T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় গৌতম তালুকদার

ফাউন্টেন পেন

আজ লেখার টেবিলে বসে চন্দনের চোখ যায় অনেক গুলো পুরনো পেনের সাথে ফাউন্টেন পেনটা মুখ থুবড়ে আছে,যেনো অবহেলিত।
চন্দনের মনে পড়ে বাবা এবং ছোট বেলার কথা।
ওর বাবা ছিলেন ভীষন রাগি প্রকৃতির মানুষ।দুভাই বোন ওরা।ছোট বেলা থেকেই ওছিল ভীষন ডানপিটে। লেখাপড়া ওর কাছে সবচাইতে বোরিং একটা বিষয়। তবে চন্দন অঙ্কে এতোটাই মেধাবী ছিলো যে অনেক সময় অনেক কঠিন কঠিন অঙ্কের সমাধান করে ফেলতে পারতো, সামান্য সময়ের মধ্যে।

চন্দন তখন সবে পঞ্চম শ্রেণীর ছাত্র।স্কুলেঅঙ্কের মাষ্টার মশাই অনুকূল বাবু,অঙ্কের বিষয়ে দক্ষ একজন মাষ্টার। ছিলেন প্রচন্ড কড়া স্বভাবের। স্কুলের হেড মাষ্টার মশাইকে যতো না ছাত্র -ছাত্রীরা ভয় করতো তার থেকেও ভয় পেতো অনুকূল বাবুকে। উনি ক্লাসে এলে সকল ছাত্র-ছাত্রী ভয়ে এতোটাই তটোস্থ হয়ে থাকতো যে রুমে একটি সুঁই পড়ার শব্দও শোনা যেতো।

সেদিন অনুকূল বাবু ক্লাসে এসেই চক ডাষ্টার হাতে ব্ল্যাক বোর্ডে একটি অঙ্কের প্রশ্ন লিখে দিয়ে বললেন
-তোমার অঙ্কের প্রশ্নটা পড়ে হাত তুলে বলো কে কে অঙ্কের সঠিক উওর দিতে পারবে ?

ছাত্র-ছাত্রীরা ব্লাক বোর্ডের লেখাটি পড়ে এ ওর
মুখের দিকে তাকা-তাকি করেই চলেছে কেউ হাত তুলে বলছে না পারবে।

সুভাষ ক্লাসের ফাষ্ট বয়। সেও চুপ করে আছে, অনুকূল বাবু বললেন

কি হলো সুভাষ ? অঙ্কটা তোমার পারা উচিত।

সুভাষ মাথা চুলকাতে চুলকাতে বলে-
হ্যা স্যার,না মানে……

অনুকূল বাবু ধমক দিয়ে বলেন
-কি,না মানে হ্যা মানে করছো তখন থেকে।

আরো দুই তিন জন ছাত্র-ছাত্রীকে জিজ্ঞাসা করে শেষে চন্দনের দিকে ডাষ্টার উঁচিয়ে বলেন
তোমার তো পারার কথা চন্দন।তুমিও কেনো চুপ করে আছো ? অঙ্কের উওর কি হবে মুখে বলে ব্লাক বোর্ডে অঙ্কটা করে দেখাও।পাঁচ মিনিট সময় দেওয়া হবে তোমাকে।

চন্দন ভালো ভাবে আর একবার ব্ল্যাক বোর্ডের
লেখা পড়ে নিয়ে মুখে উওর বলে দেয়-

আট হাজার, আটশত ছাপান্ন টাকা, সাঁইত্রিশ পয়সা,পয়েন্ট পাঁচ।

অঙ্কটা ছিলো –
যদি এক সের তেলের দাম চুয়াল্লিশ টাকা হয়, তাহলে পাঁচ মন,পাঁচ পোয়া,আধা ছটাক,তেলের দাম কতো হবে ?

চন্দন কয়েক মিনিটের মধ্যে অঙ্কটা ব্লাক বোর্ডে করে দেয়।

অনুকূল বাবু চন্দনের পিঠ চাপড়ে বললেন।আমি জানতাম তুমি পারবে।

বাজার করার সময় দেখা হয় অনুকূল বাবুর সাথে চন্দনের বাবা গণেশ দাসের।ছেলের মেধার কথা শুনে বললেন আর বলেন কেনো স্যার।ছেলেটা যদি একটু মন দিয়ে লেখা পাড়া করতো ..সেটাতো করেনা সারাদিন শুধু টোটো বাঁদরামি। ওকে নিয়ে আর পেরে উঠছি না।এর তার কাছে ওর নামে একটার পর একটা নালিশ এসেই থাকে।
আরে না ওকে নিয়ে এতো ভাববেন না। এই বয়সে ছেলারা একটু আধটু করেই থাকে। তবে প্রশ্রয় দিলে হবে না । কড়া শাসনে রাখতে হবে।
দেখবেন এই ছেলে এক দিন আপনার মান রাখবে।
তাই যেনো হয় স্যার। ও আপনাকে ভীষন ভয় করে এটাই যা ভরসা‌ ।একটু নজর রাখবেন ছেলেটা যাতে ভালো হয় মানুষ হয়।
##
ছেলের প্রশংসা শুনে মনে মনে খুশি হয়ে ছেলের জন্য ওর পছন্দের বুজুড়ি মাছ(তিন কাঁটার ছোট নদীর ট্যংরা) বেগুন সাথে ধনে পাতা নিয়ে এসে স্ত্রীকে বলেন আজ চন্দনের পছন্দের মাছ নিয়ে এলাম।
চন্দনের মা ভালো করে জানে ছেলের প্রশংসা যদি কারো মুখে ওর বাবা শোনে সেদিন ছেলের পছন্দের কোনো না কোনো খাবার উনি আনবেন।রাগ হলে মুখে যতোই ছেলেকে শাষন করুক ছেলে অন্ত প্রাণ। তবু বাঁদরটা যদি একটু কথা শুনতো।

সেবার ফাইনাল পরীক্ষা শুরু হয়েছে।তৃতীয় দিন অঙ্ক পরীক্ষা।পরীক্ষার জন্যে দুদিন আগে কেনা, পেনটা কোথায় হারিয়ে ফেলেছে ও নিজেই মনে করতে পারছে না।বলতেও পারছে না। একথা বললেই তো ওর কপালে উওম-মধ্যেম অনিবার্য।কিন্তু, কি করবে কলম ছারা পরীক্ষায় বসবে কি করে !

পরীক্ষা দিতে যাবার সময় হয়ে গেছে তবু ছেলেকে যেতে না দেখে গণেশ বাবু জিজ্ঞাসা করেন। দুচার ধমকের পরে আসল কথা জানতে পেরে।রাগে ফেটে পড়বার আগে নিজেকে সামলে নিয়ে, নিজের ব্যাবহারিত ফাউন্টেন পেন এগিয়ে দিয়ে বলেন। এটা আজকের মতো নিয়ে যায়।বিকেলে পেন নিয়ে আসবো। দেখিস আজ আবার এটাও হারিয়ে আসিস না যেনো,তাহলে পিঠের চামড়া গুটিয়ে দেবো।মনে মনে বললেন যা বাবা সাবধানে মাথা ডান্ডা করে পরীক্ষা দিয়ে আয়।

পরীক্ষা শেষ হতেই চন্দন ছুটে যায় স্কুলের গেটে। আচার ওয়লার কাছে। চালতার আচার নিয়ে মজাকরে খেতে খেতে বাড়ির দিকে আসার পথে হঠাৎ মনে হয় পেনের কথা।‌ এ পকেট সে পকেট খাতা,বই ,তন্ন তন্ন করে খুঁজে কোথাও পেন না পেয়ে ভয়ে হাত পা কাঁপতে থাকে। অস্থির হয়ে ওঠে। আজ আর রক্ষে নেই বাবার হাতে। পেনটা বাবা কাউকে হাত লাগতে দেয় না। বহু দিন যাবৎ নিজে একা হাতে ব্যাবহার করছেন।আজও পেনটা একে বারে নতুন দেখতে,দেখে মনেই হবে না অনেক দিনের।এবার কি করবে !
মাথায় ওঠে আচার খাওয়া। ভয়ে চিন্তায় হাতের আচার ছুঁড়ে ফেলে দিতেই দেখে ওর বা হাতে ধরা খাতার সাথে পেনটা সেটে আছে। মনে মনে সস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আফসোস করে আচার
টা ফেলে দেবার জন্যে।
##
সেদিনের সে ঘটনার সাথে বাবার মুখ মনে পড়ে আর চোখের সামনে ফাউন্টেন পেন ,মুহূর্তের জন্য চন্দন আবেগ তাড়িত হয়ে পেন‌টা হাতে তুলে নেয়।মনে মনে অনুতাপ করে এই ভেবে, পেনটা অযত্নে পড়ে আছে দেখে। ভাবে, পেনটা দোকানে নিয়ে ঠিক করে আনবে আবার লিখবে এই পেন দিয়েই।
নিজের অজান্তেই এই কথা গুলো ওর মুখ থেকে বেড়িয়ে আসে ,
বাবা।কেমন আছো তুমি বাবা। আজ তোমার চন্দন সেই বাঁদর নেই। তুমি কি দেখছো বাবা আজ তোমার বাঁদর ছেলেটা তোমার মতো একজন বাবা হয়েছে, সংসারের দায়িত্ব বহনে বদ্ধ পরিপূরক হয়ে চাকরি করছে বাধ্য ছেলের মতো,সাথে সমাজ সেবার কাজে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আপ্রান চেষ্টা করে চলেছে। জানি না আমি মানুষ হতে পেরেছি কিনা ! তবে অমানুষ হয়নি তোমার আশীর্বাদে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।