সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (অন্তিম পর্ব)

সাদা মিহি বালি
সপ্তম অধ্যায়
তৃতীয় পর্ব-
রুমা ও মনোরমা, এবার বি এ
ফাইন্যাল পরীক্ষা দিয়েছে; দু’জনেই ভালো ছাত্রী, পরীক্ষায় যে ভালো ফল করবে, তা নিশ্চিত। রুমা, এখন প্রায় দিনই মনোরমার সাথে গল্প করতে আসে, অনেক দিন রাতে থেকেও যায়। রাঘবেন্দ্র বাবু ও রমনী একটু স্বস্তি বোধ করছেন, ভাবেন, মনোরমার মুখের সেই বিষন্ন ভাবটা কেটে গেছে, মেয়েটা, এখন শোক ভুলে একটু হাসাহাসি করছে; কিন্তু, এরপর!
সেদিন দুপুরে, রুমার মুখোমুখি হতেই রাঘবেন্দ্রবাবু, রুমাকে ওদের বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করলেন, “জেঠিমার( ইন্দুমতী ) শরীর কেমন আছে? নারায়নের শরীর ভালো তো? ”
“হ্যাঁ জেঠু, সবাই ভালো আছেন। ঠাম্মী, এখনও প্রায় দিনই শকুন্তলা- দুষ্মন্তের ইতিবৃত্ত পুঙ্খানুপুঙ্খ ভাবে আমাদের শোনায়। ”
” হ্যাঁ, জেঠিমাদের সময়ে তো মেয়েদের পড়াশোনার চল ছিল না, সবটাই তিনি নিজের উদ্যোগে শিখেছেন, অবশ্যই জেঠুর সক্রিয় অনুমোদন ছিল। ”
“জেঠু,মনোরমা আজ আমাদের বাড়ি যাবে, কয়েকদিন থাকবে ওখানে, ঠাম্মী বলে পাঠিয়েছেন। ”
“বেশ তো, তোমার জেঠিমাকে বলে, তোমরা সব গুছিয়ে- টুছিয়ে
নিয়ে তৈরি হয়ে নাও”, বলে রাঘবেন্দ্রবাবু নীচের অফিস ঘরের দিকে পা বাড়ালেন।
মনোরমা ও রুমা, নারায়ণের বাড়ি গেছে; মনোরমা, ওখানে কয়েকদিন থাকবে । বাড়ির দোতলায় কেবল রাঘবেন্দ্রবাবু ও
রমনী; বড় খাঁ, খাঁ করছে দোতলা।
দূরের পতিত- পাবনীর দিকে চেয়ে
রাঘবেন্দ্রবাবু চিন্তামগ্ন আছেন। নীচের অফিস থেকে মাঝে মাঝে কথার শব্দ এসে তাঁর চিন্তায় ছেদ আনছে। গুঞ্জনই সব দেখাশোনা
করে;অমরের খুনিরা এখনও ধরা পড়েনি;শিবশঙ্কর, আজ এম এল এ, তবুও তার কথায় পুলিশ কোন কর্ণপাত করে না; কারণ, পুলিশ কেবল পুলিশ মন্ত্রীর অনুগত; আর তিনি ঐ সব অসামাজিকের পৃষ্ঠ- পোষক, তবে আর তাদের পায় কে! পুলিশ, বাধ্য হয়ে খুনিদের ফেরার দেখায়; সারা দেশে এখন বিরাজ করছে শুধুই হতাশা;তিনি চিন্তার মাঝেই দীর্ঘশ্বাস ফেলেন; স্বাধীনোত্তরে মানুষের (রিত্র ্টা্ট্টা্্টা্ট্টা্টা্ট্টা্্টা্ট্টা) চরিত্র বদলে গেছে, মানুষের মনুষ্যত্ব আজ আর নেই বললেই চলে। অফিসের দরজার কাছেই পোস্টম্যানের সাইকেলের ঘণ্টির আওয়াজ পেতেই তিনি সচকিত হয়ে দেখলেন, অফিসের পিয়ন টেলিগ্রামের কাগজটা নিয়ে অফিসের ভিতরে ঢুকছে।
হ্যাঁ, টেলিগ্রামটা পাঠিয়েছে
রোহন; লিখেছে, ” coming tomorrow “, একটু অবাকই হলেন, রোহন তো টেলিগ্রাম করে আসে না। যাই হোক, রমনীকে
সংবাদ টা দিলেন ।
একটু পরেই, তাঁরা দেখলেন, রিক্সা থেকে জেঠিমা ও নারায়ণ নামছে । রমনী, নীচে নেমে জেঠ- শ্বাশুড়ীকে বললো, “আসুন,আসুন জেঠিমা; আপনি, কষ্ট করে কেন আসতে গেলেন, আমাদের খবর পাঠালে, আমরাই যেতাম। ”
“হ্যাঁ, যেতে নিশ্চয়ই; সে বিশ্বাস আমার আছে; আমার ছেলেরা আমাকে যথেষ্ট সম্মান করে; আর ঘোষাল বড়ির ফসিলের মধ্যে আমিই তো এখনও রয়ে গেছি। যাবার আগে প্রজন্মদের মধ্যে
মনুষ্যত্বের আলোক বর্তিকা জ্বেলে, তাদের চলার পথকে মসৃণ করতে পারলে, আমি স্বস্তিতে শেষ নিঃশ্বাস নিতে পারি। ”
“আপনার রোহন, কাল আসছে, বলে টেলিগ্রাম পাঠিয়েছে; এই মাত্র পোষ্টম্যান, সেটা দিয়ে গেল; বুঝতে পারছি না, এভাবে টেলিগ্রাম পাঠিয়ে তো আসে না” বলে রমনী, জেঠিমাকে দোতলায় উঠিয়ে চেয়ারে বসাল।
“হ্যাঁ, আমিই দাদুভাইকে আসবার জন্য টেলিগ্রাম করেছিলাম, তাই রোহন আগামীকাল আসছে; আর রুমাও আমার কথামত মনোরমাকে নিয়ে আমাদের ওবাড়িতে গেছে, পাছে, আমাদের খোলাখুলি আলোচনায় সে বা আমরা কোন অস্বস্তি বোধ করি; আমরা যেন একটা নিশ্চিত সিদ্ধান্তে আসতে পারি। ”
” মনোরমার পরীক্ষা শেষ, রেজাল্টও কয়েকদিন পরেই বেরোবে। আমার দাদু- ভাই ও মনোরমার চারহাত এক করে, মনোরমার মাথায় আবার সিঁদুরের পরশ দিয়ে তাকে সধবার বেশে দেখতে চাই; ওরা দু’জনে নতুন জীবনে চলুক, ওদের চলার পথ যেন ঔজ্জ্বল্যে ভরে ওঠে, সেই কামনা করাই আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত বলে মনে করি। মনে কোন দ্বিধা না রেখে, পরিষ্কার ভাবে, খোলা মনে আলোচনার জন্যই আমি তোমাদের এখানে এসেছি। এবার প্রশ্ন হচ্ছে, পাত্র- পাত্রীর মতামত। যতদূর আমি জেনেছি, মনোরমা বুদ্ধি -সম্পন্না,
বয়সও খুবই অল্প, পুরোনোকে
আঁকড়ে ধরে থাকার মত মেয়ে নয়, আর আমার দাদুভাই’র মনের
খোঁজ নিশ্চয়ই তোমরা, আমার চেয়ে বেশি জানো বলে মনে হয় না। রোহন ও মনোরমার মধ্যে সামাজিক স্থাপনের মাধ্যমে, আমরা, ওদের নতুন জীবনে চলার সহায়ক হলে, পূর্ব- পুরুষরা আমাদের প্রশংসাই করবে, আর অমরের আত্মাও শান্তি পাবে বলে আমার বিশ্বাস। তোমরা খোলা খুলি ভাবে, মনে কোনো রকম দ্বিধা না রেখে, নিজের কথা যাতে বলতে পারো, তার জন্যই মনোরমাকে ওবাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ”
“জেঠিমা, আমরা মেনে নিলেও, মনোরমার বাবা- মা’র মতামতের কি দরকার হবে? ”
” না, রাঘব; তাঁদের কেবলমাত্র খবর দেওয়া, এবং তাঁদের কাছ থেকে আশীর্বাদ নেওয়া ছাড়া, তাঁদের মতামতের গুরুত্ব আমার কাছে নেই। তাঁদের আমন্ত্রণ জানানো হবে; বিষয়টা যখন সম্পূর্ণ ঘোষাল বাড়ির, তখন অন্য কারও মতামত এখানে গ্রাহ্য না করাই সঙ্গত। ”
নারায়ণ বললো, “আমার বাড়ি থেকেই সব অনুষ্ঠান হবে: আমার বড় মেয়ে থাকলে, সে সুস্থ হলে তো মনোরমার বয়সেই হ’ত। আমিই কন্যা দান করবো। ”
রাঘবেন্দ্রবাবু ও রমনী, অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে ইন্দুমতী দেবীর মুখের দিকে, কী অসাধারণ বিচারশক্তি! কী অসাধারণ মর্মী!
মনে মনে ঐ আধুনিকাকে তাঁরা প্রণাম জানায়। মনোরমার বাবা- মাকে বলা, “আমার বাড়িতে বৌ হিসেবে এসেছে, বৌ- মা হিসেবেই
থাকবে”, সে কথা আজ সত্যে পরিণত হতে চলেছে।
পড়ন্ত বিকেলের শেষ সূর্য
রশ্মিতে, দূরের চড়ার ঘরের চালের করোগেটের টিনগুলো চিকচিক করছে; নদীর পারের স্তূপীকৃত সাদা বালিতে থাকা অভ্রকণাগুলোতে শেষ বেলার আলো ঠিকরে পড়ে বিচিত্র রূপে প্রতিবিম্বিত হচ্ছে। ঘোষাল বাড়ির এই উপাখ্যানেই সমাজের বুকে এক নতুন দীগন্তের ইসারার সূচনা হল।
সমাপ্ত