T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় সুলগ্না চৌধুরী

ঘুড়ির আত্মকথা
ইতিহাস বলে আমার প্রথম উৎপত্তি চীন দেশে,,
এই দেশে আমার পরিচিতি নবাব আর রাজ রাজাদের,বাবুদের অবসরের বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে। তাদের ফূর্তির বহিঃপ্রকাশ আমি। আকাশটা জুড়ে হরেক নামে,হরেক রঙের ফূর্তির উড়ানই হলাম আমি। আমার বংশমর্যাদায় অতীতের ইতিহাস। আমি ঘুড়ি।
চাঁদিয়াল,পেটকাট্টি,মোমবাতি, চাপরাশ,ময়ূরপঙ্খী, হাফচাপরাশ আরো কতো নাম ভিন্ন দেশে,ভিন্ন নাম। শখের ঘুড়ি আমি।
দূর আকাশে মেঘেরা ভেসে বেড়ায়,ভেসে যাওয়া মেঘের দলের দিকে তাকিয়ে ভাবি আমিও যদি দূর হতে দূর দিগন্ত অতিক্রম করতে পারতাম!
উড়ে যায় পাখি এ প্রান্ত থেকে সে প্রান্ত,, উড়ে যাওয়ার সীমাহীন আনন্দ তার,,নেই সীমান্ত পারের কোনও বাধা। আমি তাদের দেখি আর মনে,মনে বড্ড হিংসে করি,ওরা কি ভীষণ স্বাধীন! নিজের ইচ্ছের মালিক। মন মর্জির মালিক। স্বাধীন ভাবে ওড়ার মর্যাদায় ওদের আত্মসম্মান আছে।
আমিও তো উড়ি,কিন্তু আমি যে বড্ড পরাধীন গো। আমার উড়ে চলার নির্দিষ্ট গতিবিধি আছে। আছে ওড়াউড়ির নির্দিষ্ট সীমা। আছে সমতল থেকে ধরে রাখা পরাধীনতার মাপকাঠি। আমি শুধু স্বাধীনতার দেখনাই রূপ।
উড়তে গিয়ে কতকিছু ভাবনা বেলাগাম হয়ে যায়, ভাবনার তো আর নির্দিষ্ট সীমানা নেই বল? ভাবনাও স্বাধীন। উঁকি দিয়ে দেখি দূরে বয়ে যাওয়া নদী, তার ওইপারে আরেক শহর,,হয়তো তার ওই পারে সুউচ্চ পাহাড়, তার চূড়ায় ঠিকরে পরে ভোরের সূর্য,অস্তরাগের শেষ রশ্মির গোলাপি আলো,আমি মুগ্ধ হই,ছুঁতে চাই,,,, অথচ আমার মাঞ্জা সুতোর বাঁধন আমায় টেনে রাখে উড্ডীনের আনন্দের মোহভঙ্গ হয় আমার।
আমি তো স্বাধীন হতে পারিনি।আমার ওড়ার নিয়ন্ত্রক থাকে পৃথিবীর বুকে,যার হাতে লাটাই,আমার ওড়ার ক্ষমতা তার। আমার মাঞ্জাটা ধরে নীচের দিকে সুতোয় টান দিলে আর বাতাসের শক্তি ঊর্ধমুখী কাজ করলে তবেই তো আমি তরতরিয়ে উড়ে যাই। কিন্তু নিয়ন্ত্রণ সেই অপরের হাতে।
আমি মানুষের প্রিয় মনোরঞ্জনের বস্তু বটে। আমায় ঘিরে ঋতুতে,ঋতুতে উৎসব হয়,দেখে মনে হয় বেশ মজা আমার তাই না?পৌষ সংক্রান্তি আর বিশ্বকর্মাপূজার মতো পালা পার্বণে আমার কদর খুব।
অথচ দেখ,সেই লাটাইয়ের সুতো ছাড়তে,ছাড়তে যতদূর,আমিও ততদূর। বহুদূর ইচ্ছে হলেও উপায় নেই যে! কারণ সুতোরও যে একখানা পরিমাপ থাকে বল? তাই আমার ওড়াও স্তব্ধ হয়ে যায় সেই সুতোর মাপের বহরে।
মাটির পৃথিবীতে দাঁড়িয়ে থাকা লাটাই এর সুতোর সংবেদনশীলতা,উত্তেজনাই আমার সব কিছু। আমায় নিয়ে কল্পনা করা যায়,স্বপ্ন দেখা যায়,,,সাধের পেটকাট্টি,চাঁদিয়াল,,,আমি ঘুড়ি। আমার জীবন ঘিরে টানাপোড়েন আছে।
আমার ঘুরে বেড়াবার মধ্যে মিথ্যে স্বাধীনতা আছে। অন্যের আনন্দের বহিঃপ্রকাশ আছে। একবুক নিঃশ্বাস টেনে নিয়ে তাতে এক চোখ স্বপ্ন এঁকে ভালোবাসতে বাসতে,ভাসতে,ভাসতে স্বপ্নগুলো সত্যি হবে মনে করে,অপেক্ষায়,আর মনের অন্দরের সাজিয়ে রাখা অল্পকথায় অনেক আশা নিয়ে উড়ি আমি।
কিন্তু কি অদ্ভুত জান! এ ওড়ার পিছনে আছে জয়-পরাজয়ের কাহিনী,তোমরা তো পালা পার্বণের ঘুড়ির লড়াই নিয়ে মাতোয়ারা হয়ে যাও।
জয়ী হওয়া ঘুড়ির সুতোটা কি অহংকারে কখন যেন হেরে পরাজিতের টীকা এঁকে দিয়ে যায় হেরে যাওয়া ঘুড়ির কপালে। হেরে যাই৷ আমি।আমার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়,,বিজয়ের জয়োল্লাস আমার ঘুম ভাঙিয়ে দেয়”ভোকাট্টা”র চিৎকারে।
হাত বদলের অভিমান বুকে নিয়ে আমি নেমে আসি,শেষ হয়ে যায় আমার শূন্যের লড়াইয়ের অহংকার আমার ওড়ার স্বপ্ন চুরি হয়ে যায়। সাধের লাটাইয়ের মাঞ্জা আমার পরাজয়ের সাথে,সাথে আত্মগ্লানিতে চূর্ণ করে নিজেকে,আমার মালিকানা বদল হয়ে যায়,আবার অন্য কারোর আমি,,,,তবু থামতে নেই।
লাটাইয়ের সাধের,আর শখের ঘুড়ি আমি তাই মালিকানা পরিবর্তন এর সাথে নতুন আবেগ,নতুন উষ্ণতায়,একমন স্বপ্ন আর শক্তি সঞ্চয় করে অনুকূল পরিবেশে তরতরিয়ে এগিয়ে চলি,আদরে আর আহ্লাদে ভর করে।
আকাশ জুড়ে উড়ে চলেছি আমরা,হরেক রঙের আর রকমের ঘুড়ি,নীল আকাশ ছোঁয়ার বাসনায়।
আমায় যদি প্রশ্ন কর -স্বাধীনতা কি?
আমার উত্তর — যে উড়ান অন্যের মনের মর্জির ফুর্তি রাখা এক পরিমাপে উড্ডীন,নিজের মনের মতন করে অনন্ত আকাশ ছুঁতে না পারার বিধিনিষেধ, গ্লানি আর সীমাবদ্ধ গণ্ডির ধূসর রঙ। পরাধীনতার এক নাম আমি।