সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৯)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ
রামোজি ফিল্ম সিটি

রামোজি নিয়ে লিখতে বসলে খেই হারিয়ে যায়।

রামোজি ফিল্ম সিটি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ফিল্ম সিটি। ভারতের হায়দ্রাবাদে প্রায় ২০০০ একর জায়গা জুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে এ ফিল্ম সিটি। ১৯৯৬ সালে রামোজি গ্রুপ এই প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করে। বিশাল আয়তন, ব্যাপক সুযোগ-সুবিধা এবং বিভিন্ন লোকেশনের সমাহারে গড়ে ওঠা এই সিটি এক অভিনব বিশেষত্বের জন্য জায়গা করে নিয়েছে পৃথিবীর প্রত্যেকটি দেশে,, গিনিস বুকে। দেশ বিদেশের বিভিন্ন ভ্রমণ পিপাসুদের কাছে এ এক অমোঘ আকর্ষণের জায়গা হয়ে উঠেছে।

তেলেগু সিনেমার প্রযোজক রামোজি রাও এই ফিল্ম সিটিটি নির্মাণ করেন। তার নামানুসারে তাই এই ফিল্মি দুনিয়ার নামকরণ করা হয়েছে রামোজি ফিল্ম সিটি। বছরে প্রায় ১৫/২০ লাখেরও বেশী পর্যটক এখানে ঘুরতে আসেন। গড়ে দৈনিক ৭/৮/১০ হাজার পর্যটকের ভিড় এখানে সারাবছর লেগেই থাকে। পর্যটকদের দর্শনী মূল্য থেকে রামোজি ফিল্ম সিটির দৈনিক আয় প্রায় ৪৭ লাখ ভারতীয় রুপি।

গ্র্যান্ড ওয়েডিং, কর্পোরেট পার্টি, জন্মদিন, অ্যাডভেঞ্চারসহ নানা প্রয়োজনে প্রতিদিন দেশি বিদেশি ১০/১৫ হাজারেরও বেশি লোক সমাগম হয়ে থাকে। সেই হিসেবে দেখতে গেলে তেলেঙ্গানা রাজ্যের খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ব্যস্ত হল এই হায়দ্রাবাদ শহর। যেখান থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই রামোজি ফিল্ম সিটি।

রাজ্যের যে কোন প্রান্ত থেকে সহজেই আসা যায় রামোজিতে। সারা রাজ্যেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রামোজি ফিল্ম সিটির বিভিন্ন ট্রাভেল এজেন্সী।
রামোজি নিয়ে লিখতে বসলে
কোথা থেকে শুরু করব আর কি কি যে বলব সব যেন গুলিয়ে যায়।

দেখার কতকিছুই যে রয়েছে এই রামোজি ফিল্ম সিটিতে! আমি হয়তো তার সবকিছু বলে উঠতে পারছি না। কত কিছুই বাদ পড়ে যাচ্ছে। আসলে এত বড়ো ফিল্ম সিটি একদিনে তো দেখে শেষ করা যায় না। খুঁটুয়ে দেখতে হলে এখানে থেকে মোটামুটি সাতটা দিন লাগবে।

আমি ঐ অল্প সময়ের মধ্যে যা যা দেখেছি তাই ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাচ্ছি। কতরকমের পার্ক ছিল সেভাবে দেখাই হয় নি। ফেরার তাড়া ছিল তাই অনেক কিছুই মিস হয়ে গেছে। তারই মধ্যে যেগুলো দেখেছি সেগুলোই বলছি।

যেমন মুঘল গার্ডেন ,,
ফেরিস হুইল বিনোদনমূলক রাইড,,বিষয়ভিত্তিক আকর্ষণ
ইউরেকা – মজার গেটওয়ে, ওয়াইল্ড ওয়েস্ট, রামোজি মুভি ম্যাজিক ইন্টারঅ্যাকটিভ আকর্ষণের সাথে যা চলচ্চিত্র নির্মাণের রহস্য উন্মোচন করে, অন্ধকার রাইড, মহাকাশ যাত্রা, পৌরাণিক সেট, থিমযুক্ত গুহা, বাহুবলি সেট, ফান্ডুস্তান – বাচ্চাদের আকর্ষণ এবং আরও অনেক কিছু।

প্রতিদিনের লাইভ শো
দৈনিক লাইভ শো
যেখানে প্রতিদিন শত শত শিল্পী লাইভ পারফর্ম করেন। এখানে লাইভ শোগুলি রঙিন টেমপ্লেটের একটি বড় অংশ গঠন করে। এটি একটি দর্শনীয় নৃত্য শো, ব্ল্যাকলাইট পোশাকে পারফরম্যান্স, অ্যাকশন-প্যাকড স্টান্ট শো এবং দাদাজিনের সাথে লাইভ শো।

ঢালাও খাদ্য এবং পানীয়। কোথাও কোন অসুবিধে নেই। তবে সবই কিনে খেতে হবে। সেখানে বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁ রয়েছে।

প্রতিটি রেস্তোরাঁর আলাদা আলাদা বিশেষত্ব। থিম-ভিত্তিক মাল্টি-কুইজিন বুফে, খাঁটি হায়দ্রাবাদি খাবার, ভেজ বুফে, জৈন খাবার, রাজস্থানী স্ন্যাকস, ওয়েস্টার্ন এবং ওরিয়েন্টাল খাবার বা বাহুবলি-থিমযুক্ত রেস্তোরাঁ ,, যা বাহুবলী দরবার নামে বিখ্যাত।হায়দ্রাবাদের দিলসে রেস্তোরাঁ, সুপার স্টার রেস্টুরেন্ট, সঙ্গম রেস্টুরেন্ট সব যেন ছবির মতো সুন্দর।

তবে এইসব বড়ো বড়ো রেস্তোরাঁয় আমরা সেদিন ঢুকিই নি। প্রচুর দেখার জিনিস,, হাতে সময় কম। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে চিকেন স্যান্ডুইচ খেয়েই পেটটা বেশ ভরিয়ে ছুটেছি আর একটা কিছু দেখার জায়গায়।

রামোজি ফিল্ম সিটিতে কর্পোরেট ইভেন্ট ও রয়েছে।
ওয়াইল্ড ওয়েস্ট স্টান্ট শো দেখতে হলে হার্ট একটু শক্ত হওয়া দরকার ।বিশেষ নাচের যে শো হয় সেটা শুনেছি খুব ভালো কিন্তু আমার দেখার সৌভাগ্য হয় নি। আমরা যে সময়টায় পৌঁছে ছিলাম তার পাঁচ মিনিট আগেই শেষ হয়েছে। আবার আধঘন্টা পর শুরু হবে। আধঘন্টা অপেক্ষা করতে গেলে যদি আর একটা কিছু মিস হয়ে যায়। আমার অপেক্ষা করার ইচ্ছে ছিল মেয়েটা নাচ করে তো ওর দেখতে ভালো লাগবে।

সিংহ মশাই বলল দূর চলো তো সিনেমায় তো অনেক নাচ দেখেছ। ব্যাটাচ্ছেলেরা এক্সট্রা আর কি করবে ঐ সিনেমায় যা দেখায় সেসবই করবে। আমি তাও একটু মিউ মিউ করে বললাম অন্যরকমও তো হতে পারে। কেশর দুলিয়ে বলল বসে থাক তাহলে। ফিল্ম মেকিং দেখা হবেনা। আরে সিংহটা বলে কি কিভাবে সিনেমা তৈরি হয় সেটাই দেখব না! তারও একটা শো টাইম আছে। সেই টাইমের মধ্যে না গেলে আবার পরের শো এর জন্য অপেক্ষা করতে হবে। কি যে করি!
কানের কাছে ফিসফিস করে বলল “এই চল্ তো নাচ আর দেখতে হবে না। কি নাচবে সব জানা আছে আমার। ফিল্ম সিটি তে ফিল্মের নাচই হবে। কত্থক ভরতনাট্যম তো আর হবে না”।

মুডে থাকলে আমরা একে অপরকে “তুই” করেই কথা বলি। বেশ ভালো লাগে। কলেজের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে যায় আর তার সঙ্গে ভেসে যাই একটা অদ্ভুত রকমের ভালোলাগায়। তবে একটা কথা বলতেই হয় আমার সিংহ মশাই সব জানে। যে কোন ব্যাপারে এমন লেকচার দেবে যে জানা জিনিস ঘোল খাইয়ে ছেড়ে দেবে।

অনিচ্ছা সত্ত্বেও চলে গেলাম ওখান থেকে। বাসে চড়ে বসলাম। এবার ফিল্ম মেকিং দেখব। কিভাবে সংলাপ সহ একটা দৃশ্য তৈরি হয় মানে পর্দার পিছনের গল্প টা জানতে চলেছি আমরা। একটা হালকা উত্তেজনা হচ্ছে।
মনে মনে ভাবছি সত্যিই কী দারুণ এই ফিল্মি দুনিয়া। আধ ঘন্টার শো ছিল। হালকা অন্ধকার ঘরে গিয়ে যখন বসলাম তখনও ভাবিনি কী অসাধারণ একটা বিষয় আমি দেখতে এবং জানতে চলেছি। দুর্দান্ত একটা শো। কিভাবে একটার পর একটা দৃশ্য ক্যামেরায় বন্দি হয় এবং কিভাবে সংলাপ রেকর্ড হয়। তারপর সেই দৃশ্যের সঙ্গে সংলাপ মিলিয়ে একটা সিনেমার দৃশ্য পূর্ণাঙ্গ রূপ পায় ঐ আধ ঘন্টায় কী সুন্দর ভাবে যে বুঝে গেলাম আমরা সবাই ,, সেটা না দেখলে বোঝানো সম্ভব নয়। হল থেকে বেরিয়ে আসার সময় মনে হল আর একবার দেখলে ভালো হত।

যাইহোক ফিল্ম মেকিং দেখার পর মনে হল ফিল্মি দুনিয়াটা খুব সুন্দর। আর সেই দুনিয়ায় হলিউড বলিউড টালিউড সব যেন মিলেমিশে একাকার।

ফিল্ম সিটি তে প্রতিদিন শত শত শিল্পী লাইভ পারফর্ম করেন। ১২০০ জন সদস্য এবং প্রায় ৮০০০ এজেন্ট রয়েছে এখানে।
কিডস অ্যামিউজমেন্ট রাইডস গুলো ও দারুন।
অনেক রকমের বিনোদন শো রয়েছে। যে যেটাতে যেতে ইচ্ছুক যেতে পারে। আমাদের সঙ্গে কোন বাচ্চা ছিল না। তাই এইসব শো দেখার উৎসাহ বা চাপ কোনটাই অতটা ছিল না। তবে ফিল্ম সিটি টা এমন ভাবেই তৈরি সেখানে বাচ্চা বুড়ো সবাই খুব আনন্দ করতে পারবে।

শুটিং ছাড়াও অন্য যে কোন ধরনের অনুষ্ঠান আয়োজনের ব্যবস্থা রয়েছে রামোজি ফিল্ম সিটিতে। ছোট খাট পার্টি ও করা যায়।

হায়দ্রাবাদের বৃন্দাবন সেট, মহাভারতের সেট,, স্টিম ইঞ্জিন, নানা ধরনের ফিল্মের সেট থিম পার্ক বিনোদন মূলক রাইড রেলওয়ে যেখানে চেন্নাই এক্সপ্রেস ছাড়াও আরও বড়ো বড়ো সিনেমার স্যুটিং হয়েছিল এবং এখন হচ্ছেও। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে স্যুটিংও দেখলাম। ঝট্ ঝট্ করে সব দেখা হয়ে গেল।

বাহুবলীর স্যুটিং সেটের কথা আর কী বলব। ওখানে সময়টা একটু বেশিই লেগেছিল আমাদের। বাহুবলীর “ভল্লালদেব”এর একটা বিশাল মূর্তি রয়েছে।
অপূর্ব অপূর্ব,, লিখে বোঝানো সম্ভব নয়। আমিও বাহুবলীর সঙ্গে একটা ছবি তোলার লোভ ছাড়তে পারি নি।

মহাভারতের সেই রাজসভায় দাঁড়িয়ে যেন স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছি ঐ তো ঐখানে দুঃশাসন দ্রৌপদী কে অপমান করছে। পাশা খেলা হচ্ছে,, দুর্যোধনের অট্টহাস্য।
অসাধারণ। মহাভারতের কথা গুলো আমরা শুনতে পাচ্ছি ব্যাকগ্রাউন্ড থেকে। আর পুতুল গুলো কি সুন্দর লিপ মেলাচ্ছে!! চোখের পলকও পড়ছে! মনে হবে সত্যি সত্যিই ওরা বসে আছেন। ভীষ্ম,,, দ্রোণাচার্য,,, না দেখলে এই অসাধারণ দৃশ্য অনুভব করা সম্ভব নয়।

আরও অনেক জায়গায় গেলাম। আস্কারি গার্ডেন, জাপানিজ গার্ডেন, বাটারফ্লাই মিউজিয়াম। সেখানে এক একটা প্রজাপতির পেছনে দাঁড়িয়ে সবাই ছবি তুলছে। কী যে সুন্দর,,,, অনেক রকমের পার্ক,,,wings exotic Bird Park…..কৃপালু কেভস্,,,
তার সঙ্গে ছিল স্পেস যাত্রা,,
হায়দ্রাবাদের ইউরেকা লেখা মজার জায়গায় মজার গেটওয়ে। প্রচুর ছবি তুললাম। ওয়াইল্ড ওয়েস্টেও ছবি তোলা হল।

ফেসিলিটি র কথা কি বলব? সব জায়গাতেই রয়েছে ছোট বড়ো খাবারের দোকান, বাথরুম,, ব্যাঙ্ক,,পোস্ট অফিস,,এ টি এম,, রেস্ট রুম,, শপিং সেন্টার,, চেঞ্জ রুম,,এমন কি বেবি ফিডিং রুম,, ভাবা যায়?
সব জায়গায় ঠান্ডা জলের ব্যবস্থা। গরমে আমাদের একটুও কষ্ট হয় নি। রেস্ট রুম ছিল। এসিতে পাঁচ মিনিট বসে একটু ক্লান্তি দূর হল যেন।

ভীষণই ভাল লেগেছে রামোজি ফ্লিম্ সিটি। যাদের যাওয়া হয়নি তাদের যে ভালো লাগবেই সেটা গ্যারান্টি দিয়ে বলতে পারি। খুব খুব ভালো লাগবে। সকাল ৯:৪৫ এ ওপেনিং সেরিমনি শুরু হয়। দেখতে হলে একটু তাড়াতাড়ি পৌঁছতে হবে। আমরা দেখতে পাই নি। আসলে অতটা হোম ওয়ার্ক করা ছিল না।

আমার আজকের এই দিন টাও বেশ ভালো কাটল। হায়দ্রাবাদ বেশ ভালোই লাগছে। হায়দ্রাবাদ ঘোরা শেষ হলে আমরা যাব তিরুপতি দর্শনে।
একদম শেষে শপিং মলে এলাম। প্রচুর কেনাকাটির জিনিস রয়েছে। শপিং বলতে বিশেষ কিছু কিনলাম না। মেরীর জন্য একজোড়া মুক্তোর পায়েল কিনলাম শুধু।

বিকেল সারে ছটা বেজে গেল কিভাবে যে কেটে গেল একটা দিন বুঝতেই পারলাম না। কাল ভাবছি মিউজিয়াম যাব। পৃথিবী বিখ্যাত সালারজং মিউজিয়াম।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।