ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ১০)

সাহারার বুকে অপরূপ টিউনিস ভিলেজ – ফায়য়ুম

মিশর ভ্রমণে গত দশদিন ধরে পিরামিড, মমি, নীল নদ, আলেকজান্দ্রিয়ার বিখ্যাত লাইব্রেরি, ভূমধ্যসাগর, লুক্সারের কর্ণাক টেম্পল দেখার বিস্ময় ও মুগ্ধতা নিয়ে এবার চললাম মরুভূমির পথে – পৃথিবী বিখ্যাত সেই সাহারায়!..

রাজধানী কায়রো থেকে কমবেশি একশো কিমির সড়কপথে বিলাসী বাসে করে চলেছি। রাস্তা খুব মসৃণ সুন্দর। যাওয়ার পথে চোখের সামনে আবার পড়ল সেই গিজা পিরামিড! পিরামিড পরিবার! আর স্ফিংক্স এর অনবদ্য মূর্তি! বাসের জানালা দিয়ে এক ঝলকের একটু দেখায় আবার মুগ্ধ হলাম। আহা! যতবার খুশি দেখা যায়! চক্ষু সার্থক বলে একটা কথা আছে না…সত্যিই বারবার দেখায়ও শুধুই আনন্দ আর মুগ্ধতার বিস্ময় ফিরে ফিরে পাওয়া যায়।

কায়রো শহর ছেড়ে যত এগিয়ে চলেছি দু’পাশের জনশূন্য ধূ ধূ ধূসর মরু রুক্ষ অঞ্চল দেখতে পাচ্ছি। রুক্ষতা ও শূন্যতারও একটা সৌন্দর্য্য থাকে! মিশর ভ্রমণে বারেবারেই সেটা আবিস্কার করেছি। অনুভব করেছি। এভাবেই একসময় পৌঁছে গেলাম হঠাৎ করে এক হ্রদের কাছে। এ এক বিরাট বিস্তৃত হ্রদ। লম্বায় নাকি প্রায় ২০০ কিমি। হ্রদের নাম কারুন(  Lake Qaroun)। নীল নদের শাখা থেকে এর জন্ম। এই হ্রদের জলও নীল টলটলে। বাসের জানালা দিয়ে নীল জলের এই হ্রদ দেখতে দেখতে অনেকটা পথ যাওয়া এক বাড়তি প্রাপ্তি।

আমাদের ইজিপ্টোলজিস্ট গাইড বললেন, এই লেকের এক লোককথার গল্প। এই হ্রদের জল নোনতা। ম্যাজিক লেকও বলা হয়। কারুন হ্রদের ধারে ধারে কিছু ছোট ছোট জনপদ, লোকালয় চোখে পড়ল। রাস্তার দু’পাশে চাষবাস, খেজুর গাছও অনেক দেখলাম।

আজ আমরা সাহারার বুকে গড়ে ওঠা এক টিউনিস ভিলেজ ফায়য়ুমে থাকব। কারুন লেক

থেকে ফায়য়ুম কম বেশি তিরিশ কিমি। খুব সহজেই পৌঁছে গেলাম। ফায়য়ুমে প্রবেশ করেই মন খুশিতে যেন নেচে উঠল। কি অপূর্ব এই টিউনিস ভিলেজ। মরু রুক্ষতায় মোড়া, কিন্তু সবুজেরও ছোঁয়া দিয়ে সাজানো দারুণ সুন্দর কম এল ডিক্কা( Kom El Dikka) ফার্ম হাউসটা। এর বাগিচায় অনেক কমলালেবু ও আঙুর গাছ চোখে পড়ল। কি সুন্দর সব্জি বাগান। বাঁধাকপি, ফুলকপি, বেগুন, ধনেপাতা, গাজর, টমেটোরা বাগানবিলাসী হয়ে হাসছে! এখানেই আমাদের আজকের আস্তানা। সারাদিন সাহারায় টৈ টৈ করে ঘুরে বেড়াব। দু’চোখ ভরে দেখব। ফিরে আসব তারপর এই ফার্ম হাউসে।

কম এল ডিক্কায় চটজলদি মালপত্র রেখে হৈ হৈ করে বেড়িয়ে পড়লাম ওয়েসিস সাফারিতে। লাইন দিয়ে সাফারি গাড়িগুলো ছুটতে শুরু করল। এক একটা গাড়িতে চারজন। সে এক শিহরণ জাগানো মরুযাত্রা। গাড়ির গতি  সবারই প্রায় একশো। সব কটা গাড়ি সমান গতিতে ছুটে চলেছে তপ্ত বালির ওপর দিয়ে। সে এক দুরন্ত দৌড় প্রতিযোগিতা! গাড়িতে বসে এই থ্রিল, এই রোমাঞ্চ অনুভব করার মজাই আলাদা, একদম অন্যরকম। স্টিয়ারিং ধরা দক্ষ চালকরা সবাই চেহারা চরিত্রে আরব বেদুইন! ওদের দেখলেই সমীহ জাগে চোখে।

আজ আমরা তিনটে বিখ্যাত জিনিস দেখব সাহারা মরুভূমির। প্রথমে প্রায় ষাট কিমি পথ পেরিয়ে যাব ওয়াদি আল হিতান( Wadi Al Hita), তিমি উপত্যকা নামে খ্যাত পর্যটকদের কাছে। ইউনেস্কো ওয়াদি আল হিতানকে ওর্য়াল্ড হেরিটেজের মর্যাদা দিয়েছে। এখানে একটি অসাধারণ মিউজিয়াম দেখে মুগ্ধ হয়েছি।  FOSSILS & CLIMATE CHANGE MUSEUM. এই মিউজিয়ামে বিরাট বিরাট দুটো তিমি মাছের স্কেলিটন দেখে অবাক হতে হয়। আরও অনেক এমন কয়েকশো বছরের পুরোনো প্রত্নতাত্বিক উপাদান দিয়ে সাজানো এই যাদুঘর।  ইংরেজি ও আরবী ভাষায় দুটো ডকু ফিল্ম দেখানো হয়। ইংরেজি ভাষায় বলা ছোট্ট ফিল্মটা দেখে অনেক কিছু জানতেও পারলাম।

ওয়াদি আল হিতান এর চারপাশে বালির স্তুপের  পিরামিড রয়েছে বেশ কয়েকটা। প্রকৃতির কি অপরূপ সৃষ্টি। কয়েকশো বছর ধরে এগুলো আজও অক্ষত রয়েছে। বছরের পর বছর পর্যটকরা এসে মুগ্ধ হন।  বিস্ময় চোখে দেখে ফিরে যান।

ওয়াদি আল হিতান থেকে এবার আমরা চললাম ওয়াদি আল রায়ন( Wadi Al Ryan) এর কাছে ছড়ানো কারুন লেক দেখতে। মধ্য দুপুরের গনগনে রোদ্দুরে এই নীল জলের হ্রদকে কি অপরূপ সুন্দর দেখাচ্ছিল। আমরা মুগ্ধ হয়ে এই হ্রদের ধারে টাঙানো বেদুইন তাবুতে বসে মরুরাজ্যে মধ্যাহ্নভোজনের আনন্দ পেলাম। গরম গরম পোলাও ও তন্দুরি চিকেন। সঙ্গে টাটকা স্যালাড। এই রুক্ষতার সৌন্দর্যে হ্রদের ধারে বসে দু’চোখের দৃষ্টিতে যা দেখেছি, তা সারাজীবনের সেরা সঞ্চয়। প্যাংগং লেকের কথা মনে পড়ছিল। আমাদের সেও এক অপরূপা!..

এবার আমরা চললাম মরুভূমির বুকে জলপ্রপাতের জলধ্বনি শুনতে। ওয়াদি আল রায়ান থেকে বেশি দূরে নয়। দুরন্ত গতিতে গাড়িগুলোকে ছুটিয়ে নিয়ে চলে গেল আমাদের বেদুইন চালকরা। এই জলপ্রপাতকে ঘিরে একটা ছোট্ট পর্যটনকেন্দ্র গড়ে উঠেছে। সেই জায়গায় পৌঁছে খুব ভালো লাগল। বড় বড় খেজুর গাছের সারি চারপাশে। মাটির বাড়ি কয়েকটা নান্দনিক ভাবে বানানো। বসে বিশ্রাম নেওয়া যায়। দূরে বহুদূরে চিক চিক করছে কারুন হ্রদ। চারপাশে বালিয়াড়ি। রোদ মরে আসা বিকেলে এখানে বসে কিছুটা সময় কাটাতে বেশ লাগল। জলপ্রপাতের শব্দ  শোনাও বাড়তি আনন্দ।

সারাদিন সাহারায় সমর্পণ করে যখন ফিরে আসছি সূর্যদেব ডুবু ডুবু। পশ্চিম আকাশ রংমহল হয়ে উঠেছে। এদেখার আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করতে পারা সম্ভব নয়। ছবি তুলেও তৃপ্তি হয় না। তাই  চেয়ে চেয়ে শুধুই দেখলাম। হিংসুটে পর্যটকের মত একলা আনন্দ উপভোগ করলাম!

দিনের শেষে টিউনিস ভিলেজে ফিরে এসেছি। ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে কম এল ডিক্কার ঘর- বারান্দায় এসে বসলাম, সন্ধ্যার টিউনিস ভিলেজকে নতুন করে আবিষ্কার করলাম। শান্ত, কোলাহলহীন চারপাশে হাল্কা শীতের আমেজ। দূরে আলোয় চিকচিক করছে কারুন লেকের নীল জল। আরও দূরে দেখা যাচ্ছে পাহাড়শ্রেণী। আকাশে জোনাকির মত তারারা জ্বলছে। আজ  সাহারায় সারাদিন আর ফায়য়ুমের এই সন্ধ্যারাত্রি কোনওদিন ভুলব না।

কিভাবে যাবেন – রাজধানী কায়রো থেকে সড়কপথে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায়। মিশরের অন্যান্য শহর থেকেও সড়কপথে, রেলপথে ও আকাশপথে আসা যায়।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

1 Response

  1. Bandana says:

    Beautiful narration

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।