ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজ আমেরিকার ডায়েরি || সুব্রত সরকার পর্ব – ৩

আমেরিকার ডায়েরি – ৩
।। ৭,৮, ৯ অগাস্ট, ২০২৪ ।।
।। নিউইয়র্ক, ম্যানহাটন, টাইম স্কোয়ার।।
জে এফ কে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে এলাম সব মিটিয়ে। ইমিগ্রেশনে লম্বা লাইন ছিল। প্রচুর মানুষের ভিড়। এটা নাকি নিউইয়র্কে বেড়াতে আসার একটা সুন্দর সময়। তাই আমেরিকানরা দেশের নানা প্রান্ত থেকে তো এসেছেনই, অনেক এশিয়ান, ইউরোপিয়ানরাও এসেছেন বেড়াতে দেখতে পেলাম। বহু মানুষের ভিড়ে থিক থিক করছে ইমিগ্রেশন কাউন্টারগুলো। সময় লেগে গেল অনেক।
ক্লান্ত শরীরে কনভেয়ার বেল্ট থেকে খুঁজে খুঁজে নিজেদের লাগেজগুলো নিয়ে জে এফ কে ছাড়লাম। বাইরে এসে পথের ধারে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ বড় আমেরিকান এক হলুদ ট্যাক্সি বুক করে আমাদের তিনজনের ছোট, মাঝারি ও বড় সব মিলিয়ে মোট ৯ টা বাক্স বোঝাই করে চললাম ম্যানহাটন এর পথে।
এয়ারপোর্ট থেকে ম্যানহাটন অনেকটা পথ প্রায় ১৭/ ১৮ মাইল। প্রথম কিছুটা রাস্তা বেশ সাধারণ। মনেই হচ্ছিল না আমেরিকা! মানিকতলা বা নাকতলার মতই!.. তারপর একটু একটু করে ব্যস্ত পথটা পেরিয়ে নির্জন সুন্দর রাজপথ চোখে পড়ল। আমাদের হলুদ ট্যাক্সি দৌড়তে শুরু করল। এবার নতুন চোখে দেখতে শুরু করলাম আমেরিকাকে।
ম্যানহাটন এর বিখ্যাত টাইম স্কোয়ারে আমাদের হোটেল বুক করা রয়েছে। এখানে আমরা দু’ রাত, আড়াই দিন থেকে চলে যাব পরবর্তী নতুন জায়গা সিরাকিউজ। সোহমের কাছে ওখানে থাকব কটা দিন।
আমাদের ট্যাক্সি যত এগিয়ে চলেছে, পথের সৌন্দর্য ও চারপাশের শহর-বাড়ি, নদী, সেতু, পথের ধারের গাছপালা, ম্যাপল ট্রি চোখে পড়তে লাগল। বেশ সুন্দর। মন একটু একটু করে মুগ্ধ হচ্ছে। জেট ল্যাগের ক্লান্তি চোখে মুখে থাকলেও নতুন দেশকে দেখার আনন্দ উপভোগ করতে করতে এগিয়ে চললাম।
নিউইয়র্ক পৃথিবীর এক বিখ্যাত শহর। আশ্চর্য নগরী। ঝা চকচকে সব কিছু। বৈভব ও বিত্তে পরিপূর্ণ। প্রথম দেখায় মন কেড়ে নেয়। এই শহরের গোড়াপত্তন হয়েছিল ১৬২৪ সালে। ৫ টি বরো নিয়ে নিউইয়র্ক – ম্যানহাটন, ব্রুকলিন, কুইন্স, দ্য ব্রঙ্কস এবং স্টেটেন আইল্যান্ড। আমেরিকার দ্বিতীয় জনবহুল বন্দর শহর। এই শহরে নাকি ৪০০ টি ভাষায় কথা বলা হয়, এমনই ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময় মানুষজনেরা আসা যাওয়া করেন। সত্যিই আমারও এই দুদিন নিউইয়র্কে থেকে তাই মনে হয়েছে। ইংরেজি, স্প্যানিস, বাংলা, ফরাসি, রাশিয়ান, জার্মান তো আছেই, আরও যে কত রকম ভাষাভাষীর শব্দ উচ্চারণ সব সময় কানে এসে লাগছে। বেশ আজব শহর, আশ্চর্য সুন্দর শহর নিউইয়র্ক।
আমাদের হোটেলের নাম “The Manhattan at Times Square Hotel”। ২২ তলা হোটেলের ১৫ তলায় আমাদের ঘর। একদম শহরের বুকে এই হোটেল। নিউইয়র্ক ধনীর শহর। সব কিছু ডলার শাসিত। আহামরি এমন কিছু নয় আমাদের রুমটা, তবু তার ভাড়া ৪৫০ ডলার! শুধু দু’রাত থাকব ভারতীয় টাকায় ৩৭ হাজার গুণে! অবশ্য ব্রেকফাস্ট ছিল কমপ্লিমেন্টারি।
হোটেলের ঘরে ঢুকতেই সন্ধে হয়ে গেল। তবু চটজলদি ফ্রেশ হয়ে নেওয়ার জন্য তিনজনেই ব্যস্ত হয়ে পড়লাম। সময় নষ্ট করার মত সময় নিয়ে তো আসি নি। এই শহরে প্রতিটি ঘন্টার ডলার মূল্য অনেক। তাই এই দু’দিনে যতটুকু পারি দেখে নিতে হবে।
নিউইয়র্কে দেখার মত রয়েছে অনেক সুন্দর সুন্দর জিনিস। হাডসন নদীর জলে দাঁড়িয়ে থাকা পৃথিবী বিখ্যাত সেই মূর্তি স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ব্রুকলিন ব্রিজ, ৯/ ১১ মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, World Trade Centre, Little Italy and Chinatown, Central Park, Wall Street, Times Square, Museums, Metro Rail, এবং এখানকার বিখ্যাত থিয়েটার হলগুলো।
সন্ধ্যায় টাইম স্কোয়ারের কাছে চলে গেলাম প্রথমে। আমাদের হোটেল থেকে টাইম স্কোয়ার পায়ে হেঁটে পাঁচ মিনিট। দারুণ জমজামট এক উজ্জ্বল ঝলমলে জায়গা টাইম স্কোয়ার। এখানে এসে দাঁড়ালে মনে হবে এ কোথায় এলাম! সব কিছুই বড় বর্ণময়। দারুণ হৈচৈ আর আনন্দ করার এক জায়গা। পথের মধ্যে নানারকম অ্যাকটিভিটিস চলছে। নাচ, গান, নাটক, বক্তৃতা, কেনাকাটা, খাওয়া দাওয়া, আড্ডা, প্রতিবাদ সভা, মারিজুয়ানা সেবন ও জীবনকে সেলিব্রেশন সব চলছে। যার যেটা ভালো লাগছে, সে সেটাই করছে, দেখছে। আমার তখন খুব মনে পড়ছিল, টাইম স্কোয়ারে যদি বাদল সরকারের নাটক করা যেত কেমন হতো! “আয়না”র বন্ধুদের আনতে পারলে ওরা মাত করে দিতে পারত টাইম স্কোয়ারকে! থার্ড থিয়েটারকে মঞ্চস্থ করার জন্য টাইম স্কোয়ারের এই খোলা জনবহুল জায়গাকে ভীষণ কাজে লাগানো যেত!..
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা হাতে নিয়ে কিছু বাংলাদেশী মানুষকে দেখলাম উল্লাস করছে। নিউইয়র্কে প্রচুর বাংলাদেশের সাধরণ মানুষজন বসবাস করে। সবাই মূলত জীবিকার জন্য চলে এসেছে। সত্যি বলতে, গত কয়েকদিনের বাংলাদেশকে দেখে মনের মধ্যে কোথায় যেন একটা আবেগের যন্ত্রণা হয়েছে। তাই ওদের এই উল্লাস ও উদযাপনকে ভালো লাগছিল না!.. এ বাংলাদেশকে মেনে নিতে ইচ্ছে করল না।
টাইমস্কোয়্যারে রিক্সা! প্রথম দেখায় একটু অবাক হলাম। এত উন্নত দেশে, এমন একটা চোখ ধাঁধানো শহরেও রিক্সা চলে? তাও আবার পা দিয়ে চালাতে হয়। একেই বলে গ্লোবালাইজেশন!..তাই নিউইয়র্কে এসেও রিক্সা দেখার মজা বেশ উপভোগ করলাম।। এখানে রিক্সা চালক মহিলারাও আছেন। রিক্সাগুলো একটু বড়, সাজানো গোছানো এবং গান বাজে.. “ও উই আর আমেরিকান, লাইফ ইজ সো নাইস, ইউ ক্যান এনজয় ..”
টাইম স্কোয়ারের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ এখানকার দোতলা টুরিস্ট বাসগুলো। মাথায় ছাদ নেই। সিটে বসে নিউ ইয়র্ক সিটির ডাউনটাউন- আপটাউন এর অনেককিছু দেখতে দেখতে যাওয়া যায়। টপ ভিউ বাস সার্ভিস খুব জনপ্রিয়। এই বাসগুলোর আরেকটা নাম হল Hop-On Hop-Off। আমরাও টিকিট কেটে এই বাসে চড়লাম। টিকিটের ডিসকাউন্ট মূল্য হল জন প্রতি ২৯ ডলার। এই দেতলা বাসের মাথায় বসে নিউইয়র্ক সিটি ঘুরে ঘুরে দেখার মজা সত্যিই খুব ভালো লেগেছে। জেট ল্যাগে শরীর বিধ্বস্ত ছিল। ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছিল। বাস কোম্পানির দেওয়া রেনকোট ( Poncho) দিয়ে শরীর ঢেকে নিলাম। কানে ওদেরই দেওয়া ইয়ার বাড গুজে সব শুনতে শুনতে ও দেখতে দেখতে এই দেড় ঘন্টার বাস সফর মনে থেকে যাবে চিরদিন।
আমাদের বাস যখন ছাড়ল ঘড়িতে এগারোটা দশ। কিন্তু টাইম স্কোয়ারে তখন যেন সবে সন্ধে। ঝলমল করছে চারপাশ। মানুষজন হৈ হৈ আনন্দে মেতে আছে। মনে হবে যেন আমাদের দুর্গা পুজোর অষ্টমীর রাত। সত্যি এ এক রূপকথারই দেশ।
বাসের মাথায় বসে ঝলমলে মায়াবী রাতের নিউইয়র্ক শহরের অনেককিছুই দেখলাম। হাডসন নদীর শোভা বড় অপূর্ব লেগেছে। ভালো লেগেছে বহুদূরের স্ট্যাচু অফ লিবার্টি, ব্রুকলিন ব্রিজ, লিটিল ইটালির রাস্তা, চায়না টাউনের দোকান। কত সুন্দর সুন্দর সব স্থাপত্য। মন ভরা আনন্দ নিয়ে গভীর রাতে যখন ফিরছি, পথ অনেকটা শুনশান হয়ে গেছে। আলো নিভে গেছে অনেক দোকান, রেস্তোরাঁর। সে সময় হঠাৎ চোখে পড়ল পথের ধারে ফুটপাতের আধো অন্ধকারে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে কিছু মানুষ। শুনলাম এরা সব হোমলেস পুওর আমেরিকান। নিউইয়র্কের রাস্তায় পরেও এমন গৃহহীন কয়েকজনকে দেখেছি। ভিক্ষাজীবিও দেখেছি। বিশেষ করে তাঁরা সবাই সিনিয়র সিটিজেন। গত বছর বাংলাদেশে বেড়াতে গিয়েও এই পথের ধারে ভিক্ষাজীবি বয়ষ্কা মহিলাদের খুব চোখে পড়েছিল। পৃথিবীর এই বৈষম্য নিউইয়র্কে এসেও চোখে পড়বে ভাবি নি!.. “মানুষ বড় কাঁদছে, তুমি মানুষ হয়ে মানুষের পাশে দাঁড়াও!.. ” শক্তি চট্টোপাধ্যায় বুকে ধাক্কা দিয়ে গেলেন!..
।। ৮ অগাস্ট, একদিন – সারাদিন নিউইয়র্কে।।
আজ সকাল সকাল তৈরী হয়ে হোটেলের Complimentary Breakfast খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম শহরটাকে ভালো করে ঘুরে দেখতে। প্রথমেই গেলাম আমার একটা মোবাইল সিম নিতে। কিন্তু আমার ফোনে ( Real Me) আমেরিকান সব সিম কাজ করবে না শুনে অবাক হলাম। অগত্যা নিতে হল একটা অন্য সিম, Lyca Mobile. এক মাসের প্যাকেজ পড়ল ২৫ ডলার।
এই শহরে মেট্রোরেল আছে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় সহজে পৌঁছে যাওয়ার জন্য মেট্রো সার্ভিস চিপ অ্যান্ড বেস্ট। ডুলুং সোহম আগে নিউইয়র্কে দু’বার এসেছে। ওরা অনেক কিছু জেনে বুঝে গেছে। তাই চটজলদি সাবওয়ে খুঁজে ঢুকে পড়লাম একটা মেট্রো স্টেশনে। নাম 49 street। নামব গিয়ে City Hall। ভাড়া পড়ল জনপ্রতি ৩ ডলার।
মেট্রো স্টেশন ও মেট্রো রাইড খুব ভালো লাগল না। আমাদের মেট্রো অনেক ভালো। এবং আমাদের স্টেশনগুলো অনেক সুন্দর। নিউইয়র্কের মেট্রো অনেক পুরানো। মনে হল সময়ের সাথে সাথে তাকে তত আধুনিক ওরা করে নি। গুরুত্ব দেয় নি জনগণের এই রেল পরিসেবাকে। কারণ এখানে প্রায় নিরানব্বই ভাগ ধনী মানুষের নিজস্ব একাধিক দামী দামী গাড়ি রয়েছে। শহর জুড়ে শুধু চকচকে বড় বড় গাড়ি।
আমরা মেট্রো থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম World Trade Centre এর কাছে। বেশ ঘিন্জি লাগল জায়গাটা। চারপাশে চোখ ধাঁধানো হাইরাইজ। এটা এখন একটা বিখ্যাত দর্শনীয় জায়গা হয়ে গেছে ৯/১১ র পর থেকে। লাদেন আমেরিকার দর্প চূর্ণ করতে চেয়েছিল!. পরে সেই লাদেনকে খুঁজে বের করে আমেরিকা উপযুক্ত শাস্তি ঠিক দিয়েছে। আমেরিকা এ ব্যাপরে চরম নিষ্ঠুর। ওরা শত্রুকে ইঁদুরের গর্ত থেকেও ঠিক বের করে এনে বিশ্বকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ওদের মত করে বিচার করবে, এবং কচু কাটার মত কাটবে!…
World Trade Centre Memorial Museum চোখে পড়ল। আশ্চর্য সুন্দর করে আমেরিকা বানিয়েছে। এই অঞ্চলটা এখন খুবই পর্যটকপ্রিয়।
এবার আমরা চলে গেলাম ব্যাটারি পার্কের কাছে। হাতে সময় কম তাই Statue Of Liberty র বিখ্যাত সেই মূর্তি দেখার জন্য টিকিট কেটে বিশাল লাইন দিয়ে লঞ্চে করে আর যাওয়া সম্ভব হয় নি। দূর থেকেই দেখলাম। কিন্তু এটা সত্যিই হাডসন নদীর জলে ফেরীতে করে দেখার মতই একটা সুন্দর সাইট সিয়িং।
Wall Street আরও এক বিখ্যাত জায়গা। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট ট্র্যাম্প এর নামে প্রসিদ্ধ এই জায়গা। এখানে দুটো মজার জিনিস দেখলাম, একটা হল চার্জিং বুল অর্থ্যাৎ একটা ষাঁড়ের চমৎকার পাথুরে মূর্তি। অপরটি হল ফিয়ারলেস গার্ল। নিউইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের সামনে দাঁড়িয়ে পুঁচকে সেই মেয়ে মাথা উঁচু করে দেখছে। এই ফিয়ারলেস গার্ল খুব বিখ্যাত। দেখলাম বহু পর্যটক ওর পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন মজা করে। আমরাও মজা করে ছবি তুলেছি!
এরপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে চলে গেলাম ব্রুকলিন সেতুর কাছে। কিন্তু আকাশ মেঘে মেঘে ভরা ছিল সকাল থেকেই। এবার বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল। বৃষ্টিভেজা হয়েই ব্রুকলিন সেতুর কিছুটা কাছে গেলাম। অনেকটাই যেতে পারলাম না। একটা আফসোস নিয়ে ফিরে এলাম আবার মেট্রোর কাছে।
বেলা হয়ে গিয়েছিল অনেক। খিদে পেয়েছে। কি খাব করতে করতে পথের ধারে স্ট্রিট ফুডের দোকান থেকে কেনা হল লেবানিজ চিকেন রোল। এক একটা রোল ১৬ ডলার! অর্থ্যাৎ এক একটা রোল খেলাম আমাদের টাকায় ১২৫০ গুণে!..
সন্ধেয় ফিরে এলাম ক্লান্ত শরীরে ম্যানহাটনের হোটেলে। একটু বিশ্রাম নিয়ে তৈরী হয়ে নিলাম নিউ জার্সি থেকে আসা অতিথি বন্ধুদের জন্য।
আমার অফিস কলিগ সিনিয়র এক দিদি হলেন মমতাদি। অবসর নিয়েছেন LIC থেকে ১৬ বছর আগে। এখন তিনি নিউজার্সিতে মেয়ের কাছে থাকেন। আমার সাথে নিয়মিত সুন্দর যোগাযোগ রয়েছে। তার এক অন্যতম কারণ “অন্যভুবন- সবুজ পাঠ।” দিদি এবং তাঁর মেয়ে স্বর্গশ্রী সবুজ পাঠের দুই প্রিয়জন। শুভাকাঙ্ক্ষী বন্ধুজন।
মমতাদি, স্বর্গশ্রী ও তাঁর ছেলে অর্ক নিউজার্সি থেকে সময় মত চলে এল আমাদের সাথে দেখা করার জন্য। বিদেশে এতদূরে এসে প্রিয়জনদের সাথে দেখা হয়ে খুব আনন্দ হল। আড্ডা হল অনেক। তারপর আমরা শহরের এক রেস্টুরেন্টে ডিনার করলাম একসাথে। ডিনার স্বর্গশ্রীর দেওয়া ট্রিট। মমতাদিরা চলে গেলেন। তখন আবার ঝিরিঝিরি বৃষ্টি শুরু হল। ইচ্ছে থাকলেও আর রাতের টাইম স্কোয়ারে ঘুরে বেড়ানো গেল না। গুটি গুটি পায়ে ফিরে এলাম হোটেলে।
ক্লান্ত ছিলাম তিনজনই। রাত জেগে আর বেশি গল্প নয়।
গুডনাইট!..
।। ৯ অগাস্ট সকালে নিউইয়র্কের সেন্ট্রাল পার্ক, দুপুরে রেলপথে সিরাকিউজ।।
আজ নিউইয়র্ক ছেড়ে চলে যাব। হাতে সময় শুধু সকালটা। দুপুরে আমেরিকান রেলের স্বাদ নেব। যাব সিরাকিউজ। এই রেলপথ সরকারী নয়। আমেরিকার প্রাইভেট AMTRAK RAIL। ছাড়বে Moynihan Train Hall (New York City) থেকে দুপুর ১.২০ মিনিটে। নিউইয়র্ক থেকে যাবে সোজা নায়াগ্রা ওয়াটার ফলস। মোট ১৬ টা স্টেশন। আমরা নামব নায়াগ্রা থেকে তিনটে স্টেশন আগে ১২ নাম্বার স্টেশন সিরাকিউজ।
খুব ভোরে ঘুম ভেঙে গেল। টাইম জোন ও জেট ল্যাগের কারণে আমার ঘুম যথেষ্ট হচ্ছে না। শরীরজুড়ে একটা ক্লান্তি থেকেই যাচ্ছে।
ঘুম থেকে উঠে সময় নষ্ট না করে চটজলদি তিনজনই লাগেজ গুছিয়ে রেখে নিজেরা তৈরী হয়ে হোটেলের Complimentary Breakfast নিয়ে নিলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে চললাম নিউইয়র্কের অন্যতম সুন্দর পার্ক Central Park দেখতে। আমাদের হোটেল থেকে পাঁচ মিনিট। নিউইয়র্ক অ্যাথলেটিক ক্লাবের ঠিক উল্টোদিকে।
সেন্ট্রাল পার্কের গেটে টাইম স্কোয়ারের সেই রিক্সাগুলোর মত অনেক রিক্সা ও ঘোড়ার গাড়ি রয়েছে। মন চাইলে এসব গাড়িতে চড়েও ঘন্টা ধরে ঘুরে নেওয়া যায়। আমরা একবার আইডিয়া নেওয়ার জন্য একটা রিক্সাওয়ালার সাথে কথা বলে জানলাম মোটামুটি দু’ঘন্টা সে ঘোরাবে জনপ্রতি ৪০ ডলার। সুতরাং প্রশ্নই নেই সকাল সকাল ১২০ ডলার বিসর্জন দেওয়ার। সোহম জি পি এস অন করে নিল, হাঁটতে শুরু করলাম তিনজন। মেয়ে জামাই শ্বশুর!..
মেঘে ঢাকা বৃষ্টিভেজা সেন্ট্রাল পার্কে নানান বয়সী মানুষজনদের দেখলাম শরীর চর্চা নিয়ে মগ্ন। মর্নিং ওয়াক থেকে শুরু করে দৌড়, রেসলিং, সাইকেলিং করে চলেছে যে যার মত। আমেরিকানরা যেমন বিশাল চেহারার মোটাসোটা হয় দেখলাম এই শহরে, তেমন আবার শরীর সচেতন ফিটনেস নিয়ে চর্চা করা বহু আমেরিকানদেরও দেখলাম। শুধু একটা ব্যাপার খুব লক্ষ্য করেছি এখানকার মানুষজনরা কেউ তেমন আলাপী নন। যে যার মত চলে, থাকে। কেমন যেন উদাসীন, উন্নাসীক কেজো ধরণের। আমার তো গায়ে পরে একটু কথা বলার ইচ্ছে দেশ ভ্রমণে গেলে হয়। বাচ্চাদের সাথে খুনসুটি করার লোভ হয় পথে ঘাটে। এখানে সে সুযোগ একদমই হচ্ছে না। তার ওপর ডুলুং এর শাসন, “না, তুমি দুমদাম যেচে কারো সাথে কথা বলতে যাবে না! বাচ্চাদের ছবি তুলবে না!” আরে বাবা একটু কথা না বললে, আলাপ না করলে জানব কি করে দেশটাকে! বুঝব কি করে মানুষগুলো পূর্ণিমা-অমাবস্যায় কেমন থাকে!.. ভাষা সমস্যা তো আছেই। ওদের উচ্চারণ এত দ্রুত, এত খটমটে যে আমার কান ছুঁয়ে চলে যায়। ডুলুং সোহম দেখলাম বেশ রপ্ত করে ফেলেছে। দিব্যি ওদের সাথে কথা বলছে।
সেন্ট্রাল পার্ক ঘুরে বেড়াতে খুব মজা। এই পার্কে ঢুকতে কোনও এন্ট্রি ফি নেই। সকাল ছটা থেকে রাত ১২ টা পর্যন্ত পার্ক খোলা থাকে। আমেরিকার অন্যতম বিখ্যাত পার্ক এটি। ১৮৫৭ সালে পার্কের গোড়াপত্তন হয়েছিল। ম্যানহাটনের আপার ওয়েস্ট সাইড ও আপার ইস্ট সাইড নামক দুটো এলাকার মাঝখানে ৮৪০ একর ছড়ানো সবুজ জমি নিয়ে এই আশ্চর্য সুন্দর পার্ক। সবুজে সবুজ সেন্ট্রাল পার্ক। প্রতি বছর নাকি চার কোটি পর্যটক বেড়াতে আসেন এই পার্কে।
সেন্ট্রাল পার্কে কয়েক লক্ষ নানান ধরণের গাছ রয়েছে। ম্যাপল ট্রি তো অসংখ্য। পাখিও প্রচুর। ফুল আছে নানান ধরণের। প্রচুর মানুষের সাথে বেড়াতে আসে তাদের নিজস্ব আদরের কুকুরসোনারা!
আমরা হাঁটতে হাঁটতে দেখলাম সুন্দর সুন্দর কয়েকটা জায়গা। Bethseda Fountain, The Mall or Literary Walk, Bow Bridge, Sheep Meadow, Belverde Castle। খুব ভালো লাগল। এতবড় একটা পার্ক শহরের পাশেই যে রয়েছে ভাবা যায় না। পার্ক জুড়ে জলাশয়ও রয়েছে। জলাশয়ে কচ্ছপ আছে দেখলাম। বোট ক্লাব চোখে পড়ল।
সকালের অনেকটা জুড়ে ছিল মেঘ ও ঝিরিঝিরি বৃষ্টি। তারমধ্যেই জাত টুরিস্টের মত ঘুরে বেড়ালাম তিনজন। হোটেল চেক আউট এগারোটায়। আমরা দশটার মধ্যে পৌঁছে যাব হোটেলে। স্মার্ট ওয়াচে দেখলাম ইতিমধ্যে ন’হাজার সাতশো স্টেপ হেঁটে ফেলেছি গত দু’ আড়াই ঘন্টায়।
সেন্ট্রাল পার্কের একজায়গায় একটা রিক্সা ফাঁকা দাঁড়িয়ে আছে দেখে বুঝলাম ও নিশ্চয়ই ওয়েটিং এ আছে। টুরিস্টরা ঘুরতে গেছে । ফিরলে নিয়ে যাবে। ডুলুং সোহম কাছাকাছি ছিল না। আমি সাহেবি চেহারার রিক্সাওয়ালার কাছে চলে গেলাম,’ হাই! হ্যালো। গুডমর্নিং। ”
“গুডমর্নিং।”আলাপ হয়ে গেল দুজনের। জানলাম ও এই শহরের লোক নয়। বাড়ি নরওয়ের অসলোতে।
অবাক হলাম শুনে। নরওয়ের যুবক আমেরিকার নিউ ইয়র্কে এসে জীবিকা নিয়েছে রিক্সা চালানোর!
পার্ক ভ্রমণ শেষ করে ফিরে এলাম হোটেলে সময়মত। তারপর একটু বিশ্রাম নিয়ে হোটেল চেক আউট করে মালগুলো হোটেলের লাগেজরুমে রেখে লাঞ্চ করতে বাইরে গেলাম।
আজ আমরা লাঞ্চ করলাম McDonald’s এ।
এখানকার খাবার তুলনামূলক সস্তা ও ভালো। তিনজনে একসাথে লাঞ্চ করতে লাগল ৪০ ডলার। গত তিনদিন ধরে আমেরিকান ফাস্ট ফুডগুলোই খাচ্ছি। একটু একঘেয়ে লাগছে। সোহম বলল, “সিরাকিউজ এ চলুন। আপনাকে ডাল ভাত খাওয়াব!..” আহা! শুনেই কি আনন্দ পেলাম!..
সময় হয়ে এল। এবার চলে যেতে হবে স্টেশন। একটা উবের বুক করা হলো। ম্যানহাটন থেকে রেলওয়ে স্টেশন সামান্য পথ।
নিউইয়র্ক শহরের একটা অন্যতম সুন্দর জিনিস হল থিয়েটার ( BROADWAY)। এই শহরে অনেকগুলো নাট্যহল রয়েছে। এই মুহূর্তে চলছিল কয়েকটা শো-The Great Gatsby, The Lion King, Aladdin, শুধু সময়ের অভাবে আমার প্রিয় একটি সখ না পূরণ করে ফিরে যেতে হচ্ছে।
আড়াইদিনের নিউইয়র্কের স্মৃতি নিয়ে ফিরে চললাম। অনেক কিছু দেখলাম। আবার অনেককিছু দেখাও হল না। হয় না এক ভ্রমণে সব কিছু দেখে নেওয়া। তবু এই আড়াইদিনে নিউইয়র্কের যতটুকু দেখেছি, চিনেছি, তাও কম নয়। পৃথিবীর একটা বড় শহরকে দেখার অভিজ্ঞতা ও আনন্দ নিয়ে এবার চললাম নিউইয়র্কেরই আপস্টেট একটা শান্ত সুন্দর পাহাড়ি শহর সিরাকিউজ। কয়েকটাদিন সিরাকিউজ এ থাকব।
গুডবাই নিউইয়র্ক!.. গুডবাই ম্যানহাটন!..
শুভ দুপুর।
সুন্দর