ক্যাফে গল্পে সুজিত চট্টোপাধ্যায়

রেসের ঘোড়া

স্টার্টারের গুলির শব্দ শোনা মাত্র স্প্রিংয়ের মতো ঘোড়াটা ছিটকে বেড়িয়ে গেলো। ঘোড়াটা ছুটছে। খুউব ছুটছে। ঘোড়ার পিঠে বসে থাকা জকির চুল হাওয়ায় উড়ছে।
রেসের মাঠ লোকে লোকারণ্য। ঘোড়াটার ওপর যারা বাজী ধরেছিলো, তারা নিশ্চিত আজ বেশ বড়ো একটা দাঁও লাগানো গেছে। মাঠে দাঁড়িয়েই কেউ তার একান্ত গোপন বান্ধবীকে ধারাবিবরণী দিচ্ছে। কেউ আজকের সন্ধ্যে এবং রাত কিভাবে কাটাবে তার পরিকল্পনা করে নিচ্ছে। কিছু লাম্পট্যের গন্ধ তাদের আশেপাশে মৃদু পারফিউমের মতো হালকা হাওয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে।
জকি মাঝে মাঝে দর্শকদের সামনে দিয়ে যাবার সময় ‘ বাও ‘করে দিয়ে যাচ্ছে তার টুপি খুলে।তার মুখেও বিজয়ীর হাসি ।
উহ! কি টান টান উত্তেজনা! দূর্বল স্নায়ুর মানুষদের
জন্য কি কোনও ঘোষণা করা হচ্ছে!!!…. ” যাঁদের হৃদয় দৌর্বল্য রয়েছে, তারা মাঠের ঘোড়ার দিকে তাকাবেন না । কোনপ্রকার অঘটনের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নয় ” । কিন্তু কে শোনে কার কথা? এমন মুহূর্তের সাক্ষী হয়ে থাকাটাও কি কিছু কম নাকি?
ঘোড়াটা ছুটছে। প্রত্যেকটা পদক্ষেপ বুঝিয়ে দিচ্ছে গতির মাপকাঠিকে কেন ” হর্স পাওয়ার ” বলা হয়।
বাড়ীর ড্রয়িংরুমে সাজানো ঘোড়ার প্রতিকৃতি কারুর কারুর চোখে ভাসছে।
ঘোড়াটা ছুটছে। ঐ তো ঘোষণা হোলো….” লাস্ট ল্যাপ “। জকির পায়ের আরো একটু মৃদু চাপ ঘোড়াটার পেটে। ঘোড়াটা ছুটছে।
কিন্তু এ কি? ঘোড়াটা জকি শুদ্ধ ছিটকে পড়ে গেলো। মাঠ জুড়ে হৈ হৈ, কোলাহল। হেরে যাবার দুঃখ , সব আধফোটা অস্ফুট শব্দ হয়ে মাঠের চারপাশে মৃত আত্মার মতো ঘুরছে।
কর্মীরা অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সঙ্গে সাদা ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দিয়েছে পড়ে থাকা ঘোড়াটাকে ঘিরে।
জকির প্রিয় ঘোড়া, তাকে এনে দিয়েছে অনেক সম্মান। ঐ ঘেরাটোপের মধ্যে খুব হাতে গোনা দুচারজন মানুষ। ঘোড়াটাকে মেরে ফেলা হবে, সেটাই দস্তুর। বীর কখনও করুণায় বাঁচে না।
শেষবারের মতো জকি তার প্রিয় ঘোড়াকে আদর করে নিচ্ছে। কিন্ত জকি ঘোড়ার মুখের কাছে কান নিয়ে যাচ্ছে কেন?
শেষবারের মতো একবার ঘাড় তুলে ঘোড়াটা বললো… ” ভুলটা আমারই বুঝলে, আমিই তোমাকে আমার সব দূর্বলতা জানিয়ে দিয়েছি। লাস্ট ল্যাপের সময় পেটের কাছে ঐ যে তোমার উত্তেজনাময় প্রবল চাপ… আজ আর সেটাই নিতে পারলাম না। আমারও তো বয়স হচ্ছে । বীরের মতো বাঁচতে চেয়েছিলাম। গৌরবময় জীবন চেয়েছিলাম। রাজাবাজারের মালবাহী গাড়ীর সাথে জীবনটাকে জুড়ে দিতে পারলে আজ গুলি খেয়ে মরতে হতো না। বিদায় বন্ধু ” ।
পরপর দুটো গুলির আওয়াজ। একটার নাম মৃত্যু আর অন্যটার নাম নিশ্চয়তা।

বিশেষ সংযোজন: (কস্মিনকালেও জুয়া, রেস, লটারীর সাথে এই ” নুন আনতে পান্তা ফুরানো ” গল্পবাজের কোনও সম্পর্ক নেই। সম্পূর্ণটাই শ্রুতি নির্ভর ও কল্পনাপ্রসূত। তাই ঘটনার যার্থার্থ্য খুঁজতে যাওয়াটা একেবারেই অর্থহীন।)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।