T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় পাভেল আমান

বাঙালিত্ব ও সামাজিকতার জাগরণ

দিনকে দিন যেন সমাজটা পাল্টে যাচ্ছে। মনুষ্যত্ব বিবেক চেতনা সহিষ্ণুতা পরোপকারিতা সব যেন কর্পূরের মত প্রতিটি মনন থেকে উবে যাচ্ছে। একদা যে সমাজে আমরা মিলেমিশে হেসে খেলে বিপদে-আপদে পাশে থেকে হাসি কান্নায় একে অপরের সাথে মতবিনিময়ে দুঃখ যন্ত্রনাতাকে ভাগ করে নিয়ে সোহার্দ্য সম্প্রীতি সংহতি সমন্বয়ের চিন্তাভাবনা ও আদর্শকে আঁকড়ে ধরে বাস করতাম সেই সমাজ যেন আজ বদলে গেছে। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বাড় বাড়ন্ত বিদ্বেষ বিভাজন সর্বোপরি বিষবাষ্পে জর্জরিত বর্তমান মানব সমাজ। ভেবে শিউরে উঠি যখন সংবাদপত্র পাতা উল্টালে চোখে পড়ে রাস্তায় দুর্ঘটনা গ্রস্ত মানুষকে দেখেও না দেখার ভান করে কোন ঝট ঝামেলায় না পড়ে আমরা পাশ কাটিয়ে সুকৌশলে গুটি গুটি পায়ে সম্মুখে হেটে যায় আপন কর্তব্য সম্পাদনে। এ সমস্ত অমানবিক অঘটনের ঘনঘটা আমাদের বিবেক চেতন কে একেবারেই দংশিত ও নাড়া দেয় না। মাঝে মাঝে নিরন্তর প্রশ্নমালা অবচেতনের মননে ঘুরপাক খেয়ে থাকে আমরা কি শুধুই শ্রেষ্ঠ জীবের অধিকারী মানুষ। রাস্তায় পড়ে থাকা অসহায় বিপন্ন মানুষের দুঃখ কষ্ট যাতনা দেখেও আমাদের বিবেক একেবারেই শীতঘুমে থাকে আমরা প্রতিবেশীর কষ্ট লাঘব করতে সৌজন্যমূলক কথাটুকু বলতে দ্বিধাগ্রস্ত আমরা প্রতিনিয়ত অনাবশ্যক অবাঞ্ছিত ঘটনা থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখতে শামুকের খোলসের মতো জীবন যাপন করতে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছি। আমরা জেনে বুঝে সজ্ঞানে ভুলে গিয়েছি সামাজিকতা দায়বদ্ধতা সহনশীলতা স্থিতিশীলতা সর্বোপরি মানবিকতা। আজকে আমরা যখন চারিদিকে মানবতার বিপর্যয় অস্থিরতা অসহিষ্ণুতা বিচ্ছিন্নতমূলক কার্যকলাপ ঘনঘটার সাক্ষী থাকি তখন আমরা একেবারেই চোখের দৃষ্টিটাকে ঝাপসা করে রাখি। সামাজিক অনাচার জীর্ণতা দৈনতা অপেক্ষায় ও সংকটের অতল গহবরে তলিয়ে যাচ্ছে বৃহত্তর মনুষ্য সম্প্রদায়। নানা ভাষা নানা জাতি নানা ধর্ম নানা সম্প্রদায় নানা আচার-আচরণের মেলবন্ধনে গড়ে ওঠা আমাদের ব্যক্তি স্বতন্ত্র জীবন চর্যা আদর্শ ও নীতি-নৈতিকতা আজ যেন সোনার পাথর বাটিতে পরিণত। এ কথা বলতে দ্বিধা নেই যে বাঙালি সমাজ একদা বিদ্যাবুদ্ধি সংস্কৃতি চেতনায় সবদিক থেকে অগ্রগতির শিখরে ছিল সেই বাঙালি সমাজ আজ যেন বহু বিভক্ত ছিন্নভিন্ন। বাঙালি তার আত্মগরিমা মর্যাদা সম্মাননা খুইয়ে আজ যেন শুধুই নিঃসঙ্গ মানুষে পরিণত। যে পরিচয় যে ঐতিহ্য যে আত্মসম্মানকে সাঙ্গ করেই বাঙালিরা ভারত সভায় শ্রেষ্ঠ আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছিল সেই বাঙালি আজ তার জাতিসত্তা থেকে ক্রমশ বিচ্যুত। যে মেধা প্রতিভা উৎকর্ষতা সৃষ্টিশীলতাকে পুঁজি করে বাঙালি দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক তরেও নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিল সেই বাঙালি আজ একেবারেই বাঙালি চেতনা বাঙালি সংস্কৃতি থেকে সম্পর্কহীন। যে রবীন্দ্রনাথ ক্ষুদিরাম বিনয় বাদল দীনেশ নজরুল মহসিন শ্রীরামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ রাজা রামমোহন রায়ের মতো যোগ্য বাঙালি সন্তানদের দেখানো পথেই হেঁটে চলে অনুসরণ করে বাঙালি জাতিসত্তার বিকাশ চরম পর্যায়ে পৌঁছেছিল সেই বাঙালি আজ সেই সমস্ত মহাপুরুষ মনীষী জ্ঞানীগুণী বিদ্বান সমাজসেবকদের ভুলে গেছে। পরিশেষে একটি কথা আবারও একজন বাঙালি হিসাবে সর্বোপরি সমাজবদ্ধ মানুষ হিসাবে প্রত্যেকের কাছেই ব্যক্ত করছি আসুন আমরা সকলে মানবতার অঙ্গীকারে মনুষ্যত্বকে আঁকড়ে ধরে মহানুভবতা উদারতা সম্প্রীতির সমন্বয়ের মেলবন্ধন কে ব্যক্তিগত জীবনে প্রয়োগ ঘটিয়ে বাঙালি চেতনায় জাগরণে উদ্বুদ্ধ অনুপ্রাণিত হয়ে নিজেদের ঝিমিয়ে পড়া ঘুণ ধরা বাঙালিত্বকে পুনরুজ্জীবিত করি। এখনো সময় আছে নতুন করে চিন্তা ধারা ভাব বিনিময় মতাদর্শ গঠন ও আদান-প্রদানের মধ্য দিয়ে সামাজিকতা সম্প্রীতিকে বহুত্বকে বৈচিত্র্যময়তাকে সর্বোপরি মানবতার ঐক্যকে মনে প্রানে আঁকড়ে ধরে নতুন করে খুঁজে চলি বেঁচে থাকার সঞ্জীবনী সর্বোপরি বাঙালি চেতনা ও অনুভূতি। আসুন আমরা সকলে বাঙালি চেতনায় শান দিয়ে বাঙালি সংস্কৃতি সৃষ্টিকে গৌরবান্বিত করে আত্ম সংশোধনের মধ্যে দিয়ে হয়ে উঠি প্রকৃত বাঙালি পাশাপাশি সমাজবদ্ধ মানুষ। সময় এসেছে সমস্ত জীর্ণতা দ্বিধা দ্বন্দ্ব লোভ লালসা অসহিষ্ণুতা অস্থিরতা বিভেদ বিদ্বেষ বৈষম্য সাম্প্রদায়িকতার
বিসর্জনে বাঙালি চেতনায় ও জাগরণে মানবতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে গড়ে তুলি বাঙালিত্ব বোধ। ফিরে আসুক বাঙ্গালীদের সেই উৎকর্ষ ও সমৃদ্ধির সোনালী
অধ্যায়। বাঙালি সংস্কৃতি ভাষা কৃষ্টি পরম্পরা ঐতিহ্যকে সানন্দে আত্মস্থ করে বাঙালি আবার প্রগতির পথে গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যাবে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।