সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে নীলম সামন্ত (পর্ব – ২০)

ব্রহ্মমুখী সূর্য ও রেবতী রেবতী ঠোঁট

“খণ্ডন ভব বন্ধন”- সেদিন সন্ধেয় এটাই শুনছিলাম। পাশ দিয়ে নিঃশব্দে গঙ্গা বয়ে যাচ্ছে৷ আমি বসেছিলাম গমগম করে জ্বলতে থাকা আরতির সামনে৷ আসেপাশের লোকেরা কেউ গাইছে কেউ মাথা নাড়ছে কেউ বা বিস্ময় নিয়ে ভাবছে এটা আবার কেমন গান৷ এক দেহাতি বউ বাংলাতেই জিজ্ঞেস করে ফেলেছিল “এমন গান তো মাইকে শুনিনি এখানে গাওয়া হচ্ছে এটাকে কি বলে” তাকে বোঝাব কিভাবে? রামকৃষ্ণ জানেন কিনা সেটাই আমার জানা নেই। অথচ তার পেছনেই এক ভদ্রমহিলা চোখ বন্ধ করে গলা মেলচ্ছেন৷ আবার আমার পাশেও এক বয়স্ক ভদ্রলোক গাইছেন৷ তাঁর গলা কাঁপছে, আড় চোখে দেখলাম চোখ থেকে জল পড়ছে৷

এ ভক্তি কেবল আবেগের। ওই চোখের জল সেও আবেগ৷ ওরা সহজ ঈশ্বরমুখি মানুষ বলে ভক্তি প্রেমে নিজেদের ডুবিয়ে রাখে। প্রার্থনা করতে করতে কেঁদে ওঠে। ঈশ্বরকে নিবেদন করতে করতে কেঁদে ওঠে।

সেদিন মঠ থেকে বেরিয়ে এসে সবার আড়ালে গিয়ে নিজেকেই জিজ্ঞেস করেছিলাম এই আবেগপ্রবন মানুষের থেকে আবেগটা তুলে নিলে কি পড়ে থাকবে? নাকি মানুষটাই ছিবড়ে হয়ে যাবে? তবে যারা কঠিন তারা কি ছিবড়ে? হয়তো তাই হয়তো না তারাই বেশি নরম।

একেকদিন রাত্রিবেলায় পোশাক বদলের সময়ে ভাবি কি দরকার এই বদলের? জীবন তো নিজেই একটা স্টেশন। কত লোকেই এসে জোটে। কেউ বসে বসে পানের পিক ফেলে, কেউ কাঁদে, কেউ হাসে, কেউ বা কফ থুতু। আমি আমার মতেই দেখি আর নোটবুকে লিখে রাখি মানুষের প্রবৃত্তির রকমফের। প্রতিবার লিখতে বসে বুঝেছি এই প্রতিটা মানুষই তার নিজের চাওয়া পাওয়ার মূল্য দিতে গিয়ে আসা যাওয়া করে৷ তাদের ভেতর যে ক’টা ফুল ফোটে সবই তাদের পছন্দের অপছন্দের ফুলের দিকে তারা তাকায় না। তাকালেও পা মাড়িয়ে চলে যায়৷ যাকে বলে সাবালকত্ব।

বিবেকানন্দের পায়ের কাছে বসে সেদিন আমার কিছুই চাওয়ার ছিল না৷ শুধু ভেবে গেছি কন্যারাশির জাতকের ওই দুটো গাঢ় চোখ যা পেরেছে তা এই পৃথিবীর লক্ষাধিক ভক্তবৃন্দের কারুর পক্ষেই সম্ভব নয়। তারা যে যার নিজেদের পুষে রাখা সমুদ্রের পাড় ধরে হাত মেলে দৌড়ে যাবার। তারা বাতাসের মুখোমুখি নয় পাশাপাশি বিছিয়ে বসা রকমারি প্রসাধনীর হাট৷ অথচ প্রত্যেকেই হাতদুটো জোড়া করে শুনছে –
“জ্ঞানাঞ্জন-বিমল-নয়ন বীক্ষণেমোহ জায়॥
ভাস্বর ভাব-সাগর চির-উন্মদ প্রেম-পাথার।
ভক্তার্জন-যুগল চরণ তারণ-ভব-পার॥”

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।