T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় আরতি ধর

উমার সংসার

-টানা ক’দিন বৃষ্টির পর আজ রোদ উঠেছে, ভাদ্রের রোদ বড় কড়া, সকাল থেকে জমিতে কাজ করে হাপিয়ে গেছে হারাণ, কালো কুচকুচে শরীর থেকে ঘাম ঝরছে টপটপ করে, হাতের গামছা দিয়ে শরীরের ঘাম মুছতে মুছতে সে ডাক দেয়….উমা ও উমা, জল দে দেখি, গলা শুকায়ে কাঠ হয়ে গেছে রে?

-রান্না শেষ করে উমা গেছে গরুটাকে ফ্যান খাওয়াতে , ওকে ফ্যান খাইয়ে এনে বেঁধে রাখে ওই জাম গাছের সাথে।

-এই নে জল , বলে হারাণের মা সুনিতা দেবী এসে ছেলেকে জল দিতেই হারাণ জিজ্ঞাসা করে… ও মা উমা কি শুইছে নাকি, জোর খিদা পাইছে ভাত দেও দেখি?

-অর কি শোয়ার জো আছে, সকালে গেল ওই নারায়ণের জমিতে মরিচ তুলতে, চাইট্টা মরিচ দিছে, আইসা রান্না সারল এখন গেছে গাইটারে ফ্যান-জল খাওয়াইতে, পোয়াতী মানুষ এট্টু আরাম নাই শরীরের…. তুই যা দেখি ডুব দিয়া আয়, আমি দুই’জনরে খাইতে দেই?

-হারাণ, উমা আর হারাণের মা.. এই তিনজনের সংসার, রোজগার বলতে নিজের বিঘা দেড়েক জমি কিছু সুপারি গাছ আর একটা গরু। তবে ওদের নতুন সংসার, এখনও এক বছর হয়নি বিয়ের। আগে হারাণ ওর মা থাকত ওর দাদাদের সাথে। দুই দাদা পালান আর হিমু পরিযায়ী শ্রমিক, বাড়িতে দুই বৌদি ভাইপো, ভাইঝি আছে। দাদাদের সাথে ও গিয়েছিল কাজে, ফিরেছে এক বছর পর, এসেই শোনে মস্তান জীবন নাকি উমাকে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে…।

-ব্যস… বলা নেই কওয়া নেই সোজা গিয়ে উমাকে তুলে নিয়ে এসেছে নিজের বাড়িতে! সেই ছোটবেলা থেকেই ভালোবাসে দুজন দুজনকে।

-উমাকে বাড়িতে নিয়ে আসতেই দুই বৌদি রে রে করে তেড়ে আসে, ওরা বলে ওকে ফিরিয়ে দিয়ে আসতে। বেচারী উমা, বাবা অন্যের জমিতে হাজিরা কাজ করে, ছোট দুই বোন ঘরে, বাবার যে ক্ষমতা নেই তাকে ফিরিয়ে নিয়ে বিয়ে দেবার। ও কাঁদতে কাঁদতে গিয়ে পড়ে সুনিতা দেবীর পায়ে, বলে… ও জ্যেঠিমা আমাকে ফিরিয়ে দিও না গো, ওই জীবনের সাথে বাপে বিয়া দিলে আমি বিষ খামু।

-পারেননি সুনিতা দেবী উমাকে ফিরিয়ে দিতে, পারেননি ওদের পুরোহিত ডেকে বিয়ে দিতে। পরিবারের সবার অমতে গিয়ে ওই শিব মন্দিরে নিয়ে গিয়ে মালা বদল করিয়ে এনে নিজের ঘরে তুলেছেন তিনি।

-বিয়ের পর মাস-দুয়েক দাদা বৌদিদের সাথে ছিল ওরা, কিন্তু দুই বৌদি উমাকে বাড়ির কাজের মেয়ে হিসেবে দেখত সবসময়, দিনভর বাসন মাজা, উঠোন ঝাঁট দেওয়া এসব করাতো.. এদিকে দু’মাস যেতেই গর্ভবতী হয় উমা, শরীরে নানা সমস্যা দেখা দেয়, এই অবস্থায় ও বৌদিদের ব্যবহারে কোনো পরিবর্তন না দেখে হারাণ পৃথক হবার কথা বাড়িতে জানিয়ে জমিজমা ভাগ করে দিতে বলে।

-অনেক অশান্তি শেষে গ্রামের প্রধান, পঞ্চায়েত এসে জমিজমা সমান ভাগে ভাগ করে দেন। নিজের ভাগের দু’বিঘা জমি আর একটি গরু নিয়ে পৃথক হতেই মা চলে আসেন তার ছোট ছেলের সাথে থাকবেন বলে।

নিজের জমানো কিছু টাকা আর মায়ের ওই সুপারি, গোবর বেচে জমানো কিছু টাকা দিয়ে জমির একদিকে একটা টিনের চালাঘর বানিয়েছে হারাণ আর গরুটার জন্য খড় দিয়ে একটা একচালা বানিয়েছে। বাকি দেড় বিঘা জমির এক বিঘাতে আমন ধানের চাষ করেছে আর আধা বিঘাতে কচু লাগিয়েছে, পরপর ক’দিন বৃষ্টিতে ধানের চারাগুলো কেমন সুন্দর সবুজ, স্বাস্থ্যবতী হয়েছে, কচুগুলো মাটির ওপরে বেড়েছে অনেকটা… দেখতে দেখতে মন ভালো হয় হারাণের। ঝুপ করে একটা ডুব দিয়ে উঠে পড়ে সে, হাতের গামছা জলে ডুবিয়ে নিংড়ে নিয়ে আড়াআড়ি ভাবে ওটা দিয়ে পিঠ মুছতে মুছতে এসে দেখে মা খাবার দিয়েছে দুজনের, উমা তার অপেক্ষায় থালা পাহাড়া দিয়ে বসে আছে।

-ফটাফট বসে পড়ে হারাণ, বাটিসুদ্ধ পাতলা মসুর ডাল ঢেলে নেয় ভাতে, একমুঠো ভাত উঠিয়ে মুখে দিয়ে থালার কোণা থেকে একটু ঝাল চচ্চড়ি নিয়ে মুখে দিয়ে উমার দিকে তাকিয়ে বলে… বইসা আছিস কুন কামে..?

-তুমারে আরেকবার দিয়া বসি… উমা বলতেই হাত দিয়ে দেখায় ওর আর কিছু লাগবে না। তাও আর এক হাতা ভাত স্বামীর পাতে ঢেলে উমা ডাক দেয়.. ও মা তুমিও বইসা পড়লে পারতা..?

-সুনিতা দেবী কখনও খান না ওদের সাথে।দুপুরে বসে বসে কঞ্চি কেটে শুকিয়ে রাখেন উনুনের পাশে জ্বালানির জন্য, কখনও বা বড় ছেলের পুকুর থেকে কিছু হেলেঞ্চা,কলমী শাক তুলে এনে মুঠো বেঁধে ছেলেকে দিয়ে বলেন…সকালে বাজারে বিক্রি কইরা এক পোয়া মাছ নিয়া আসিস।পরে বেলা পড়ে এলে নিজেই নিয়ে খান। বৌমার কথা শুনে শাসনের ভঙ্গিতে বলেন, আমার চিন্তা করন লাগব না তর, পেটেরটার চিন্তা কর দেহি..?

লজ্জা পেয়ে যায় উমা, আড়চোখে তাকায় স্বামীর দিকে.. ততক্ষণে খাওয়া শেষ করে উঠে পড়েছে হারাণ। হাতমুখ ধুয়ে গিয়ে বসেছে ওই জমির পাশে দুই সুপারি গাছের সাথে বাঁধা বাঁশের মাচাটিতে।

-খেয়ে এঁটো বাসন ধুয়ে একটু শুয়ে পড়ে রোজ উমা। সাত মাস চলছে, দিনদিন যেন নড়াচড়া বেড়ে যাচ্ছে আগত সন্তানের, একটা অন্যরকম অনুভূতি এসময়.. বলে বোঝাতে পারে না ও!

-আজ আর বিছানায় যায় নি উমা। শাশুড়ির কাছে একটু পান সুপারি চেয়ে মুখে দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে হারাণের পাশে।

-আজ ঘুমাবি না?

হারাণ প্রশ্ন করতেই ও বসে যায় হারাণের পাশ ঘেঁষে। ভালো লাগে হারাণের এই দুপুরে স্ত্রী-সঙ্গ, ওর দিকে মুখ করে বলে, তর খুব কষ্ট হয় তাই না রে?

স্বামীর কথায় যেন অবাক হয়ে যায় উমা! বলে, কষ্ট কই দেখলা তুমি?

-এইযে তরে এই সময়ে একটু ভালো-মন্দ খাওয়াইতে পারি না, এত কাজ করস, আর ক্যান যাস জমিতে কাজ করতে, না করছি না?

হাসতে হাসতে স্বামীর বুকে মাথা রাখে উমা, আদুরে গলায় বলে, যাই, যাইহোক দুই, চাইরটা সবজি তো পাই, জমি লাগাইতেও তো দিলা না, কতগুলা হাজিরা লাগল, অভাবের সংসারে দুইজনে খাটতে লাগে জানো?

-সত্যি অভাবের সংসার তাদের, এই দেড় বিঘা জমিতে যে সংসার চলে না। তাও ইচ্ছে করে তার… ইচ্ছে করে পৃথিবীর সব সুখ এনে ভরিয়ে দেয় উমাকে। স্ত্রীকে বুকে নিয়ে হারাণ তাকিয়ে থাকে জমির দিকে, ধানের শীষ বেরোবে আর ক’দিনের মধ্যে, কচুগুলো আস্তে আস্তে বিক্রি শুরু করবে, অঘ্রান এলেই গরুটার বাচ্চা হবে, একটু খাঁটি দুধ সবাই খেতে পারবে আর বাকিটুকু বিক্রি করে দু’টাকা বাড়তি আসবে। এবার আর বৌদিদের মতো ফড়েদের কাছে থেকে আগাম টাকা নেবে না সে সুপারি বিক্রির, গাছপাকা নামিয়ে শুকিয়ে বিক্রি করবে, সেই টাকা দিয়ে উমাকে একটু সোনার জিনিস উপহার দেবে প্রথম বিবাহ বার্ষিকীতে।

-কি এত ভাবছ কও না?

উমার ডাকে ভাবনা ভাঙে, ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, উমা আমার কিন্তু ব্যাটা চাই রে, ব্যাটা হলে দেখিস বাপ ব্যাটায় মেহনত করুম, দাদাদের জমিগুলা আমরা আধি চাষ করুম, তখন আর দুঃখ থাকব না।

– চোখে জল আসে উমার, এ জল খুশীর, একটা হাত স্বামীর গলায় রেখে বলে, যদি বেটি হয় কি করবা তখন?

-আরে বেটি হলে তো মাথায় তুইলা রাখুম রে, অরে কি আর জমিতে কামে লাগামু, পড়ব, লিখব মানুষের মতো মানুষ হবো দেখিস?

– চোখের জল মোছে উমা, মুখ তুলে নেয় স্বামীর বুক থেকে, তাকায় জমির দিকে, দুপুরের রোদ পড়ে এসেছে, হালকা হাওয়ায় সারি সারি ধানের চারা কেমন দোলা খাচ্ছে, পুজো আসছে, আকাশে কেমন নীল নীল মেঘ উড়ে যাচ্ছে, কাল যেতে হবে বাদল কাকার জমিতে শেষ ঢেঁড়স তুলতে, কেজি খানেক দিতে পারে কাকা, একথা বলা যাবে না হারাণকে। পেটে সন্তানের নড়াচড়া শুরু হয়েছে আবার, আস্তে করে হারাণের হাতটা নিয়ে ও রাখে নিজের পেটে, শরীরের শিহরণ জাগে , মনে হয় আর কিছুদিনের মধ্যেই পরিপূর্ণ হবে ওদের সংসার, না না শুধুমাত্র সংসার নয়, একটি সুখের সংসার।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।