ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২৯)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
এবারে যে মন্দির লিপিটির কথা আলোচনা করব, তার সঙ্গে অনেক ইতিহাস, অনেক গল্প কাহিনী জড়িত আছে। বীরভূম জেলার সদর শহর সিউড়ি থেকে সাত কিলোমিটার পশ্চিমে ভান্ডীরবন গ্রামে অবস্থিত বিভান্ডীশ্বর শিব মন্দির। এই শিব মন্দিরটিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে আছে অনেক ইতিহাস, অনেক লোকশ্রুতি, অনেক কাহিনী।
কিংবদন্তি প্রচলিত আছে যে, মহাতপা বিভান্ডক মুনি এই শান্ত স্নিগ্ধ পরিবেশে ভান্ডীরবনে আশ্রম স্থাপন করেছিলেন। বিভান্ডক মুনি কঠোর তপস্যায় সিদ্ধি লাভ করে এই ভান্ডীরবনের যোগাশ্রমেই নাকি ঋগ্বেদের ১০২৪ লোক রচনা করেন এবং তাঁর নামানুসারেই এই জায়গাটির নাম বিভান্ডক বন।
এই বিভান্ডক ঋষির নামের সঙ্গে আরো অনেক ঘটনা জড়িত আছে। কথিত আছে, কশ্যপ ঋষির মানসপুত্র বিভান্ডক মুনি একবার কঠোর তপস্যা শুরু করেছিলেন। পুরাণ কাহিনীতে এরকম অনেক ঘটনা পাওয়া যায় যে, কোন ঋষি বা তপস্বী কঠোর সাধনা শুরু করলে দেবরাজ ইন্দ্র ভীত হন এই ভেবে যে, সাধক যদি তপস্যার শেষে মহাদেব বা বিষ্ণু অথবা ব্রহ্মার কাছ থেকে এমন কোন বর লাভ করেন, যাতে তিনি প্রভূত শক্তিশালী হয়ে স্বর্গরাজ্য দখল করেন। অতএব তার তপস্যা ভঙ্গ করতে হবে। আর এই কাজে দেবরাজের প্রধান সহায় স্বর্গের নৃত্য গীত পটিয়সী অপ্সরা গণ। এক্ষেত্রেও তাই হল। দেবরাজ ইন্দ্র অপ্সরা উর্বশীকে পাঠালেন বিভান্ডক ঋষির ধ্যান ভঙ্গ করতে। ঊর্বশী এই কাজে সফল হলেন। বিভান্ডক ঋষির ঔরসে উর্বশীর গর্ভে জন্ম নিলেন ঋষ্যশৃঙ্গ।
ইনি সেই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি, যিনি অপুত্রক রাজা দশরথের জন্য এক পুত্রার্থে যজ্ঞ করেছিলেন।
এই যজ্ঞের ফলে রাজা দশরথের তিন রানি চারজন পুত্রের জন্ম দিয়েছিলেন—- রাম ,লক্ষণ, ভরত ও শত্রুঘ্ন।
কথিত আছে, এই ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি বোলপুর শান্তিনিকেতন স্টেশনের পূর্ব দিকে নানুর চন্ডীদাস রোড ধরে আট কিলোমিটার দূরে শিয়ান -মুলুক গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকাতেই ছিলেন পুরাকালে। ওখানেই আছে ঋষ্যশৃঙ্গ মুনি পূজিত ঋষ্যশৃঙ্গেশ্বর শিবলিঙ্গ। এই এলাকাতেই নাকি একসময় বিভাণ্ডক ঋষি এবং
তাঁর পুত্র ঋষ্যশৃঙ্গ মুনির সাধন ক্ষেত্র ছিল। পরে কোন কারণে বিভাণ্ডক ঋষি পুত্রের উপর অসন্তুষ্ট হয়ে জঙ্গলে গিয়ে একাকী সাধনায় মগ্ন হয়েছিলেন, সেখানেই প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বিভান্ডীশ্বর শিব।
শ্রীচৈতন্যদেবের সমসাময়িক বা কিছুকাল পরে ভাণ্ডীরবন এলাকায় ধ্রুব গোস্বামী নামে একজন পরম বৈষ্ণব অবস্থান করছিলেন। তিনি নাকি নিজে একটি দোল মঞ্চ বানিয়ে, সেখানে দ্বাদশ গোপাল মূর্তি প্রতিষ্ঠিত করে তাঁদের পূজায় দিন অতিবাহিত করতেন।
কথিত আছে, খ্রিস্টীয় ত্রয়োদশ শতাব্দীতে দাস রাজগণের আধিপত্যের সময়ে এমনকি একাদশ শতাব্দীতে সুলতান মাহমুদের লুণ্ঠন কালের সময় থেকে পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ পর্যন্ত ভারতবর্ষে হিন্দু মন্দিরের উপরে ভীষণ অত্যাচার হয়েছিল।ওই সময়ে অন্যান্য দেব মন্দিরের সঙ্গে ব্রজধামের দেব মন্দিরের ধ্বংসকার্য সাধিত হয়েছিল।
ওই সময়ে মানে ,পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ ভাগেই নাকি ধ্রুব গোস্বামী তার দ্বাদশ টি গোপাল দেব সহ পালিয়ে এসে আশ্রয় নিয়েছিলেন ভান্ডীরবনে।
শোনা যায় যে, নিকটবর্তী খটঙ্গার রাজার রোষে পতিত তাঁর ব্রাহ্মণ পাচক প্রাণভয়ে ভীত হয়ে ধ্রুব গোস্বামীর আশ্রমে আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু রাজার সৈন্যরা তাকে আশ্রম থেকে বেরিয়ে যেতে বাধ্য করে এবং তাড়া করে হত্যা করে। এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে ধ্রুব গোস্বামী ওই স্থান পরিত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নেন। ময়ূরাক্ষী নদীর তীরে ওই ভান্ডীরন গ্রাম অবস্থিত। জনশ্রুতি এই যে, তখন চৈত্র মাসে আকস্মিক প্রবল বর্ষণ হওয়ায় ময়ুরাক্ষী নদী দুকুল ছাপিয়ে ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছিল। কিন্তু ধ্রুব গোস্বামী তাতে ভীত না হয়ে নিজে একটি তরণী নির্মাণ করেছিলেন। সেই তরণীর উপর এক এক করে একাদশ গোপাল বিগ্রহ স্থাপন করতে পারলেও দ্বাদশ গোপালের মূর্তিটি তিনি কিছুতেই স্থানচ্যুত করতে পারেননি। দ্বাদশ গোপাল নাকি বিশ্ব ম্ভর মূর্তি ধারণ করে স্থান ত্যাগ করতে অনিচ্ছা প্রকাশ করেন। নিতান্ত বাধ্য হয়ে ধ্রুব এক দরিদ্র ভিক্ষুক ব্রাহ্মণকে পথে দেখতে পেয়ে, তাঁর হাতে গোপাল বিগ্রহ সমর্পণ করে ওই স্থান ত্যাগ করেন।
ওই ভিক্ষুক ব্রাহ্মণ নিকটবর্তী নোয়াডিহি গ্রামের নন্দ দুলাল ঘোষালের বাড়িতে গিয়ে তাঁর বিষ্ণু মন্দিরে গোপালকে রাখতে বলে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।
বহু বছর পরে মহাত্মা রামনাথ ভাদুড়ী নামে জনৈক স্বনামধন্য ব্যক্তি ভান্ডীর বনে এক সুন্দর মন্দির তৈরি করে গোপাল জিউ কে ওই মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন।
কে এই রামনাথ ভাদুড়ী?
বাংলার নবাব তখন আলীবর্দী খাঁ। বীরভূম তথা রাজনগরের শাসক তখন আসাদুজ্জামান খান। আলীবর্দি জানতে পারলেন যে বেশ কয়েক বছরের খাজনা বাকি পড়েছে রাজনগরের। আসাদুজ্জামান খাজনা দিতে অস্বীকার করেননি তবে তাঁর হিসেবে নাকি খাজনার পরিমাণ আরো কম হবে। এর ফয়সালা করতে আলীবর্দী খাঁ পাঠালেন কনকপুরের দেওয়ান রামনাথ ভাদুড়ীকে।
বর্তমান বীরভূমের মুরারইয়ের কাছেই কনকপুর গ্রাম। ওই কনক পুর এবং তার আশেপাশের অঞ্চল নিয়ে স্থানীয় রাজা ছিলেন উদয় নারায়ন। ওই অঞ্চলের খুব কাছেই মুর্শিদাবাদ এবং পূর্ব দিকে ভাগীরথী এবং নিকটেই পদ্মা পার হলে রাজশাহী জেলার নাটোর। নাটোরের রাজা তখন রঘুনন্দন। যাঁর স্ত্রী হলেন বিখ্যাত রানী ভবানী।
এই সময় মুর্শিদাবাদের সিংহাসনে ছিলেন মুর্শিদ কুলি খাঁ, যাঁর সঙ্গে রাজা উদয়নারায়ণের রাজস্ব নিয়ে বিরোধ শুরু হয়েছিল। মুর্শিদকুলি খাঁ সৈন্য পাঠিয়ে যুদ্ধ করে উদয়নারায়ণকে বন্দী করে নিয়ে যান এবং তার জমিদারি কেড়ে নেন। এরপর মুর্শিদকুলি খাঁ ওই অঞ্চলের দায়িত্ব দেন
রঘুনন্দনকে। সম্ভবত এই রঘুনন্দনের আত্মীয় ছিলেন রামনাথ ভাদুড়ী,যাঁকে কনকপুর অঞ্চল দেখাশোনা করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এই অভিজ্ঞ রামনাথ ভাদুড়ীকে আলীবর্দী খাঁ পাঠালেন রাজনগরের নবাবের রাজস্ব প্রদান সংক্রান্ত দাবি দেখে ফয়সালা করতে।
রাজনগরের রাজার দাবি বিচার করে রামনাথ ভাদুড়ি বুঝতে পারলেন যে, রাজনগরের রাজার দাবি যথার্থ। তিনি আলীবর্দী খাঁকে বলে রাজার করের বৃহদাংশ মকুব করার ব্যবস্থা করলেন। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ রাজনগরের রাজা রামনাথ ভাদুড়ী কে লক্ষ টাকা পুরস্কার দিতে চাইলেন।
কিন্তু ধর্মপ্রাণ রামনাথ ভাদুড়ী মহাশয় ততদিনে ধ্রুব গোস্বামীর গোপাল জিউর কথা এবং বিভান্ডক ঋষি প্রতিষ্ঠিত বিভান্ডীশ্বর শিব মন্দিরের ভগ্ন অবস্থায় কথা অবগত হয়েছেন।
তাই তিনি রাজনগরের রাজার কাছ থেকে ওই অর্থ উপহার না নিয়ে তার পরিবর্তে ১৮৮ নং তৌজী মধ্যে ভান্ডীরবন, বীরসিংহপুর, আড়াইপুর ও রাইপুর এই চারটি মৌজা পুরস্কার স্বরূপ প্রার্থনা করেন। রাজা খুশি হয়ে তাঁকে ওই মৌজা চারটি লাখোরাজ হিসেবে প্রদান করেন। রামনাথ ভাদুড়ী ওই সম্পত্তি গোপাল জিউর নামে উৎসর্গ করেন এবং উক্ত সম্পত্তির আয় থেকে যাতে গোপালজীউ, বিভান্ডেশ্বর শিব এবং বীরসিংহপুর এর মগধেশ্বরী দেবী কালিকার সেবা পূজা ও নিত্য ভোগের ব্যবস্থা হয় তার ব্যবস্থা করেন।
ওই সময়ই তিনি মুর্শিদাবাদ থেকে কারিগর নিয়ে এসে ৺গোপাল দেব এবং বিভান্ডীশ্বর শিবের মন্দির তৈরি করার ব্যবস্থা করেন। ওই সময়েই তিনি ঘোষাল বাড়ি থেকে গোপালজিউ কে এনে নতুন মন্দিরে প্রতিষ্ঠা করেন।
এখানে বিভান্ডীশ্বর শিব পশ্চিম-লিঙ্গ।
এই মন্দিরটি ১৬৭৬ শকাব্দ অর্থাৎ ১৭৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৫০ ফুট উঁচু এই মন্দিরটি ইট নির্মিত এবং কবিলাসপুরেরর মত রেখ দেউল শৈলীতে নির্মিত। মন্দিরটি ইটের তৈরি হলেও লিপিটি তক্ষণিত পাষাণলেখ।
রসাব্ধিষোড়শশকে সংখ্যকে শাস্ত্রসম্মতে
রামনাথদ্বিজঃ কশ্চিৎ ভাদুড়ীকুলসম্ভবঃ।
ভাণ্ডীশ্বরং শিবং দৃষ্ট্বা একান্ত ভক্তি সংযুতঃ
তৎপ্রীত্যর্থে বিনির্ম্মায় ইষ্টকময় মন্দিরং ।।
বিচিত্রং রচিতং রম্যং রজতাভং পরিস্কৃতং
দদৌ শিবায় শান্তায় ব্রহ্মনে পরমাত্মনে
যাচতে তৎপদে ভক্তিং মুক্তিং বা দেহি শংকর।।
চলবে