T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় বুলা বিশ্বাস

থ্রী চিয়ার্স ফর ঠাম্মি
বিশ্বকর্মা পুজো উপলক্ষ্যে এবারেও আগে ভাগে ঘুড়ির লড়াইয়ের আয়োজন হয়েছিল, মিত্র বনাম চাটুজ্জেদের সাথে লড়াই। প্রতিবারের মত এবারে বড়দের লড়াইএর ব্যবস্থা করা হয় নি। এবারের প্রতিযোগিতা ছোটদের জন্য। ওই বারো থেকে সতেরো বছর পর্যন্ত যোগ দিতে পারবে। তার সাথে এটাও বলা হয়েছিলো, দুই পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের মধ্যে কেউ যদি এই খেলায় অংশগ্রহণ করার ইচ্ছে প্রকাশ করেন, খেলা শেষ হবার দশ মিনিট আগে, তিনি নিজের নিজের দলের হয়ে খেলতে পারবেন। তবে নিয়মাবলী মেনে তাঁকে খেলতে হবে। খেলার ভেনু দুই পরিবারের দুটি পাঁচিলঘেরা ছাদ। দু’পরিবারেই সাবেকিয়ানা এখনো বজায় রয়েছে। পাড়ার ক্লাবে পুরস্কার বিতরণী উৎসব হবে। বড়ো শিল্ডও আনা হয়ে গেছে।
রং ঠিক করে দেওয়া হয়েছে। মানে মিত্র পরিবার লাল, চাটুজ্জেরা সবুজ। পোশাক, ঘুড়ির রং সেইমতোই। সকাল দশটার কিছু আগে থেকে পাঁচতলার দু’দু’টো ছাদে বেশ ভালোই লোক হয়েছে। দু’পক্ষই প্রস্তুত। বেলা দু’টো পর্যন্ত খেলা চলবে।
খেলা শুরু হয়ে গেছে। প্রায় বাইশ মিনিট।
‘ভোকাট্টা’ রবে যখন চাটুজ্জেদের ছাদে বিরাট চিৎকার শুরু হয়, মিত্রদের ছাদে তখন চিন্টু আর সোনাইকে ওদের ঠাম্মি ভীষণভাবে উৎসাহ দিয়ে চলেছেন।
ঠাম্মি বলছেন, ‘চিন্টু, দমে যাস না। এইতো সবে শুরু। দমেছিস কি হেরেছিস। তোদের বাপদাদারা এখনো পর্যন্ত ‘সেরার সেরা’ খেতাব পেয়েছে।
চিন্টু তখন ভীষণভাবে উত্তেজিত। একেবারে যেন খেঁকিয়ে ঠাম্মিকে বলে উঠলো, ‘প্লিজ এরকম একটা ক্রুশিয়াল টাইমে, তুমি মেলা বকবক কোরো না, ঠাম্মি। এখুনি যদি ওদের একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা না করতে পারি, বুঝতে পারছো, সম্মান বলে কিছু থাকবে?’
চিন্টুর হাতে লাল ঘুড়ি কড়কড়ে মাঞ্জার সাথে দূরে ধারালো তলোয়ারের মত ফৎফৎ করে উড়ছে।
চিন্টু বকেই চলেছে। ‘সোনাই লাটাইটা ঠিক পজিশনে রাখবি, যতটা ছাড়ার ততটা ছাড়বি। বি সিরিয়াস। দ্যাখ, ওদের ঘুড়ি কিন্তু এদিক পানেই ধেয়ে আসছে। কান্নিক মেরে কাটাতেই হবে। সোনাই, সোনাই তাড়াহুড়ো করিস নি। খুব আস্তে। যাঃ, আর একটু হলেই কেল্লাফতে হতো।’
চিন্টুর দৃষ্টি শ্যেনের মত প্রখর।
ওদিকে চিন্টুর ধমকানি খেয়ে ঠাম্মি চুপ করে গেছেন। দৃষ্টিকে কিন্তু দূর পানে প্রসারিত করে দিয়েছেন।
দু’পক্ষই ভীষণ ভালো খেলছে।
দু’টো ঘুড়িই হাওয়ার তেজে উড়ছে। কখনো লাল নীচে তো কখনো সবুজ। কখনো সবুজ নীচে তো লাল উপরে।
রুদ্ধশ্বাস গতিতে খেলা চলছে। এভাবে প্রায় দশ মিনিট কেটে গেছে।
হঠাৎ সোনাই চিন্টুকে আস্তে করে বললো, ‘দাদা, আমাকে একটু দিবি। তুই লাটাইটা ধর।’
‘আরে, দেবো, দেবো। দাঁড়া মারের বদলা একটা মার দিয়ে নি। তারপর তোর হাতে দেবো। তুই ততক্ষণে লাটাইটা সামলা। বলতে বলতেই সবুজ ঘুড়ি কেটে গিয়ে তালগাছের মাথায় আটকালো।
‘ভোকাট্টা’ বলে ঠাম্মির অমন চিৎকারে চাটুজ্জে বাড়ির বয়োজ্যেষ্ঠ, শশিকান্ত চাটুজ্জে নিজেদের ছাদ থেকে প্রমীলা বৌদির দিকে হাসি ছুঁডে দিয়ে দু’হাত নাড়া দিয়ে অভিবাদন জানালেন।
খেলার সময় কমে আসছে। এখনও পর্যন্ত ম্যাচ ড্র চলছে।
ঠাম্মি বললেন, ‘তোরা খেল। আমি একটু নীচ থেকে আসছি।’
সোনাই চিৎকার করে উঠলো। ‘খবরদার ঠাম্মি, তুমি এখান থেকে এক পাও নড়ো না। আজকের খেলায়, তুমি আমাদের কাছে লাকি।’
চিন্টু খুব মনোযোগ সহকারে খেলছে। একটু এদিক ওদিক করা যাবে না। আকাশের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করেই সোনাইকে বলে উঠলো, ‘তুই বেশি কথা বলিস না। হাওয়ার গতিবেগ তত ভালো নয়। যে কোনো সময় খেলার ফল যা কিছু হতে পারে।’
ঠাম্মি আকাশপানে তাকিয়ে আছেন। হঠাৎই তিনি কেমন নস্টালজিক হয়ে পড়লেন। এক হ্যাঁচকা টানে নিজেকে নিজের কিশোরী বয়সে নিয়ে চলে গেলেন। বড় ডানপিটে ছিলেন তিনি। গাছে চড়া, অন্যের বাগান থেকে ফল চুরি করা, সময়ে অসময়ে, পুকুরের জলে ঝাঁপিয়ে পড়ে সাঁতরে এপার ওপার করা, ডাংগুলি, গুলি খেলা। আর ছেলে বন্ধুদের সাথে ঘুড়ি ওড়ানো ছিল তাঁর প্রিয় খেলা। এসবের খবর নাতিরা অল্প বিস্তর জানে বইকি! কারণ, ওদের কাছে ঠাম্মিই এসব গল্প করেছেন।
হঠাৎ ঠাম্মি বলে উঠলেন, ‘চিন্টু, আর কিন্তু কুড়ি মিনিট বাকি। খেলা এখনও ড্র চলছে। আমাকে একটু ওড়াতে দে না।’
সোনাই মিচকে হেসে বললো, ‘খবরদার না, দাদা। ঠাম্মিকে ঘুড়িতে হাত দিতে দিস না। আমরা গো হারান হেরে যাবো।’
চিন্টু বেশ গম্ভীরভাবে বললো, ‘আরে না না, সেরকম নয়। ঠাম্মি ভালো ঘুড়ি ওড়াতে পারেন। তবে কিনা ঠাম্মি, তুমি জানো, আমরা কিন্তু লাল।
ঠাম্মি হাসতে হাসতে বললেন, ‘ও এই কথা। আমি এখুনি নীচ থেকে আসছি।’
ঠাম্মি তড়তড় করে নীচে নেমে এসে, আঁচলে বাঁধা চাবির গোছা থেকে একটা চাবি নিয়ে খাটের নীচে রাখা ছোটো তোরঙ্গ থেকে বহুদিনের সযত্নে ভাঁজ করা নিজের একটা টকটকে লাল রঙের তাঁতের শাড়ি বার করে, আটপৌরে করে পড়ে, চিন্টু সোনাই এর সামনে এসে দাঁড়ালেন।
ওরা তো অবাক। ‘ঠাম্মি, তুমি!’
চিন্টুর হাত থেকে ঘুড়ির সুতোটা হাতে নিতেই, চাটুজ্জেদের ছাদ থেকে বিশাল করতালির আওয়াজ পাওয়া গেল। চিন্টুর হাতে লাটাই। সোনাই হাততালি দিচ্ছে।
সোনাই চিৎকার করে বলে চলেছে ‘ঠাম্মি, তোমাকে পারতেই হবে,’
বলে ঠাম্মিকে খেলায় উৎসাহিত করতে ব্যস্ত।
ওদিকে শশিকান্ত চাটুজ্জের হাতে সবুজ ঘুড়ির মাঞ্জা। আকাশের বুকে এতো ঘুড়ির লড়াই নয়, এ যেন দুই মল্লযোদ্ধার কসরৎ চলছে। খেলার মারপ্যাঁচ একেই বলে। খেলা শেষ হতে মাত্র তিন মিনিট বাকি। সবুজ ঘুড়ি কেটে, ঠাম্মি তাঁর লাল ঘুড়ির সাথে টানতে টানতে নিজেদের ছাদে নিয়ে ফেললেন।
দুই-এক পয়েন্টে, লাল, অর্থাৎ মিত্র বাড়ির জয় ঘোষণা হলো।
আনন্দের আতিশয্যে ওই রোগা প্যাটকা চিন্টু আর সোনাই ঠাম্মিকে কোলে তুলে নিয়েছে
সমবেত স্বরে চিৎকার করছে, ‘ হুররেএএএ! থ্রী চিয়ার্স ফর ঠাম্মি, ঠাম্মি।’
লাল শাড়ি পড়া ঠাম্মি, লজ্জায় রাঙা হয়ে পড়েছেন। আর যখন দেখছেন, চাটুজ্জেদের বাড়ির ছাদ থেকে সবাই ঠাম্মিকে দেখছে, তারা হাততালি দিয়ে অভিবাদন জানাচ্ছে, শশিকান্তবাবু বলছেন, ‘বৌদি এই বয়সেও যা করে দেখালে, সত্যিই অভিনব।’
ঠাম্মির মুখে জয়ের হাসি যেন বিচ্ছুরিত হয়ে পড়ছে।