সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১২)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ (বিকর্ণ)

সিগমুন্ড ফ্রয়েড-এর মতামত অনুযায়ী মানুষের মনের তিনটে স্তর আছে৷ ইড, ইগো এবং সুপার ইগো৷ ইড বা আই ডি হল মনের এমন স্তর যা মানুষের মৌলিক এবং প্রাথমিক প্রবৃত্তি ধারণ করে৷ এটি মনের আবেগপ্রবণ, অচেতন অংশ যা তাৎক্ষণিক সন্তুষ্টি খোঁজার আশার ওপর ভিত্তি করে৷ ইগো অর্থাৎ অহং৷ অহং মানুষের বাস্তববোধ বজায় রাখে৷ আনন্দ ও দুঃখের ব্যালেন্স তৈরি করে এই অহং স্তরটি৷ ফ্রয়েড ইড ও ইগোকে ঘোড়া ও ঘোড়সওয়ারের সাথে তুলনা করেছিলেন৷ ঘোড়া যেমন ঘোড়সওয়ারের দ্বারা চালিত হয় ঠিক তেমনিই অহং ইডকে চালনা করে থাকে৷ আর এর জন্য ইড ও অহং দুই অংশই একে অপরের সাথে সর্বক্ষণ যোগাযোগ করে থাকে৷ এর ওপর ভিত্তি করে বলেছিলেন ইড মূলত দুটি জৈবিক প্রবৃত্তি নিয়ে তৈরি একটি গঠনমূলক ও একটি ধ্বংসমূলক৷ তবে অহং যেহেতু ইডকে চালনা করে তার বলা হয় ইডের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে অহং রাশ টানে৷ বাস্তবতা মেনে কখন কতটা আপোস করতে হবে, বা ইডের সমস্ত চাহিদা যে মেটানো সম্ভব না তা অহংই বলে দেয়৷ অহং আদর্শ বিচার করে৷ তাই ইন্দ্রিয়গত সিস্টেমের সাথে এর ঘনিষ্ট যোগাযোগ৷ এরপর আসছি সুপারইগো নিয়ে৷ সুপারইগো হল মানুষের মনের বিবেক৷ যা চার পাঁচ বছর বয়স থেকেই বিকশিত হয়৷ সুপারইগো মানুষের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে যা নৈতিক ভাবে অবজ্ঞা করা হয়৷ অতয়েব এটি একটি ব্যক্তির চেতনাও বটে৷ যা ইডের ড্রাইভগুলোকে ওভারড্রাইভ করতে পারে৷

এই আলোচনা থেকে বলা যায় একটি মানুষের সুপারইগোর জাগরণ যত বেশি মানুষটি তত বেশি আদর্শবান৷ মহাভারতের চরিত্রদের নিয়ে নাড়াচাড়া করতে গিয়ে মানুষের মনের স্তরগুলি জানা অত্যন্ত প্রয়োজন বলে আমি বিশ্বাস করি৷ কারণ একটা কথা বারবার মনে হয়েছে এই মহাকাব্য নিছকই কোনও সাধারণ কাহিনী নয় যা একটি যুদ্ধের নিঁখুত নীতির বিবরণ ও ধর্ম প্রতিষ্ঠার কারণে লেখা হয়েছে৷ এর প্রতিটি চরিত্রের আলাদা আলাদা মানসিক গঠন আমাদের বলে দেয় আমাদের প্রত্যেকের ভেতরেও এই সমস্তই আছে। আমরা কাকে প্রশ্রয় দেব তা আমাদের মস্তিষ্ক এবং সুপারইগো ঠিক করে দেবে৷ এই যেমন ধরা যাক বিকর্ণ চরিত্রটি। একশ’ কৌরব যারা প্রত্যেকেই অধর্মের আখড়া তাদের মধ্যেও একটি ব্যতিক্রম জুটে গেছে৷ যেন বিকর্ণ চরিত্রের জন্যই তৈরি হয়েছিল সেই বিখ্যাত প্রবাদ “গোবরে পদ্মফুল”। গান্ধারী বা ধৃতরাষ্ট্র কেউই কিন্তু এতখানি হিংসাত্মক মনোভাবাপন্ন নয় যতটা বাকি নিরানব্বই কৌরব সন্তানকে দেখা গেছে৷ কেন তারা প্রত্যেকেই এক? শুধু মাত্র জ্যেষ্ঠ্য ভাই দুর্যোধনকে অনুসরণ করার কারণ নাকি অন্যকিছু? একটি পর্বে দেখা গেছে গান্ধারী তার ভাই শকুনিকে দুষছেন৷ বলছেন কেন তার সন্তানদের কুমন্ত্রণা দিয়ে নষ্ট করে দিচ্ছেন? কেনই বা শকুনি তার নিজ রাজ্যে ফিরে যাচ্ছেন না! দুর্যোধনের ভেতর বুনে দিয়েছিল সিংহাসন পাওয়ার লোভের বীজ৷ তাতে সার, রোদ, জল দিয়ে পরিচর্যা করতে সামান্যতম ভুলও করেনি শকুনি৷ আর এই কারণেই হয়তো দুর্যোধনের সুপারইগো জেগেই ওঠেনি। বলা যায় জাগতে দেওয়া হয়নি। বিকর্ণ এমনই একজন যিনি শকুনি বা দুর্যোধনের সাথে এতোখানি সংস্পর্শে ছিলেন না, সে কারণেই হয়তো তাঁর সুপারইগো জেগে ছিল৷ কিন্তু বাকি জনেরা? ছোট ভাই হবার কারণে কি শুধুই আনুগত্য-ধর্ম পালন করে গেছে? তবে বিকর্ণ? সে কিভাবে এতো আলাদা? কিভাবে তার মন বাকিদের মতো কলুষিত হতে পারল না৷ অথচ আলাদা হয়েও মহাভারতে তার বিশাল কোন জায়গায় ঠাঁই নেই৷ খুবই সামান্য অংশে, যেন না থাকলেও চলত৷ আবার যেটুকু তার প্রকাশ সেইটুকু থাকতেও হত।

বিকর্ণ- ধৃতরাষ্ট্র ও গান্ধারীর মাটির কলসিতে জন্ম নেওয়া তৃতীয় সন্তান৷ বাকি কৌরব ও পান্ডবদের সাথেই তাঁর শিক্ষালাভ ঘটে কৃপাচার্য, দ্রোণাচার্য ও ভীষ্মের হাত ধরে৷ তিনি ছিলেন মহান ধনুর্ধর৷ স্বয়ং শ্রী কৃষ্ণের বর্ণনায় ভগবত গীতাতেও তাঁকে মহান যোদ্ধা হিসেবে দেখানো হয়েছে৷ এও বলা হয়েছে কৌরব পক্ষে অশ্বত্থামা ও কর্ণের পর কেউ যদি মহান ধনুর্ধর হন তিনি হলেন বিকর্ণ। আর ওই একশ’ কৌরবের মধ্যে কেউ যদি ধর্মের পথে চলে এবং সত্যের সাথে দাঁড়িয়ে থাকেন তিনি হলেন একমাত্র বিকর্ণ। অথচ বিকর্ণকে নিয়ে মহাভারতের কোন একটা পর্বেও বিশেষ উল্লাস দেখা যায় না। এমনকি তার জন্য আলাদা কোন দৃষ্টি বরাদ্দ হয়নি। ছোট থেকে বড় হওয়া পর্যন্ত তাঁর বিশেষ কোনো আবির্ভাব দেখা যায় না। এমনকি শিক্ষাকালীন জীবনে তার ধনুর বিদ্যারও আলাদা নিদর্শন দেখতে পাই না। অথচ যেটুকু সময় বা মুহুর্তে তিনি উল্লেখিত হয়েছেন, বারবারই প্রজ্জ্বলিত হয়েছে আদর্শ, ধর্ম এবং ন্যায়ের দীপ। এ যেন অবহেলায় কিংবা লাঞ্ছনায় পড়ে থাকা একটি হীরের টুকরো।

চলবে…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।