নিবন্ধে শংকর ব্রহ্ম

কবিদের প্রতি আহ্বান
(প্রথম পর্ব)
কবিতা বিজ্ঞান নয় যে H2O মানেই জল হবে। এই অমোঘ সত্যটুকু না বুঝে যারা সনাতন ধারার স্রোতে অবগাহন করে, বৃথা কাব্য চর্চায় মেতে আছেন, তারা অযথা কিছু শব্দের অপচয় করছেন, তার বেশী কিছু নয়। তাই কবিতা লেখার পুরনো ছাঁচ প্রথমে ভেঙে ফেলুন। গড়ে তুলুন নিজের ভাবনা স্বকীয়ভাবে প্রকাশের জন্য নতুন ধাঁচ। কারণ, কবিতা লেখার ধরা-বাঁধা কোনও নিয়ম নেই।
নতুন ধারার কবিতা গ্রহণে, পাঠকদের প্রাথমিক পর্যায়ে স্বাভাবিকভাবেই অনীহা থাকবে, কারণ এ ধরনের কবিতা পাঠে তারা অভ্যস্থ নন। ধীরে ধীরে পাঠকরাও অভস্থ হয়ে উঠবেন। জীবনানন্দ দাশের কবিতাও বিশিষ্ট পাঠক সমালোচকরা সে-সময় গ্রহণ করতে পারেননি। সজনীকান্ত দাস তাঁর পত্রিকা ‘শনিবারের চিঠি’-তে জীবনানন্দের কবিতা বুঝতে না পেরে বিরূপ মন্তব্য করেছিলেন। অনেক ঠাট্টা বিদ্রুপ জীবনানন্দকে সইতে হয়েছিল সজনীকান্ত দাসের অনুগামীদের কাছ থেকে, তাঁর কবিতা নিয়ে।
কবি সুধীন্দ্রনাথ দত্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ কবি এবং সমালোচক কোথায়ও জীবনানন্দ নামটি পর্যন্ত উচ্চারণ করেননি, এতটাই অপছন্দ করতেন তাকে। স্বয়ং রবীন্দনাথও তাঁর ”মৃত্যুর আগে’ কবিতাটি পড়ে তার রস সম্পূর্ণ রূপে গ্রহণ করতে না পেরে, তার কবিতাকে ‘ চিত্ররূপময়’ কাব্য বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। কেবলমাত্র নতুনের সন্ধানী বুদ্ধদেব বসু তাঁর কবিতার মূল্যায়ণ করতে পেরে, তাকে মূল্যে দিয়েছিলেন, কবিতা ভবন থেকে ‘এক পয়সায় একটি’ সিরিজের অংশ হিসেবে একটি ষোল পৃষ্ঠার কবিতা সংকলন প্রকাশ করে। বুদ্ধদেব বসু ছিলেন জীবনানন্দের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক এবং তাঁর সম্পাদিত কবিতা পত্রিকায় জীবনানন্দের বহু কবিতা ছাপা হয়।
আর আজ জীবনানন্দ দাশ বাংলা ভাষার প্রধান কবি। আপনিও যে ভবিষ্যতে তেমন কেউ একজন হবেন না, সে কথা কে বলতে পারে? তাই আসুন এখন থেকে পুরনো ধাঁচ ভেঙে নতুন ধারায় লিখতে শুরু করি।
(দ্বিতীয় পর্ব)
১৯৬৯-৭০ সালে আমরা তিনজন মিলে (আমি, মোহন গুপ্ত ও ৺শ্যামল চ্যাটার্জী) ‘মেঘদূত’ নামে একটি পত্রিকা বের করি। সে সময় বুদ্ধবেব বসুর কাছে পত্রিকার জন্য একটি কবিতা চাইতে যাই আমি। কবিতা নেই বলে, স্বভাবতই তিনি আমাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। ‘মেঘদূত’ পত্রিকা বের হবার পর, তাকে এককপি দিতে যাই। সেই থেকেই তাঁর বাড়িতে যাতায়াত শুরু হয়। তারপর মাঝেমাঝেই তাঁর বাড়িতে যেতাম কারণে-অকারণে, কারণ তাঁর বাড়ির উল্টোদিকে নির্মলেন্দু বলে আমার এক বন্ধু থাকাত। বন্ধুর বাড়িতে গেলে। তাঁর সঙ্গেও দেখা করে আসতাম।
একদিন তাঁর সঙ্গে কবিতা নিয়ে কথা বলার সময়, আচমকা তাকে প্রশ্ন করে বলি, আমাকে কবি হতে গেলে কী করতে হবে?
সে কথা শুনে তিনি আমার চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে একমুহূর্ত তাকিয়ে, মৃদু হেসে বললেন, তুমি কি কবিতা লিখতে চাও, নাকি কবি হতে চাও।
তাঁর প্রশ্ন শুনে আমি প্রথমটায় হতবুদ্ধি ও বিমূঢ় হয়ে পড়ি। কবিতা লিখতে চাওয়া আর কবি হতে চাওয়া কি,আলাদা কিছু?
তাই আমি তাঁকে প্রশ্ন করে ফেললাম, মানে?
তিনি বলেছিলেন, কবিতা লিখতে চাইলে দেশি-বিদেশি প্রচুর কবিতা পড়, আর নিজেকে প্রশ্ন কর, তোমার কিছু বলার আছে কিনা? যদি সে রকম কোনও ভাবনা চিন্তা থাকে, তবে সে ভাবনা-চিন্তার কথা নিজের মতো করে প্রকাশ করার চেষ্টা করো, তা অন্য কাউকে অনুকরণ করে নয়।
আর কবি হতে চাইলে, তোমাকে এসব কিছুই করতে হবে না। কবি সভাগুলিতে গিয়ে নিয়মিত মুখ দেখাও। কবি হিসাবে সবাই তোমায় চিনে যাবে।
আজ পঞ্চাশ বছর পরও, তাঁর কথা কতটা সত্যি, বর্তমান কাব্য-জগতের বাস্তব পরিস্থিতি দেখে অন্তরে অনুভব করি।
কবিতা চর্চায় মগ্নতা নেই (এতো সময় কোথায়?) অধিকাংশ সময় তারাই কবি-সভাগুলি নিয়মিত আলো করে বসে থাকেন। আমিও দু-একবার সে সব কবি-সভায় গিয়ে দেখেছি, কেউ কারও কবিতা পাঠ শোনে না। একে-অন্যের সঙ্গে খোশ গল্পে (আত্মপ্রচার মূলক) মেতে ওঠে। আর সম্প্রতি তার সঙ়ে জুড়েছে প্রিয় লোকের সঙ্গে সেল্ফি তোলার ঘটা।
এসব করে কবিতার কী উন্নতি হচ্ছে, আমি সত্যিই বুঝতে পারি না।
তাই প্রথমেই আপনাকে ঠিক করে নিতে হবে, কবি হতে চান, নাকি কবিতা লিখতে চান?