গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

লোডশেডিং
বাবার আর্ম চেয়ারটাতে গা এলিয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করে রয়েছে বিলু। সন্ধ্যার আলো আঁধারে বাগানের দিকের ব্যালকনিতে একলা নিরিবিলিতে নিজের সাথে মুখোমুখি হয়েছে অনেকদিন পরে। বাবার মাথা খারাপ হয়ে যাবার পর থেকে একাহাতে বাবাকে আর নিজেকে সামলে রাখার দায়িত্ব পালন করেছে আবার নিজের ভবিষ্যতের পথ খুঁজে বের করতে হয়েছে। তাই মায়ের মৃত্যুর পর থেকে আজ পর্যন্ত নিজেকে দেখার সময় হয় নি।
আজ ওর বাবার শ্রাদ্ধের নিয়ম ভঙ্গ ছিল। পাড়াপরশি, আত্মীয়স্বজনরা মোটামুটি সকলেই এসেছিল বিলু’র বাবার কাজে। বিলু’র মা আর ভাই মারা গেছে অনেকদিন আগেই। বাবাই ছিল সংসারের একমাত্র আপনজন। আজ সে ও ছবি হয়ে গেল। বিলু’র মনে পড়ে মায়ের কথা ।
বিলু তখন ক্লাস এইটে আর ভাই ফাইভে। সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারে যেমন একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকে বিলুদেরও তেমনি একটা বাড়ি ছিল। শান্তিপ্রিয় মানুষ বলে বিলুর বাবার যথেষ্ট সুনাম ছিল পাড়ায়। পাড়ার কাকু – জেঠুরা মাঝে মাঝে আসতো বাবার কাছে পাড়ার
বিভিন্ন বিষয়ে আলাপ আলোচনার জন্য। আর রোজ বিকেলে মায়ের বন্ধুরা মানে পাড়ার কাকিমা জেঠিমাদের গল্পের আসর ছিল কমপাল্সারি।
ওদের দুই ভাইয়ের লেখাপড়ার জন্য তখন সরু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দোতলা তৈরি করানো হয়েছিল কাঠ দিয়ে ঠিক যেন ঘরের মধ্যে ঘর। পরে অবশ্য দুই ছেলের আবদারে রাতে ঘুমানোর ব্যবস্থাও করে দেওয়া হয় দোতলাতে।
লাল সিমেন্টের মেঝেওয়ালা ঠাকুরঘর, রান্নাঘর, ভাঁড়ারঘর, কলঘর, বাবামায়ের শোবারঘর – সব ছিল একতলাতেই। বাড়িতে আত্মীয়স্বজন এলে নীচেরঘরে অনেক রাত পর্যন্ত হৈচৈ হতো।
আর পাঁচটা দিনের মতো সেদিন রাতেও ওরা দুভাই ওপরেই ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ অনেক রাতে লোকজনের গলার আওয়াজে ঘুম ভেঙে যায় বিলুর। ঘুমের ঘোরে ওপর থেকে কিছু বুঝতে না পেরে তাড়াতাড়ি নিচে নেমে আসে। দেখে ওর মা’কে কলঘর থেকে কয়েকজন মিলে ধরাধরি করে বার করছে। আর বাবা খুব কাঁদছে। বিলু দৌড়ে যায় কলঘরের দিকে। দেখে কলঘরের মেঝেতে চাপচাপ রক্ত।
মা টয়েলেট গিয়েছিল। কিন্তু লোডশেডিং হয়ে যেতেই হঠাৎ অন্ধকারে জলের বালতিতে আটকে গিয়ে পা স্লিপ করে আর মা লোহার বালতির হাতলের উঁচু গোলটার ওপর বসে পড়ে। ফলে সেটা শরীরের মধ্যে ঢুকে যায়। আর মা চিৎকার করে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়।
এরমধ্যেই বাবা নান্টু’ বলে
চিৎকার করে ওঠে। ততক্ষণে আশেপাশের বাড়ির কাকিমা জেঠিমারা বিলুদের বাড়িতে চলে এসেছে। বাবার চিৎকার শুনে সন্তুকাকিমা ছুটে ঘরে যায় আর’ এই নান্টু’ বলে জোরে জোরে ডাকতে থাকে। এরমধ্যেই শোভাকাকিমা, শিলুর মা সবাই মিলে ভাইকে ধরাধরি করে তুলতে চেষ্টা করতে থাকে।
একে তো লোডশেডিং, তাতে একটা হ্যারিকেন বারান্দায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ঘরে ছোট মোমবাতির আলো । তারমধ্যেই ঘুমের ঘোরে ওপর থেকে নামতে গিয়ে ভাই সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে গেছে।
নয়ন জেঠুরা সেই রাতে চ্যাটার্জি কাকিমাদের ড্রাইভারকে ঘুম থেকে তুলে এনে কাকিমাদেরই বাড়ির গাড়ি নিয়ে এসে মাকে আর ভাইকে হসপিটালে নিয়ে যায়।
ভাইয়ের মাথায় এমনভাবে চোট লাগে যে মাথায় রক্ত জমাট বেঁধে যায়। দুদিন যমে মানুষে টানাটানির পর সব শেষ হয়ে যায়। মাকে তো খুবই খারাপ অবস্থায় ভর্তি করানো হয়েছিল। তবুও লড়াইটা চালিয়ে যাচ্ছিল।
কিন্তু ভাইয়ের মৃত্যুর খবর শুনে এমন একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল যে মায়ের প্রাণপাখিটাই উড়ে গেল।
সেই থেকে বাবার মাথার গন্ডগোল শুরু হয়। যত দিনগেছে ততই সেটা বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত উন্মাদ হয়ে গেছিল। যখন তখন বাইরে চলে যেত। সবিতাদি’ যদিও সারাক্ষণ থাকত। তবে রান্নাবান্নার সব কাজ করত বলে কখনো কখনো একটু চোখের আড়াল হয়ে যেত বাবা। তবে
গিরি’দার দোকানের সামনে যারাই থাকতো বাবাকে ধরে বাড়িতে দিয়ে যেত। সেদিন কোন ফাঁকে বড় রাস্তায় চলে গেছিল আর ট্রাকের ধাক্কা লেগে ছিটকে পড়ে ফুটপাথে আর ওখানেই শেষ হয়ে যায়।
আজকের সন্ধ্যায় বিলু যখন নিজেই নিজের মুখোমুখি হয়েছে তখন মনের মধ্যে একটা প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে – কেন এরকম হল? জ্ঞান হবার পর থেকে তো লোডশেডিং দেখেই আসছে। এটা তো গা সওয়া ব্যপার। ইলেকট্রিক বিলে যতই অনিয়ম থাক, যতই সময় মতো বিল দেয়া হোকনা কেন পাওয়ার কাট কেন হবে – এ প্রশ্নের জবাব কেউ দেবেনা। একবার কেউ ভেবে দেখে না হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেলে কতরকম বিপদ হতে পারে!
একটা লোডশেডিং মানুষের ভাগ্যকে কিভাবে অন্ধকারে ঠেলে দেয় তা বলে বোঝানো যাবে না।