সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে নীলম সামন্ত (পর্ব – ১)

মহাভারতের মহা-নির্মাণ
যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত।
অভ্যুত্থানম অধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্॥
পরিত্রাণায় হি সাধুনাং বিনাশয় চ দুষ্কৃতাম।
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভবামি যুগে যুগে॥
… মনে পড়ছে ছোটবেলা? প্রতি রবিবার সকাল ন’টা। মহেন্দ্র কাপুরের গলায় শোনা যাচ্ছে ‘অথ শ্রী মহাভারত কথা’৷ তারপর কেউ বলছে ‘ ম্যায় সময় হুঁ…’
কবি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন বেদব্যাসের মহান সৃষ্টি মহাভারত। কিভাবে লিখেছিলেন মনে আছে? মহাভারতেই সে কথা লেখা আছে৷ হিমালয়ের এক পবিত্র গুহায় মহর্ষি বেদব্যাস তপস্যারত ছিলেন, আর সেই সময়ই এই মহাকাব্যের পুরো ঘটনাটা ভেবে নিয়ে মনে মনে রচনা করে ফেলেন৷ কিন্তু মানস রচনাই তো সব নয় তাকে লিপিবদ্ধ না করলে বিশ্ব দরবারে এই রচনার কোন ঠাঁই নেই৷ বেদব্যাস পৃথিবী ছাড়ার সাথে সাথে এই রচনাও হারিয়ে যাবে৷ এ কথা কি আর কবি নিজে জানতেন না? নিশ্চই জানতেন৷ আর জানতেন বলেইন সিদ্ধিদাতা গণেশকে দিয়ে লেখাতে চাইলেন৷ গণেশ রাজি হয়েছিলেন ঠিকই কিন্তু শর্ত আরোপ করেছিলেন৷ শর্তটা ছিল, তিনি একবার লেখা শুরু করলে তার শেষ না হওয়া পর্যন্ত বেদব্যাস আবৃত্তি একটিবারও থামতে পারবে না। এভাবে কিভাবে সম্ভব? পর পর শ্লোক ভেবে আবৃত্তি করা কি খুব সোজা? তাই বেদব্যাসও বুদ্ধি খাটালেন৷ বললেন “গণেশ যে শ্লোকটি লিখবেন, তার মর্মার্থ না বুঝে লিখতে পারবেন না”। গণেশও রাজি হয়ে গেলেন৷ লেখা শুরু হল, আর মাঝে মাঝেই বেদব্যাস করলেন কি, কিছু কঠিন শ্লোক রচনা করে বলতেন, খুব স্বাভাবিক ভাবে সেগুলো গণেশ সহজে বুঝতে পারতেন না৷ সময় নিতেন৷ আর সেই ফাঁকে তিনি পরবর্তী শ্লোকগুলো ভেবে নিতেন৷ এভাবেই প্রায় তিন বছর ধরে লেখা হল ভারতের দ্বিতীয় মহাকাব্য মহাভারত৷
এই নামকরণের পেছনে একটি আখ্যান প্রচলিত আছে, তুলাযন্ত্রের একদিকে চারটি বেদ (ঋক, সাম, যজু, অথর্ব) ও অন্যদিকে এই মহাকাব্যের বইটি রাখলে দেখা যায় মহাকাব্যের ওজন চারটি বেদের তুলনায় অনেকটাই বেশি। তাই ‘মহাভারত’। একে পঞ্চম বেদ বলেও আখ্যা দেওয়া হয়। এবং বলা হয় “মহত্ত্বাদ ভারতবত্ত্বাচ্চ মহাভারতমুচ্যতে”। অর্থাৎ “যা নেই ভারতে তা নেই মহাভারতে”।
এখন কথা হচ্ছে, মহাভারত রচনা হয়েছিল আজ থেকে প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে৷ আজ তার গুরুত্ব কতখানি? নানান গবেষকদের গবেষণা পড়ে, বই পড়ে এবং মহাভারতের নানান ঘটনাবলি পড়ে শুনে মনে হয় বর্তমান সমাজ সংস্কৃতি এবং সাহিত্যে মহাভারত যথেষ্টই প্রাসঙ্গিক। মহাভারত তো শুধু ঘটনাপ্রবাহ নয়, ধর্মনীতি, রাজনীতি, তৎকালীন সমাজ ব্যবস্থা এমনকি মানুষের মনঃস্তাত্ত্বিক দিকগুলিও বিস্তৃতভাবে তুলে ধরা হয়েছে যার মিল পাঁচ হাজার বছর পরেও দেখতে পাই। অর্থাৎ আজকের সমাজেও সেই মানসিকতা, মানুষের চালচলন, উদ্দেশ্য ইত্যাদিতে দেখতে পাই। তবে কি বেদব্যাস এতখানি ভবিষ্যতের কথা ভেবেছিলেন নাকি সমাজ আসলে ঘূর্ণাবর্তে ঘুরছে?
মহাকাব্যে বলা হয়েছে গঙ্গা অভিশপ্ত হয়ে মর্তে নেমে আসার পর শান্তনুর সাথে বিবাহ হয়। বিয়ের পর যখন সন্তান জন্ম হয় গঙ্গাদেবী তাদের নদীতে ভাসিয়ে দিতেন৷ পরপর সাত জনকে ভাসিয়ে আট নম্বর সন্তান অর্থাৎ ভীষ্মকে বড় করে শান্তনুর হাতে তুলে দিয়েছিলেন। এই সাত সন্তান বিসর্জনের পেছনেও কাহিনী ছিল, এই সাতজন আসলে অষ্টবসুর সাত বসু যাদের অভিশাপ ছিল এক বছর মনুষ্য জন্ম ভোগ করা আর অষ্টম বসু দ্যু-বসু মনুষ্য জীবন ভোগ করবেন বহুকাল ধরে। সেই দ্যু-বসুই হলেন ভীষ্ম৷ গঙ্গাদেবী এই কাজ কেন করতেন? নিশ্চয়ই পুণ্য লোভের মোহে। এত গেল মহাকাব্যের গল্প তাও পাঁচ হাজার বছর আগেকার৷ চলুন একশ’ বছর আগে ঘুরে আসি যখন সাগরদ্বীপে নভেম্বর থেকে জানুয়ারি মাসের পূর্ণিমা গুলোতে অনেক তীর্থযাত্রী আসতেন। এখনও আসেন; কনকনে ঠান্ডা কিংবা বাঘ কুমির অন্যান্য পশু জন্তুদের আক্রমণ উপেক্ষা করেই আসেন। সেই সময় একদল মহিলা আসতেন গঙ্গার বুকে নিজেদের সন্তান উৎসর্গ করতে। জ্যান্ত শিশুদের ঠেলে ফেলে দেওয়া হত কিংবা একদম ছোট্ট শিশুদের বা সদ্যোজাত এদের ঝুড়িতে করে ভাসিয়ে দেয়া হত। তাদের মধ্যে অনেকেই পশুদের পেটে যেত, কেউ বা অতলে তলিয়ে যেত। অনেক মহিলাই যারা দুর্গম পথ পার করে সাগরদ্বীপে আসতে পারতো না তারা কাছাকাছি গঙ্গায় নিজেদের সন্তান উৎসর্গ করত। এই উৎসর্গের কারণ হল গঙ্গার সন্তুষ্টি এবং ওই মহিলাদের পুণ্য অর্জন। আচ্ছা ভেবে দেখুন তো কিভাবে পুন্য অর্জন করে নেয়? পাঁচ হাজার বছর আগে সাত সন্তান ভাসিয়ে দেওয়ার সময় গঙ্গাও তো মা ছিলেন তাকেও নৃশংস হতে হয়েছিল ঠিক একশ’ বছর আগের মহিলাদের মতো। ভাগ্যিস রাজা রামমোহন রায় ছিলেন এই নৃশংস আচরণ থেকে মূর্খ মহিলারা নিজেদের বার করতে পেরেছেন। এবার বর্তমান সমাজে চলে আসি এখন হয়তো মায়েরা সন্তান বিসর্জন দেন না গঙ্গায় গিয়ে কিন্তু অনেক মা-ই জন্মের পর সন্তান ফেলে চলে যান হয়তো বা সমাজের কাছে মুখ লুকোতে হয়তো বা আর্থিক অনটনের কারণে, সেই সন্তান অন্য কেউ নিয়ে বড় করেন, কিংবা অনাথ আশ্রমে, শুধু প্রকৃতির উদরস্থ হয় না, আবার কোন কোন ক্ষেত্রে সন্তানের প্রতি মায়েদের পারিবারিক আচরণ, সন্তানের প্রতি ব্যবহার কোথাও গিয়ে কি মনে হয় না সন্তানের স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা কে রোধ করে দিচ্ছেন কিংবা বলা যায় সন্তানের জীবনটাই স্বাভাবিক জীবনের থেকে সরিয়ে নিয়ে গিয়ে অজান্তেই বিসর্জন দিয়ে দিচ্ছেন। শুধু কি জলে ভাসানোই ভাসিয়ে দেওয়া? তবে এসব যেসব ক্ষেত্রেই ঘটে সে কথা বলবো না।
আবার দেখুন, গুরু দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্র শিক্ষায় পান্ডবরা এগিয়ে গেলেন, পরীক্ষায় ভালো ফল করলেন। বিশেষ করে অর্জুন তার অস্ত্র কৌশলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন এমনকি গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রুপদ রাজাকেই জীবিত বেঁধে আনলেন। যেহেতু এই কর্মকাণ্ড গুরুদক্ষিণা ছিল তাই দ্রুপদ রাজা ক্ষুন্ন হলেন না, কিন্তু ধৃতরাষ্ট্র বেশ বুঝেছিলেন হস্তিনাপুর সিংহাসন তাঁর সন্তানদের জন্য নিষ্কণ্টক থাকছে না। অস্থির হয়ে বিদ্বজনের কাছ থেকে পরামর্শ নিতে শুরু করলেন কিন্তু তাতে খুব একটা উপকৃত হলেন না। দুর্যোধন নানান উপায় তাঁকে বোঝাতে শুরু করলে তিনি পাল্টা বোঝান যুধিষ্ঠিরের ধর্মপরায়নতা এবং সভাসদদের প্রতি তার ভালোবাসা, যার ফলে পান্ডুর রাজসভা বেশ উপকৃতই ছিলে। এমত অবস্থায় দূর্যোধনের লোলুপ মন এবং ওপর চালাকি দেখা যায় তিনি বলেন এই সমস্ত মন্ত্রী সভাসদদের টাকার বিনিময়ে কিনে নিতে তার দু’দিনও সময় লাগবে না। ঘটনাও সেরকমই ঘটলো। টাকা খেয়ে ওই রাজসভার সভাসদরা পান্ডবদের বারাণবতে চলে যাওয়ার উৎসাহ দিতে লাগলেন। অর্থের লোভ বড় লোভ৷ এই জিনিস কি আজকের দিনে আমরা দেখতে পাই না? বৃহত্তর রাজনৈতিক দুনিয়ায় কিংবা পারিবারিক কূটকচালিতে, বিচারালয়ে দুটো টাকার বিনিময়ে কিংবা এক পেট খাওয়ার বিনিময়ে মানুষ তার সততা ভুলে যায়। সে যুগে যেমনই থাক যতটুকুই থাক বর্তমান সমাজে এ দৃশ্য অহরহ এবং চোখে পড়ার মতোই ঝকঝকে।
দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ ঘটনাটাও যদি দেখি, মহান নেতা, ধর্মপরায়ণ যুধিষ্ঠিরও মেতে গেলেন পাশার গোলকধাঁধায়৷ রাজ্য চলে গেল, সর্বহারা হলেন এমন কি স্ত্রীকেও বাজি রাখতে থামলেন না। ভরা সভায় স্বামী দেওর শ্বশুর সবার সামনে পঞ্চপান্ডব ভার্যার বস্ত্রহরণ করা হচ্ছে, তিনি রজঃস্বলা, বস্ত্রের নানা অংশে তার দূষিত রক্তের দাগ। সারা পরিবার দেখছেন। একি নারী নির্যাতন নয়? একজন নারীকে হাটের মাঝে এভাবে বিবস্ত্র করার অর্থ কি তার প্রতি খুব সম্মান জানানো? না কখনোই না। আজ সমাজ উন্নত হয়েছে বলে আমরা গর্ব করি কিন্তু নারীকে লুকিয়ে ছুঁয়ে ফেলা, তার আচল ধরে টান মারা কিংবা চুড়িদারের ওড়না ধরে টান মারা, জবরদস্তি বিবস্ত্র করে যৌন লিপ্সা মেটানো, এগুলো চলে যায়নি। পাঁচ হাজার বছর পরেও এই দৃশ্য অটল, বলা ভালো নারীদের প্রতি এই ব্যবহার বাতাসে মুখরিত হয়। সেই জিনিস নিয়ে লড়াই হয়, খবরের কাগজে ফলাও করে বেরোয়। নারীর লজ্জা হয়। নারী কুঁকড়ে যায়। শুধু কোন কেশব আসে না তাকে বাঁচিয়ে নিতে।
এই সমস্ত ঘটনার মিল ছাড়াও মহাভারত একটি শিক্ষনীয় মহাকাব্য। যেমন ধরুন কৃষ্ণ বিষ্ণুর অবতার হেতু কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ পলকেই শেষ করে দিতে পারতেন কিন্তু পান্ডবদের পক্ষে তিনি অস্ত্র না ধরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এতে করে বোঝা যায় আমাদেরর লড়াই টা আমাদেরই লড়তে হবে কোন নেতা বা ঈশ্বর এসে লড়ে দেবে না। আবার অর্জুনকেই দেখুন না লক্ষ্য কিভাবে স্থির রাখতে হয়, মনসংযোগ করে বুলস আই-এ তীর ছুড়তে পারাটাই সাফল্য। ধৃতরাষ্ট্র রাজা যেমনই হোক কিংবা মানুষ যেমনই হোক বাবা হিসেবে একেবারেই সফল নন কারণ তাঁর সন্তানদের তিনি উচিত শিক্ষাটাই দিতে পারেননি। অন্ধ স্নেহে ধ্বংসটা তিনি ডেকেছিলেন। মনে পড়ে Charity begins at home. বাবা হয়ে তিনি ঘরকেই শিক্ষাদান করতে পারলেন না। কপালের দোহাই দিলেন বললেন এসব দৈব। সত্যিই কি দৈব? ঈশ্বরের খেয়েদেয়ে কাজ নেই সবার কপালে পাপ পুণ্য হিসেব করে করে লিখছেন। অথচ দেখুন না গীতাতেই লেখা রয়েছে মানুষের পাপ পুণ্য কোনটাই আগে থেকে নির্ধারিত থাকে না। তার আচরণ স্বভাব ও কর্মসিদ্ধান্ত তাকে পথ দেখায় এবং পাপ পূণ্যে তুলনামূল্য বিচারে নিয়ে যায়।
মহাভারতের প্রতিটা চরিত্রই জীবনযাপনের নানা কথা বলে, তা সে বিজ্ঞানসম্মতভাবেই হোক আর সমাজসম্মত ভাবেই হোক। আমি চেষ্টা করছি বেশ কিছু চরিত্র ও তার সাথে জড়িত ঘটনা সমেত এই দিকগুলি আলোচনা করার।