T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় অন্তরা দাঁ

আমার রাত পোহালো শারদপ্রাতে
শারদপ্রাতে রাত পোহালে পুজোর গন্ধ ভাসে বাতাসে। যজ্ঞিডুমুরের কচি কচি ফলে ঠোনা দেয় মৌটুসী পাখি, তেল-হলুদ মাজা ঝকঝকে নীল আকাশে আশ্বিনের কাঁচাপাকা রোদ! বর্ষার মাটিগোলা জল এবার থিতিয়ে এসেছে, কাশের গোছা একেবারে কাবুলি বেড়ালের লেজের মতো, গোছা গোছা, উদলা হাওয়ায় দুলছে কেমন! গাঁ-গঞ্জ-শহরে বাঁশের কাঠামোয়, সারাটাদুপুর ঝুলে থাকে একটা আলটপকা অপেক্ষা। মা আসছে! মা এবছর আসছে ঘোড়ায়, যাচ্ছেও ঘোড়ায়। এই বাহনই নাকি নির্ধারণ করে, বছর কেমন যাবে। মর্ত্যবাসী যতই কি না ‘ফুলটু মস্তি’ বলে সেল্ফি সাঁটুক ফেসবুক-ইন্সটাগ্রামের দেওয়ালে, পন্ডিতেরা নাকে চশমা এঁটে নিদান দিয়েছেন — ফল ছত্রভঙ্গ। করোনার চেয়েও কয়েকগুণ বেশি শক্তিশালী এক্স-ভাইরাস নাকি ঘাপটি মেরে বসে আছে এই বিশ্ব-ব্রহ্মান্ডের কোন কোণে, সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়বে আমজনতার ঘাড়ে ! এসব অলক্ষুণে কথা যদিও আদপে আমল পাচ্ছে না এখন। মহামারী, অতিমারী এই শব্দগুলো যতই টাটকা হোক মানুষ এখন মরিয়া, কিছুটা বেপরোয়াও। উৎসবের আমেজ কোনভাবেই ফিকে হতে দিতে রাজি নয় তারা। সময়ের দাম তবে সামান্য হলেও শিখেছে মানুষ। একটা অসুখ চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে —মুহুর্তে বাঁচতে হয়! এই মুহুর্তই তো সৃষ্টির আদিকথা, মুহুর্তের জঠরেই লুকিয়ে থাকে যাবতীয় নির্মাণ ও বিনির্মাণ, ধ্বংস ও সৃষ্টি, আনন্দ ও বিষাদ। তবু এসব সরিয়ে, যাপন তার নিজস্ব পথ করে নেয়। বছরে চারটি দিন নিত্যদিনের রুটিন থেকে, অভ্যাসের খাঁচা ফেলে উড়ালসুখ। নতুন জামার খসখসে, ভালো-মন্দ খাওয়ার আয়োজনে, কাঁসর-ঘন্টার দৈব আওয়াজে, ঢাকের শব্দের নষ্ট্যালজিয়ায় বিনবিনে সুখ হয় বইকি! যতই কি না পাঁজিপুঁথি চোখ রাঙাক, বিধান দিক এটাসেটার, উমা আমাদের ঘরের মেয়েটি। তার আবাহন থেকে বিসর্জনই বেঁধে দেয় ইচ্ছেতারের আলাপ। এখন তো দুর্গাপুজো আন্তর্জাতিক। ঝলমলে আলোয়, প্যান্ডেলের উচ্চতায়, থিমের বৈচিত্র্যে চিত্তাকর্ষক। গ্রাম থেকে শহর সর্বত্র এক অদ্ভুত দেখনদারির অসুস্থ প্রতিযোগিতা। প্রকৃতি কিন্তু ঠিকই সাজিয়ে রাখে তার ডালাখানি। কোন অদৃশ্য জাদুকর আকাশের আসমানী জমিনে ঢেলে দেয় গভীর নীল, ভাসিয়ে দেয় সাদা মেঘের পানসি। রোদ্দুরের রঙ আরও হলদেটে, সবুজের ঝিলমিলে ময়েশ্চারাইজার লাগানো চমক! মানুষ শুধু দিনের পর দিন বাড়িয়ে চলেছে তার বাহ্যিক আড়ম্বর। কেন? সোশ্যাল নেটওয়ার্ক চালু হওয়ার পর এ প্রবণতা আরও বাড়ছে বেড়েই চলেছে হু হু করে । শুধু আয়োজন , অনুভূতি ক্ষয়ে আসছে, গভীর আনন্দ নেই, সস্তা সুখে ভাসছি আমরা। আত্মবীক্ষণ প্রয়োজন বইকি! হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ, কোমল বৃত্তি, চারুবাসনা সবকিছু।পুজোকে কেন্দ্র করে যা কিছু হয়, হচ্ছে, তা কোথাও শুদ্ধাভক্তি থেকে নয়, একটা উৎসব যেন! মেলা, খেলার মতই। পুজো তো তা নয় আদৌ। বাঙালি যতই মেতে উঠুক মাসাধিক কাল ধরে, বিক্রিবাটা হোক বাজার-হাটে, নিয়ম মেনে উপাচার সাজানো হোক অর্ঘ্যপাত্রে— হারিয়ে ফেলছি আমরা! আত্মা মরে যাচ্ছে, জীর্ণ কঙ্কাল ধুয়েমুছে সাজিয়ে তুলছি যেন! পুজো এখন ছুটির সমার্থক। উচ্চবিত্ত বাঙালি, খানকতক সাবেকী বাড়িতে টিমটিম করে পুজো-আচ্চা হয়, বাকী সব শারদোৎসব। পাততাড়ি গুটিয়ে আম-বাঙালি হালফিল পাড়ি জমাচ্ছে পাহাড় বা সমুদ্রে। কিন্তু কৈলাশে থেকে বছর বছর উমা যে আসছে মর্ত্যধামে—এত আলো, এত রোশনাই, এত এত মন ভালো করা খাবার-দাবার, মেলা, জলসা, ক’দিন না হয় মনখারাপগুলো তুলে রেখে দিই বুকের খুব গোপনে শাদা হাড়ের কৌটোয়। বারোটা মাস তো ওসব লেগেই আছে! ওষুধবিষুধ, রোগজ্বালা, দু:খ-আক্ষেপ, দুর্গা, দুর্গতিনাশিনী বললেই বুকের ভেতর কেমন ব্যথা চিনচিন করে ওঠে — অমল আনন্দ খুঁজে নিতে হয়, নাহলে জীবন বড় একঘেয়ে হয়ে যায়, রঙচটা চাদরের মতো, লোমওঠা নেড়ির ঘাড়ের মসৃণতার মতো ঘিনঘিনে। পুজোর একটা আলাদা গন্ধ আছে, ঠাকুরঘরের নৈবেদ্যে রাখা আতপচাল, ধূপধুনো গুলগুল অগুরু চন্দন, শিউলির গন্ধ মিলেমিশে এক আশ্চর্য ঘ্রাণ এক অমলিন পবিত্রতা। মহালয়া থেকেই তার সুরটি বেজে ওঠে, এক দৈব উচ্চারণ, অপার্থিব সুর, চারটি দিন বাঁধা রুটিন থেকে দলছুট, ঘড়ি-বাঁধা তাড়না নেই, জ্যামে আটকে লেটমার্ক নেই,টিফিনে বিস্বাদ শশা-টম্যাটো নেই, রাতে ফিরে অবসাদ নেই, সকালে ওঠার তাড়া নেই, ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ানো নেই, মেপে মেপে বাঁচা নেই। ধূ ধূ আনন্দ শুধু। ছাতিমের গন্ধে ভরপুর সব আশ্বিনের সন্ধে। হাতের নাগালে সব শারদসংখ্যা, আগমনী গান বাজছে মাইকে, নারকোলনাড়ুর অফুরন্ত জোগান, কিসমিস দেওয়া ছোলার ডাল, মুড়িঘণ্ট, নবমীতে খাসির মাংস লাল লাল করে ঘি-শুকনোলঙ্কা দিয়ে,কোলেস্টেরলের চোখ রাঙানি তখন শুনতে নেই,গাওয়া-ঘিয়ে ভাজা ফুলকো লুচি,ওই রিফাইন্ড তেলে ভাজা পানসে নয়, বাড়ির পুকুরে জাল ফেলে ধরা বড় কাতলা মাছের রসা, রুইপোস্ত সামান্য বেরেস্তা দিয়ে ঘন করা, আহাহা! বেশি করে কুসুমবীজ বাদাম ছোলা দিয়ে করা বাসন্তীরঙ চালভাজা, গুড়ের মুড়কি, সিঁড়ি ভেজে ঘন পাকের কটকটে নাড়ু,মুড়ির নাড়ু, এর জন্য অনায়াসে ফেলে আসা যায় বারোমেসে চাইনিজ রেস্তোরাঁ, ব্ল্যাককফির ধূমায়িত আভিজাত্য, পোর্সেলিনের বাটিতে স্যুপের যুগলবন্দী!
বচ্ছরকার সাধ ওই চারটে দিন, তার জন্যে হা-পিত্যেশ করে করে বসে থাকা, ওসব জিম-টিম থাক না মা, কেটো-ডায়েট তুলে রাখো,সারাবছর তো অসুরবধ লেগেই আছে, অন্তর-বাহিরের কত অসুর বিনাশ করতে হয় মেয়েদের, মানুষের। হাত-পা ছড়িয়ে ক’দিন আরাম-আয়েশ কর দেখি! ভালো-মন্দ খাও, ঝলমলে জামা-কাপড় পরে বাপেরবড়িতে আনন্দ কর। ওসব ল্যাপটপ, ম্যাগবুক বন্ধ থাক। বুকের তরঙ্গে আজ তুই বেজেছিস… সেই কবে ! কবে থেকেই।