সম্পাদকীয়

এক জীবন, একাধিক শৈশব

আমরা যখন ছোট ছিলাম তখন একটা অন্যরকম জগৎ ছিলো। এই জগৎটাকে জেনারেশন দিয়ে বিচার করছি না, আমাদের আগের বা পরের জেনারেশনেরও এমন একটা সময় ছিল বা থাকবে। তার নাম ছোটবেলা। তখন আমাদের পছন্দ একরকম থাকে। ধীরে ধীরে পছন্দ পরিবর্তন হয়। আমাদের জীবনটাকে যদি ছোট ছোট বেশ কিছু ভাগে ভাগ করে নিই, তবে দেখতে পাবো প্রতিটি ভাগের একটি শৈশব, যৌবন ও পরিণতি আছে। যেমন, খুব ছোট বেলায় একটা শিশু খেলনা দিয়ে খেলতে ভালোবাসে। লিঙ্গভিত্তিক খেলনা বিভাজনে আমি বিশ্বাসী নই, কারণ আমার যেমন গাড়ি ছিল, তেমনি পুতুলও ছিলো। আমার যতদূর মনে পড়ে বা বর্তমানে শিশুদের লক্ষ্য করে দেখি, প্রথম প্রথম সেই খেলনা গুলো দিয়ে কি করে খেলতে হয় সেটাই ঠিক ভাবে জানা থাকে না, এটা শৈশব। ধীরে ধীরে গাড়িগুলোকে গ্রিপ করা যায়, পুতুলের সংসার সম্পর্কে সম্যক ধারণা আসে, এটা যৌবন। একটা সময় আসে পড়ার চাপে নয়, অন্য কিছুর আকর্ষণে এই খেলা থেকে মন চলে যায়, অর্থাৎ বার্ধক্য চলে এলো। এরপর সামাজিকতায় আকর্ষণ চূড়ান্ত হয়। আউটডোর গেম, মেলা আকর্ষণ করে। প্রথম প্রথম একটু ভয় থাকে। এই বুঝি ক্রিকেটের বলটা এসে লাগলো, এই বুঝি মেলায় হারিয়ে গেলাম, মায়ের হাত ধরে রাখা শক্ত করে, এই অধ্যায়ের শৈশব এটা। এরপর যৌবনে চুটিয়ে খেলাধুলা, প্রায় প্রতিটি মেলায় যাওয়া, দুর্গাপুজো, কালীপুজো, সরস্বতীপুজোয় বন্ধুদের সাথে বেড়ানো এসব চলে। এরও শেষ আছে। ধীরে ধীরে আকর্ষণ কমে। আবারও মনে হয় বড় হয়ে যাচ্ছি। এই সময়টা হয়তো টিন এজ, সত্যিই একটা ট্রানজিশন পিরিয়ড। তারপর গতানুগতিক চলা ছেড়ে নতুন কিছু করা, কেউ অ্যাডভেঞ্চার প্রিয়, বেরিয়ে পড়ে একা বা কিছু বন্ধু নিয়ে, কেউ কিছুটা বেপথে চলে যায়। তাদের কথাও বলছি কারণ এটাও সমাজ। আর তারাও যে আবার পথে ফিরবে না অন্যরকম অভিজ্ঞতা নিয়ে তাই বা কে বলতে পারে। কারণ এই ফেজটারও বার্ধক্য আসবে। তখন হয়তো আর প্রেম প্রেম খেলা ভালো লাগবে না সেই ছেলেটির বা মেয়েটির। হয়তো কোন ভালো বন্ধুর লাগাতার পরিশ্রমে নেশার অন্ধকার থেকে কেউ ফিরে এসে নতুন করে জীবন শুরু করে। অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় ছেলে বা মেয়েটি হয়তো বাড়ির কথা ক্যারিয়ারের কথা ভাবতে শুরু করে। এরপর প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর যদি কেউ ভাবে বড় হয়ে গেলাম। আর কিছু ভালো লাগে না, সেটা ভুল। দেখা যাবে নিজের অজান্তেই অন্য কিছু শুরুর চিন্তা চলছে। ধরা যাক কবিতা লেখা। প্রথম লেখা কবিতা ও তার দুবছর পরের লেখা কবিতাতেই আকাশ পাতাল পার্থক্য থাকে। প্রথমদিকের লেখা গুলোকে লুকিয়ে রাখতে ইচ্ছা হয়। ত্রিশ বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করলে ওটা কবিতা সৃষ্টি অধ্যায়ের শৈশব, আর কেউ যদি দশ পনেরো বছর থেকে কবিতা লিখতে লিখতে পরিপক্ক হয়ে ওঠে, ত্রিশ বছরে তার কবিতার ভরা যৌবন হতেই পারে। তারপর ধরি কবিতারা গদ্য হতে চাইছে, মুক্তগদ্য, গদ্যকবিতার হাত ধরে গদ্যের দিকে এগোচ্ছে। অর্থাৎ কবিতার বার্ধক্য এলো। এরপর গদ্যের শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য আসবে। তারপর হয়তো আরও অন্য কিছু করতে ইচ্ছা হবে। যখনই কোন নতুন শুরু হবে, সেটাই কৈশোর। “বয়স বাড়ে বাড়ুক, তবু মনের বয়স বাড়তে দিও না” হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গানের এই লাইনের সাপোর্ট নিয়ে বলা যায় কখনো উদ্যম হারিও না। নতুন কিছু শুরু করলেই আবার শৈশব ফিরে পাওয়া যায়। সেই ছোট বেলায় হাঁটতে শেখার সময় বারবার ধপাস হওয়ার মজাটা কিন্তু কবিতার ছন্দ মেলাতে গিয়ে হিমসিম খাওয়ার মধ্যেও আছে। তারপর একা কিছুটা হাঁটায় যে স্বর্গীয় সুখ, তেমনই সুখ ছন্দ মিলিয়ে ফেলতে পারলেও লাভ করা যায়। এভাবেই অনেক গুলি শৈশব, কৈশোর, যৌবন ও বার্ধক্য নিয়ে একটা জীবন। তাই কোন একটা অধ্যায় খারাপ গেলেও সেটাকে মেকআপ দেওয়ার জন্য আরও অনেক অধ্যায় পড়ে থাকে।

সায়ন্তন ধর

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।