T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সুধাংশু চক্রবর্তী

ব্রহ্মাদেব প্রস্থান করার পর দেবী দুর্গা বিমর্ষ মুখে নিজের আশু বিপদের কথা এবং কার্তিকের আবদারের কথা সবিস্তারে শোনালেন পতিদেবকে । সবটা শুনে মহাদেব আচমকা হুঙ্কার দিয়ে উঠে কার্তিককে বলঠলেন – এই ডেঁপো কার্তিক, এসব কি শুনছি ? ছিঃ-ছিঃ, ক্ষমাই যে পরম ধর্ম সেকথা কি তুই ভুলে গেছিস, মর্কট ?
পিতার ভয়ে কার্তিক দ্রুত পলায়ন করলেন ময়ূরের র্পিঠে চেপে । তখন দেবী দুর্গাকে ডেকে মহাদেব বললেন – ঘোটকে চেপে মর্ত্যে গমনে তোমার আপত্তি কোথায় উমা ? বেশ তো ঘোড়ায় চেপে গতর ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে মর্ত্যে যাবে । তাতে তোমার গতরে জমে থাকা সমস্ত চর্বি ঝরে যাবে আর তুমিও হালকা বোধ করবে ।
শুনে দেবী দুর্গা রেগে গিয়ে বললেন – আমার গতরে চর্বি জমেছে কে বলেছে ? নিশ্চয়ই ওই অশ্বিনী ভাইয়েরা বলেছেন ? গত সপ্তাহে আমাকে থরো চেকআপ করে গেছেন কিনা । শুনে রাখো, আমি নিয়মিত জিমে যাই । শরীরে চর্বি জমার কোনো চান্সই নেই । আসলে দেবর্ষি নারদ কৈলাসে এসে সংবাদ দিয়ে গেছেন মর্ত্যে রাস্তাঘাটের যা বেহাল অবস্থা হয়ে আছে তাতে মর্ত্যবাসীদের শরীর এবং যানবাহনের স্ক্রু পর্যন্ত ঢিলে হয়ে যাচ্ছে । এখন ওই রাস্তাঘাট দিয়ে আমাদের পিঠে চাপিয়ে ছুটতে গিয়ে ঘোটকেরা যদি পায়ে চোট পেয়ে আমাদের নিয়ে মুখ থুবড়ে পড়ে তাহলে সবার কী দশা হবে ভেবে দেখেছো তুমি ?
শুনে মহাদেব গম্ভীর গলায় বললেন – বোম ভোলে । তবু ভালো, বিপদের কথা দেবর্ষি নারদ আগাম জানিয়ে গেলে । দেবশিল্পী বিশ্বকর্মাকে বলে দিই । উনি এসে দেখেশুনে তোমাদের জন্য একটা না একটা সুরক্ষার ব্যবস্থা ঠিক করে দেবেন ।
তলব পেয়ে দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কৈলাসে ছুটে এলেন হাতির পিঠে চেপে । এসে সবটা শুনে দেবী দুর্গার পরিবারের সবাইকে মস্তকে লৌহনির্মিত হেলমেট এবং হাঁটু ও কনুইয়ে শোক্তপোক্ত লৌহপ্যাড ব্যবহারের পরামর্শ দিলেন ।
ওদিকে নিজের দেড়খানা দাঁত নিয়ে গজানন পড়েছেন মহা ফাঁপরে । গজাননকে ফাঁপরে পড়তে দেখে দেবাদিদেব তাঁকে বললেন – তোমার ওই দেড়খানা দাঁত মর্ত্যবাসীদের দর্শানোর কি খুব প্রয়োজন পুত্র ? বরং ওদুটো তুমি কৈলাসে খুলে রেখে যাও । ফিরে এসে নাহয় আবার গুঁজে দিও মুখে । তাছাড়া মর্ত্যে এখন গজদন্ত এবং গণ্ডার শৃঙ্গের কদর তুঙ্গে উঠেছে । ওরা যে তোমাকেও ছেড়ে দেবে না সেকথা ভুলো না গজমুণ্ডধারী পুত্র ।
নিজের এবং পুত্রকন্যাদের সুরক্ষার ভাড় নেবার পরই দেবী দুর্গা যখন বাহনদের সুরক্ষার কথা বললেন, সিংহ তখনই সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করলো সেকথা । বললে – আমার লৌহবর্মের আচ্ছাদনের প্রয়োজন নেই মাপার্বতী । আমি বনজঙ্গল চষে বেড়ানো একটা জীব । খামোখা লোকালয় দিয়ে যেতে গেলে আমাকে দেখে মর্ত্যবাসী যে প্রাণ হাতে করে লোকালয় ছেড়ে পালাবে । তখন কে আপনার পুজো করবে মাতা ?
ইঁদুর বললে – একে বিশালদেহী গজাননকে কাঁধে নিয়ে ছুটতে হবে । এর ওপর লৌহবর্ম ? আমি বাপু এই শরীরে ওসব বইতে পারবো না ।
পেঁচক, হাঁস এবং ময়ূর একযোগে বলে ওঠে – আমরা তো নিজেদের প্রভুদের কাঁধে নিয়ে মর্ত্যলোকে উড়ে যাবো, মা কাত্যায়ণী । আমাদেরও লৌহবর্মের প্রয়োজন নেই ।
বাহনদের কথা শুনে দেবী দুর্গার পুত্র কন্যারা উচ্ছাসে ফেটে পরে বলেন – হুররে-এ-এ-এ…। আমরাও লৌহবর্ম চাই না । আপনি বরং নিজের সুরক্ষার কথা ভাবুন মাতা । আমরা চললুম সাজগোজ করতে । টা-টা ।
পুত্রকন্যারা আনন্দে নৃত্য করতে করতে চলে যাবার পর ব্যাজারমুখো দেবী দুর্গার মস্তক, হাঁটু এবং কনুইয়ের মাপ নিয়ে বিশ্বকর্মা ব্যস্ত হয়ে পড়লেন নিজের কাজে । মা দুর্গার সপরিবারে মর্ত্যে গমনের সময় হয়ে এলো যে ।
বিশ্বকর্মা যখন নিজ কর্মে ব্যস্ত রয়েছেন দেবী দুর্গা তখন ভাবছেন, এবার মর্ত্যে পূজো নিতে যাওয়াটা কী ঠিক হবে ? ভেবেভবে কুলকিনারা না পেয়ে অবশেষে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকলেন সেই দিনটির জন্য যেদিন তাঁকে ঘোটকে চেপে মর্ত্যে গমন করতে হবে ।