গল্পে সর্বাণী রিঙ্কু গোস্বামী

পুজো
পুজোয় বসেছেন সুধাময়ী, শিরদাঁড়া সটান মুখে আনর্গল মন্ত্র। বহু বছর ধরে পাঠ করে করে সমস্ত মুখস্থ তাঁর, আর বই দেখতে হয় না। সামনে নাবায়ণ আর লক্ষ্মী। ঠাকুরকে অভ্যস্ত হাতে সাজিয়ে দিচ্ছেন নৈবেদ্য, মাখিয়ে দিচ্ছেন চন্দন। কান খাড়া, মস্তিষ্ক সজাগ।
দুই কৃতি ছেলে সকালেই খেয়ে দেয়ে অফিস চলে গেছে, নিজের হাতে তাদের পরিবেশন করে খাইয়েছেন সুধাময়ী। সংসারের রাশ এখনও তাঁর হাতে, দরজার কাছে তাদের দুগ্গা দুগ্গা বলে পাঠিয়ে তবেই স্নানে ঢুকেছেন তিনি। এটুকু না করলে তিনি স্বস্তি পান না, দু বৌমা তখন রান্নাঘরে আর তাঁর পুজোর যোগাড়ে ব্যস্ত। নাতি নাতনী তো ভোর হতেই গলায় টাই ঝুলিয়ে খাঁচা গাড়িতে ইস্কুল।
বাইরে কর্তা কাগজ নিয়ে বসেছেন, আদ্যোপান্ত দেশ দুনিয়ার খবর জানবেন এখন। তারপর টিভিতে খবর দেখবেন ঘন্টাখানেক, মিলিয়ে নেবেন কাগজে সব ঠিকঠাক লিখল কি না। এখন খবরের কাগজের খসখস শব্দ এরপরে তিনি উঠলে চটির ফটফট। পায়ের চামড়া বুড়ো হয়ে নরম হয়ে গেছে আজকাল, একটু আলগা চটি পরার নিদান সুধাময়ীরই।
দুই বৌমার পায়ে নূপুর, সখ করে সুধাময়ীই পরিয়েছেন বিয়ের পর। “ভারি মিষ্টি লাগে সারা বাড়িতে ঝুমঝুম শুনতে।” আসলে গতিবিধিটাও বোঝা যায়। যেমন বোঝা যায় হরেকৃষ্ণ যেখানেই যায় ওর গান শুনলে, “শ্রীকৃষ্ণ গোবিন্দ হরে মুরারে,” এ গান সুধাময়ীই শিখিয়েছেন ওকে। বলেছেন গান গাইতে গাইতে ঘরের কাজ করবি, মন ভাল থাকবে… বদ চিন্তা আসবে না মাথায়! সেও মেনে নিয়েছে, ওর কাল্টু নাম বদলে হরেকৃষ্ণ সুধাময়ীর দেওয়া তো। যতবার ডাকবেন ততবার ইষ্টনাম ধরা হবে।
জপ করতে করতে কান খাড়া করে আছেন সুধাময়ী, কোথাও কিছু অন্যরকম হচ্ছে না তো! এ সংসার তাঁর, হিসেবের বাইরে যেন কিছু না হয় কখনও।
নারায়ণ পাশ ফিরে শুলেন , আরেকটু ঘুমিয়ে নেওয়া যাক… সুধাময়ী তো আছেন!