সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৩৫)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
বাড়িতে ফেরার পর মা-কে বলতেই মা গালটি দেখলেন। এখনও আঙুলের দাগ লেগে আছে। মা তো রেগে গেলেন। ছুটির হাত ধরে টেনে নিয়ে গেলেন সুধাময়ের কাছে। রেগে বললেন -তোমাদের হেড স্যারকে বলো ইশকুলে মারধোর বন্ধ করার নির্দেশ দিতে।
– কেন কি হয়েছে?
মা ছুটির গাল দেখালেন।
সুধাময় ছুটিকে বললেন – এদিকে আয় তো। – দেখলেন ছুটির গাল লাল হয়ে আছে, এখনও এবড়োখেবড়ো ভাবে ফুলে আছে জায়গাটি। তার মানে আঙুলের দাগ পড়ে গেছে।
– কে মারল? জগবন্ধু?
তিনজন মাত্র মাস্টারমশাই। তার মধ্যে হেডস্যার ওসব করেন না। সুধাময় জিজ্ঞেস করলেন -কি পড়া জিজ্ঞেস করেছিল?
– টাস্ক দিয়েছিল অচিনপুরের ইতিহাস লিখে নেওয়ার জন্যে। স্কুল ইন্সপেক্টর নাকি অনেক ইশকুলে জিজ্ঞেস করেছেন এই প্রশ্ন।
-তো করলি না কেন? আমাকে জিজ্ঞেস করলেই তো পারতিস, বলে দিতাম। কবে দিয়েছিল লিখতে?
– গতকাল।
– হুউম। তুমি তো গতকাল রাতে পড়াশোনা করোনি। ঘুমিয়ে পড়েছিলে?
মা রেগে বললেন – তাই বলে এত জোরে মারবে? মেরে কি কিছু হয়? ইশকুল কি জেলখানা? এজন্যেই রবীন্দ্রনাথ ইশকুল যাননি। বুঝিয়ে যা করা যায়, মেরে তা করা যায়না, এটা জেনে রেখো। ছুটি, তুই সোমবার ইশকুল যাবি না।
– না মা।
– আগে লেখা তৈরি করো। তারপর ইশকুল। ইশকুলে নেশা, পড়ায় তো তা নেই।
সুধাময় বললেন – আমার ডাইরিতে লেখা আছে অচিনপুরের ইতিহাস। তোমাকে দেব। ভালো করে তৈরি করো। আর ইশকুল না যাওয়ার কী আছে? আগামীকাল রবিবার আছে। সারাদিনটাই তো আছে।
– ওই দেখো জগবন্ধু বাজারে আসছে।-মা বললেন।
কারখানার কোল ঘেঁষে আঁকাবাঁকা শক্ত পাথুরে পায়ে চলা মাটির পথ গেছে ও পাড়ায়, ওই পাড়া ঘেঁষে উইলসন ইশকুল। দুদিকে রাস্তা রয়েছে। একটা গাড়ি চলা পথ, আর একটা এই কারখানার কোল ঘেঁষে ঘেঁষে মেঠো পথ। তাদের সামনের ঘরটার পেছনের বড় জানালাটা দিয়ে ওই পায়ে চলা পথ দেখা যায়। দেখা যায় লোকজনের আনাগোনা।
শনি মঙ্গলবার কোয়ার্টারের সামনেই বাজার। অনেকসময় এই দিনগুলিতে জগবন্ধু স্যার তাদের বাড়িতে আসেন। আজ কি আসবেন? এলে হয়তো ভালোই হতো।
একটু পরেই স্যার এসে হাজির।
ছুটি পাশের ঘরে একছুট দিয়ে সরে গেল স্যার তাকে দেখবার আগেই। সুধাময় বললেন – এসো, বোসো।
জগবন্ধু স্যার ইতস্ততভাবে বলছেন – ছুটি কোথায়?
সুধাময় ডাকছেন – ছুটি কোথায় গেছিস? এদিকে আয়।
ছুটির খুব অস্বস্তি হচ্ছে। কিন্তু যেতে তো হবে। স্যার একবার মা-র দিকে, একবার বাবার মুখে তাকিয়ে বললেন – ছুটির পড়াশোনায় একদম মন নেই, ক্লাশের সময় চাগাছের দিকে নাহয় মাঠের ঘাস নাহয় পাহাড় ওসব দেখে। কিচ্ছু শোনে বলে মনে হয় না। আজ প্রায় ছাত্রই লেখা নিয়ে আসেনি, মাত্র দুজন এনেছে। সবাইকেই শাস্তি দিয়েছি। তবে ছুটির নাকি খুব জোর লেগেছে, আমাকে রতন বলছিল – স্যার আপনি এতো জোরে মেরেছেন ছুটির গালে পাঁচ আঙুলের দাগ লেগেছে। এদিকে আয় তো ছুটি।
ছুটি এগোচ্ছে না। ঠায় দাঁড়িয়ে। স্যার নিজে উঠে গিয়ে দেখলেন। তারপর লজ্জিত সুরে বললেন – আর কারোর কিছু হয়নি। একমাত্র ছুটির… খুব রোগা তো। এই, তুই খাস না নাকি রে?
ছুটি রাগের চোটে মনে মনে বলে – খেয়ে মোটা হলে মনের সুখে মারতে পারবেন, তাই না স্যার?
এমনিতে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে।
মা বলেন – আচ্ছা জগবন্ধু, তোমরা এরকম মারধোর করে ছাত্র পড়ালে কাজ হয়? বুঝিয়ে বললেই তো হয়। আমি তো আমার ছেলেমেয়েদের কখনও মারধোর করিনি। ছুটির খেলার দিকে মনটা বেশি, আর এখন ওর নতুন মনের মতো সঙ্গী জুটেছে। ওরা অচিনপুর ইশকুলে পড়ে, ওখানে নাম আছে ইশকুলে, মাঝেমধ্যে হাজিরা দেয়। বাড়িতে পড়াশোনা করে। বিকেলে খেলতে পারলে বেঁচে যায়। তাই সেদিন পড়ার টেবিলে ঘুমিয়ে পড়েছিল। সব ছাত্রদের সময় দিলে মনে হয় লিখে আনতে পারবে। কিছু মনে করো না, তুমি তো আমার ছেলের মতই।
– না না, আমি কিছু মনে করিনি, আপনার কথা নিয়ে ভাবছি। হ্যাঁ, হয়তো এমনটা করা যায়।
সুধাময় বললেন – আসলে শ্রমিকদের ছেলেমেয়েরা তো আমাদের মতো নয়। ঘরে বাইরে ওরা কাজ করে।
এইসব কথাবার্তা বলে স্যার চলে গেলেন। কিন্তু বলে গেলেন – তোমাকে লেখাটা তৈরি করে নিয়ে যেতে হবে ছুটি। এইটা কিন্তু এড়িয়ে গেলে চলবে না, তখন না মেরে তোমাকে অন্যভাবে শাস্তি দেব।
– সেটা কিরকম স্যার?
– ডিটেন থাকবে। ইশকুল ছুটির পর সবাই বাড়ি ফিরে যাবে। তুমি একা ইশকুলে বসে থাকবে।
– তারপর?
– তারপর আর কি? সারারাত মশা আর ভূতের সঙ্গে থাকবে, ব্যস।
বিকেলে ইভান খেলতে এলো। হীরার শরীরটা আজ ভালো নেই। নীচে শনিবারের হাট। লোকজন গিজগিজ করছে। আজ ছোটাছুটি করা যাবে না। উঠোনে কিছু ডাংগুলি খেলল ইভান। ওসব খেলতে পারে না ছুটি। যাই হোক সঙ্গ দিল সে। যাবার সময় ইভান বলে গেল আগামীকাল রবিবার, ছুটোছুটি খেলব। হীরা পারলে ছুটুক। বসে খেলা যাবে না কিন্তু কিছুতেই।
ছুটির মাথায় এখন ওসব নেই। মাথায় ঘুরছে অচিনপুরের ইতিহাস। ওটা শেষ করতে না পারলে সোমবার ইশকুল যেতে দেবেন না মা। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে। কিছুক্ষণ সে ইংরেজি গ্রামার পড়ল। কিছু লিখল। মা এসে দু’বার দেখে গেলেন।
৷ বাবা বাজার সেরে ফিরে তামাক খান গুড়গুড়িতে। একটা গুড়গুড় শব্দ, ভীষণ ভালো লাগে ছুটির। তামাক সেজে দেয় কখনও ছোড়দা কখনও ছুটি। বাবা ছোড়দাকেই তামাক সেজে দিতে বলেন। ছোড়দার যত দুষ্টুমি ছুটির সাথে। বাবা যেই বললেন তামাক সেজে দেওয়ার কথা, ছোড়দা চেঁচিয়ে উঠে বলে – বাবা, ছুটি বলছে ও তামাক সাজবে।
বাবা বললেন – বেশ তো সাজুক না।
ছোড়দা খিলখিল করে হাসে। বলে – যা।
ছুটি রেগেমেগে কীসব বলে। এ তো ঘোর অন্যায় ইত্যাদি। কিন্তু কে কার কথা শোনে।
ছুটি তামাক সাজতে বসে। কল্কে উলটে জমে থাকা জ্বলে যাওয়া পুরনো তামাককে ফেলে, কল্কের ফুটো বন্ধ করার জন্যে একটা ছোট নুড়ি। ওটার নাম স্থানীয় ভাষায় ‘করালি’। ওটাকে ফুটোর ওপর রেখে তারপর আঠালো তামাককে ঝুরুঝুরু করে দিতে হয় কল্কেতে। তারপর কালো বাতাসার সাইজের টিকে জ্বালিয়ে গড়গড়াটা বাবার সামনে ধরে দেয়। বাবা যখন গড়গড়াটা রেখে দুপুরে বিশ্রাম নেন, তখন গড়গড়াটা পেছনের বারান্দায় নিয়ে লুকিয়ে টান দিয়ে দেখেছে ছুটি। আহা কী চমৎকার তামাকের গন্ধ। বাবা মাঝেমধ্যে অচিনপুর থেকে অম্বুরী তামাক আনেন। ওটার গন্ধ আরও চমৎকার।
আজ সে গড়গড়াটা বাবার হাতে ধরিয়ে বাবার সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। বাবা বললেন – কিছু বলবি?
ছুটি বলল – বাবা, অচিনপুরের ইতিহাস কীভাবে লিখব?
বাবা বললেন – তুমি পড়ার টেবিলে যাও। আমি আসছি।
ক্রমশ