T3 || স্তুতি || শারদ বিশেষ সংখ্যায় রঞ্জনা বসু

অপরিণত
শীলাকে অগ্নিদগ্ধ পাথরের মূর্তির মতো লাগছে। ওর দিকে তাকানো যাচ্ছে না। বিমল এমনটা করতে পারল কি করে! মেয়ের বন্ধু বলে এতদিন ধরে এ বাড়িতে যাওয়া আসা। আর বিমলকে দোষ দিয়ে কি হবে, নিজের পেটের মেয়ে হয়ে এমন করে একটা চিঠি লিখে—নাহ্, আর ভাবতে পারছে না শীলা।
বালিশে ঠেস দিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে বৃদ্ধা গৌরী দেবী তখন অকুল পাথারে পড়েছে। ভগবানের কাছে প্রার্থনা করে মেয়েটার খোঁজ যদি একবার কেউ এনে দিতে পারে… এখানে তো অনেক আত্মীয় স্বজন রয়েছে। মাঝপথে তাকে থামিয়ে দিয়ে শীলা বলে.. আপনি এবার থামবেন মা।
ঘাড় ফিরিয়ে বউমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকার পর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মূল ভাবনায় ফিরে যায় বৃদ্ধা।
আজ খুব ভোরে উঠেই তৃপ্তি চলে এসেছে এ বাড়িতে।
কিছু খবর পেলে, বৌদি? দাদা বাবু ফিরেছে?
— না, পুলিশে খবর দিয়ে ফিরবে।
— পুলিশের কথা আর বলোনা বৌদি। ওরা আরও হারামি। সেবার ঘরে চুরি হয়ে যেতে সোয়ামীকে নিয়ে থানায় গেলাম। সুরাহা কিছু হলো না উল্টে এমন জেরা করতে আরম্ভ করল যেন আমরাই চোর। বললাম বাড়ি চলো, এরা কিছু করবে বলে মনে হয়না। বেরিয়ে আসার সময় এক ছুঁচো এসে বলে কিনা কিছু টাকা ফেলতে পারলে আমি চেষ্টা করে দেখতে পারি।
শীলা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। ওর মুখে কোনো কথা সরে না। কি দিনকাল পড়েছে।
বিমলকে স্টেশনের মুখে দাঁড়িয়ে চার পাঁচজন অচেনা ছেলের সাথে কথা বলতে দেখে শ্বেতা নিজেও এবার কিছুটা চিন্তায় পড়েছে। তাদের মধ্যে একজন এদিকেই আসছে। অল্প বয়সের প্রথম প্রেমে প্রগাঢ় বিশ্বাস থাকে। শ্বেতারও ছিল। আজ এক সপ্তাহ ধরে বিমল তাকে নিয়ে একটার পর একটা সস্তার হোটেলে এনে তুলেছে। বড়লোক ব্যবসায়ী বাবার একমাত্র ছেলের এমন রুচি ঠিক মেলাতে পারছে না।
ঘাড়ের ওপর কারো নিঃশ্বাস টের পায়। ঘুরে তাকাতেই —
— আমরা হচ্ছি একই দলের লোক। কাজ শেষ না করে সরে পড়ি না, বিশ্বাস রাখতে পারো। এইটুকু বলে লোকটা চুপ করে গেল, কারো চোখের সাথে কথা হচ্ছে, শ্বেতা বুঝতে পারে। এও বুঝতে পারে যে এই মুহুর্তে একটা বড়ো বিপদের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু বুঝতে পারছেন না কোন দল, কি কাজের কথা বলছে এরা?
বিপদে মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে, ঠাকুমার কাছে অনেকবার এই কথাটা সে শুনেছে। এখন সেটাই সবচেয়ে বড়ো কাজ। সন্দেহ করছি বুঝতে দেওয়া যাবে না ওদের। বিমল এড়িয়ে যাচ্ছে, ডাকলেও সামনে আসছে না। এখন তো ধারেকাছেও নেই।
— আমাদের সাথে আসুন, ম্যাডাম।
চারদিকে একবার ভালো করে দেখে নিয়ে শ্বেতা বলল, বিমল আসুক। আমাকে এখানে না পেলে আবার খুঁজবে।
— তার প্রয়োজন নেই। ও জানে আমরা কোথায় যেতে পারি।
মনে মনে ইষ্টদেবতার নাম জপ করতে থাকে। এতটা পথ এল বিমল কে কোথাও দেখতে পেল না। মরণ ফাঁদে পড়ে গেছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই তার আগে একটা কামড় বসাতে আপত্তি কি?
একটু জোরেই পা চালায় শ্বেতা। যত তাড়াতাড়ি পারে গলিটা পার হতে চায়। চিরাচরিত প্রথামত পুলিশ অনেক দেরিতে আসে আর এসেই তৎপরতা শুরু করে দেয়। দারোগা বাবু গম্ভীর মুখে যখন সব জানতে চাইল, শ্বেতা কিছুই লুকালো না। ওর নিজের এই ভুল সিদ্ধান্তের জন্য নিজেকেই সবচেয়ে বড়ো অপরাধী মনে হচ্ছে। এখন লোকটার জ্ঞান ফিরে এলেই হয়, মরে গেলে আবার চাপ আছে। ভারী লোহার রডে মাথা ফেটে প্রচুর রক্ত বেরিয়েছে কিনা…
ভিড়ের মধ্যে তৃপ্তি কে দেখে বেশ অবাক হয়ে গেছে শ্বেতা। একবারের জন্যেও ওর দিকে তাকায়নি। কি এত কথা বলছে পুলিশের সাথে। নাহ্ আর পারছে নাহ্ আর পারছে না। খিদের চোটে পেট পাকিয়ে উঠেছে। ক্লান্ত শ্বেতা এবার বাড়ি ফিরতে চায়। এইসময় তৃপ্তি এগিয়ে আসে। চলো…
— তুমি? কি করে—
সব বলব বাড়িতে গিয়ে। মাখামাখি করছিলে দেখে ভয় হচ্ছিল। কতবার সাবধান করতে গিয়ে, সরে এসেছি এই ভেবে যে তোমার বাড়ির লোক আছে তো। বিমল ছেলেটাকে বিশ্বাস করে ভালো করোনি। কত বড়ো ঘরের মেয়ে তুমি। ওমন সজ্জন মানুষ যার বাবা, তারই মেয়ে হয়ে কিনা…
— চুপ করো দিদি, আর বলোনা। আমি এখন বাড়ি যাব কোন মুখে, সে কথা ভাবতেই লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
কেন? লজ্জা কিসের? ভুল করেছিলে ঠিকই। আবার দুর্গা হয়ে ত্রিশূল ধরতেও তো পিছিয়ে আসোনি।