত অনেকেই। ব্রীজের ওপর যত বোম পটকা ফাটাতো সবাই কারণ শব্দের সাথে সাথে প্রতিধ্বনি মিশে শব্দবাজীর শব্দ আরো জোরালো হতো যে। বুনুর হাত ধরে ভয়ে ভয়ে সেই ব্রীজ দ্রুত পার হতাম আমি।করলাব্রীজ পার হয়ে সোজা রাণী অশ্রুমতী টি.বি. হাসপাতাল, পলিটেকনিক ইন্সটিটিউশন, গভঃ ইঞ্জীনীয়ারিং কলেজ – একে একে পার হয়ে ৩১- নং জাতীয় সড়কের পশ্চিম দিকে দেবী চৌধুরাণী মন্দিরের গা ছমছমে নির্জন পরিবেশে এসে পড়তাম। সেই সময়ে পণ্যবাহী বড়ো বড়ো ট্রাকের মিছিল, তাদের ভারে মাটির কম্পন অনুভব করতাম। ভোরের অস্পষ্ট আলোয় দূরে কাঞ্চনজঙ্ঘার শীর্ষ ফুটে উঠতে দেখা যেত। পুবদিক ক্রমে লাল হয়ে উঠতো, যথাসময়ে সূর্য্য উঠে যেতো। কোন কোন বছর ভোরে বৃষ্টি হতো না যে তা নয়। কখনো দেখেছি শারদীয়া আকাশ বর্ষার মেঘভারে নুয়ে পড়তো। অবশেষে ভোর হতে একটানা ঝিরঝির বৃষ্টিতে সমস্ত পরিকল্পনা ভেস্তে যেতো। বৃষ্টি ধরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকতাম। ঈশ্বর হয় তো আমাদের মনের কথা শুনতেন। ধরেও যেতো বৃষ্টি। তারপরেই বেরিয়ে পড়া। বৃষ্টির জলে ভেজা পিচরাস্তা জুড়ে বাজী পটকার লাল সোনালী কাগজ এঁটে থাকতো। বাতাসে ছড়িয়ে থাকতো পোড়া বারুদের গন্ধ।

মহালয়ার পর থেকে দেবীপক্ষ শুরু হয়- শুনতাম। এই কথা ঘিরে শিশুমনে অজস্র প্রশ্ন উঁকি দিত। শিশু হলে কি হবে, যথেষ্ট বুঝদার ছিলাম বলেই হয়তো প্রশ্নগুলো বড়দের করিনি বা পরিস্থিতিও হয়তো সহায়ক ছিলো না। মনে হতো— দেবীপক্ষ শুরু মানে এখন বোধ হয় দেবীরাই শুধু পূজিতা হবেন, যুক্তি সাজাতাম— দুর্গা, লক্ষ্মী, কালী— এরপর? পিতৃপক্ষ তবে কবে থেকে শুরু? কার্ত্তিক পুজো দিয়েই কি? কোথায় গিয়ে শেষ? বিশ্বকর্মা পুজোয় গিয়ে শেষ? উত্তর আর মেলেনা। এই তো সেদিন জানলাম— মধুপূর্ণিমার দিন থেকে মহালয়া— এই এক পক্ষকাল পিতৃপক্ষ আর মহালয়া থেকে কোজাগরী পূর্ণিমা- এই এক পক্ষকাল দেবীপক্ষ। জানার কি আর বয়স লাগে? লাগে শুধু উৎসাহ আর নিরন্তর খোঁজ। অবশ্যই পড়াশুনোর মাধ্যমে। শারীরিক পরিশ্রম নয়, জ্ঞানলাভ হলো মানসিক শ্রমের দ্বারা অর্জিত সম্পদ। মনের ক্ষুধা মেটে এতে। শরীরচর্চা বাধাপ্রাপ্ত হলেও পড়াশুনোর চর্চা আজীবন চালিয়ে যেতেই হয়। জ্ঞানের চর্চায় পথ হাঁটতে হয়- সাগর থেকে পাহাড়ে, নদীর উৎস থেকে মোহানায়—

মহালয়া তিথির মাহাত্ম্য কি তখন সঠিকভাবে বুঝতাম? শুধু জানতাম এই তিথিতে তর্পণ করা হয় অর্থাৎ পূর্বপুরুষদের তিল জল দান করা হয়। তর্পণ সম্পর্কিত শাস্ত্রজ্ঞানরহিত শৈশব জানত না ত্রিদেব কারা, সৃষ্টি রক্ষা সংহার-এর দেবতা ব্রহ্মা বিষ্ণু মহেশ্বরকে স্মরণ করার কথা তো পরের কথা। কত পরে জেনেছি আকাশ যেখানে উদার, বাতাস যেখানে স্থির, ভোরের ম্লান আলোয় আনত এমন স্তব্ধ চরাচরে তিল যব আর কুশ নিয়ে স্রোতহীন স্বচ্ছ নির্মল জলে নেমে মন্ত্রোচ্চারণের ধ্যানমগ্নতায় পিতৃকুল ও মাতৃকুলের তর্পণের আগে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে ভক্তিভরে মহর্ষি কপিল, মহর্ষি সনক, সপ্ত ঋষি, যমরাজ-কে স্মরণ করে প্রণাম জানাতে হয়। তর্পণের শেষ ধাপে সূর্যপ্রণাম অর্থাৎ এক অপার্থিব স্মরণসেতু ধরে ভোরের নিথর আলো থেকে সূর্যের তেজঃপুঞ্জে ফেরা, প্রাণহীনতা থেকে প্রাণে… এটাই উপলব্ধির বিকাশ… তবে ঐ বয়সেই ভাবতাম, মানুষ বাজী পুড়িয়ে আনন্দ প্রকাশ করার মাধ্যমে কত টাকাই না নষ্ট করে। কতটা বাস্তববাদী হলে, কঠোর পরিস্থিতির শিকার হলে কল্পনাবিলাসী শিশুমন এমনটা ভাবতে পারে, তাই ভাবি। একেই কি বলে বয়সের অনুপাতে পরিণত মন? পেরিয়ে এসেছি সেসব দিন, কালো সাদা বা রঙীন—-

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।