T3 || ঘুড়ি || সংখ্যায় সমীরণ সরকার

ভোকাট্টা
শরতের আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভাসতে শুরু করেছে। বর্ষার পরে ধুলোকণা মুক্ত বায়ুমণ্ডল ভেদ করে আসা সূর্যের সোনা গলা রোদ্দুরে ঝলমল করছে চারিধার। নদীর তীরে কাশবন সাদা পতাকা দিয়েছে উড়িয়ে। সারারাত ধরে টুপটাপ ঝরে পড়েছে শিউলি। জননীর চরণ স্পর্শ লাভের জন্য সে উদ্বেল। ঘাসের ডগায় শিশির কণা হীরক দ্যুতি ছড়াচ্ছে। কুমোর পাড়ায় এখন ব্যস্ততা তুঙ্গে। শরতের আকাশ বাতাস পুজোর গন্ধে ম ম করছে। আগমনী গান ধরেছে বিশ্ব প্রকৃতি।
এই শারদোৎসবের সূচনা হয় ভাদ্র মাসের শেষ দিনটিতে দেব শিল্পী বিশ্বকর্মার আরাধনার মধ্য দিয়ে। আর বিশ্বকর্মা পুজো মানেই সারা দেশ জুড়ে ঘুড়ির উৎসব। মকর সংক্রান্তি এবং বিশ্বকর্মা পুজোর দিন গোটা দেশের মানুষ মেতে ওঠেন ঘুড়ির উৎসবে। কলকাতায় পৌষ সংক্রান্তিতেও ঘুড়ি ওড়ানো হয়।
তামিলনাড়ুতে বিখ্যাত পোঙ্গল উৎসবে এবং গুজরাটে উত্তরায়ণের সময় মকর সংক্রান্তি উপলক্ষে ঘুড়ি উৎসব পালিত হয়।
বিশ্বজুড়েই ঘুড়ি ওড়ানো একটা মজার খেলা। বহু দেশে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব ও প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, আফগানিস্তান প্রভৃতি দেশে ঘুড়ি ওড়ানো একটি বিনোদনমূলক উৎসব।
বাংলাদেশের পুরনো ঢাকায় পৌষ সংক্রান্তির দিনে ঘুড়ি উড়ানো উৎসব হয়।
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিশ্বকর্মা পূজার দিনে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রথা আছে। বিশ্বকর্মা পূজা মানেই ভোকাট্টা। নীল আকাশে রংবেরঙের অগুনতি ঘুড়ির মেলা। আর চেষ্টা কখন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে ভোকাট্টা করানো যায়।
ঋগ্বেদ অনুসারে , বিশ্বকর্মা স্থাপত্য এবং যন্ত্র বিজ্ঞান বিদ্যার জনক ।
মনে করা হয়, কারিগরি বিদ্যায় কুশলী দেব বিশ্বকর্মা দেবতাদের জন্য উড়ন্ত রথ তৈরি করেছিলেন বলেই তাঁর আরাধনার দিনে উড়ন্ত ঘুড়ির মাধ্যমে তাঁকে শ্রদ্ধা জানানো হয়।
বিভিন্ন দেশে ঘুড়ির আকৃতি এবং নাম আলাদা আলাদা হয়। চারকোণাকৃতি ঘুড়ি, রোলার ঘুড়ি, বক্স ঘুড়ি, ড্রাগন ঘুড়ি, সাপ ঘুড়ি মৌচাক ঘুড়ি আরো কত কি।
শুধু সাধারণ মানুষ নয়, জমিদার রাজা নবাবরাও ঘুড়ি উড়ানোর আনন্দ উপভোগ করতেন।
কথিত আছে রাজ আমলে বর্ধমান রাজবাড়িতে ঘুড়ি ওড়ানোর চল ছিল। বর্ধমানের রাজারা এসেছিলেন পাঞ্জাব থেকে। সেখানে ঘুড়ি উৎসব জনপ্রিয়। মনে করা হয়, রাজাদের হাত ধরেই বর্ধমানের ঘুড়ি উৎসব জনপ্রিয় হয়।
কোথায় কোথাও আমাদের দেশের স্বাধীনতা দিবসের দিনে ঘুড়ি উড়ানো হয়। এই রেওয়াজ আছে দিল্লি, লখনউ ,বরেলির মতো জায়গায়।
ব্রিটিশ শাসকের হাত থেকে মুক্তির প্রতীক হিসাবে ঘুড়ি ওড়ানোর উৎসব পালিত হতো।
এমনকি স্বাধীনতা পূর্ববর্তী ভারতে ১৯২৮ সালে সাইমন কমিশনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদস্বরূপ ঘুড়িতে ‘ সাইমন গো ব্যাক’ লিখে ঘুড়ি ওড়ানো হতো।
গুজরাটে এখন প্রতিবছর আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসব হয়।
দেশ-বিদেশের ঘুড়ি প্রেমি মানুষেরা ওই উৎসবে যোগদান করেন। ৮ দিন ব্যাপী ঐ উৎসব চলে।
১৯৮৯ সালে ১৪ই জানুয়ারি গুজরাটে প্রথম আন্তর্জাতিক ঘুড়ি উৎসব হয়েছিল। ওই উৎসবে মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ,মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ঘুড়ি নির্মাতারা যোগদান করেছিলেন।
অনেককাল আগে থেকে মানুষ ঘুড়ি ওড়াচ্ছে। প্রথমে মানুষ গাছের পাতা দিয়ে ঘুড়ি তৈরি করে
মনের আনন্দে ওড়াতো। অবশ্য কোন দেশের আকাশে প্রথম ঘুড়ি উড়েছিল, তা নিয়ে অনেক বিতর্ক আছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে প্রায় ২৮০০ বছর আগে চীন দেশে ঘুড়ি ওড়ানো প্রথার উৎপত্তি ঘটে। সেখান থেকে তা এশিয়ার বিভিন্ন দেশে যেমন বাংলাদেশ ,ভারত, জাপান এবং কোরিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।
ইউরোপে এই খেলাটির প্রচলন ঘটে ১৬০০ বছর আগে। প্রথমদিকে ঘুড়ি কাগজ অথবা হালকা তন্তু জাতীয় সিল্কের কাপড় দিয়ে তৈরি হতো।
বিজ্ঞানী আরকিয়াতাস দাবি করেন, প্রায় ৪০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে গ্রীসে প্রথম ঘুড়ি উড়ানো হয়।
আবার শহর কলকাতায় ঘুড়ি উড়ানোর সূচনা হয়েছিল রাজ্য পরিতক্ত এক নবাবের হাত দিয়ে। ইংরেজদের চক্রান্তে ভাগ্য বিড়ম্বিত নবাব ওয়াজেদ আলি শাহ্ লখনৌ থেকে বজরা নিয়ে এসে ভিড়েছিলেন কলকাতার বিচালিঘাটে। মেটিয়াবুরুজ এলাকায় গড়ে তুললেন নতুন নবাবীয়ানা। ধরে রাখতে চাইলেন লখনৌর স্মৃতি। বিরিয়ানি ,বাইজি পাখির লড়াই এমনকি ঘুড়ির লড়াইও এলো কলকাতায়।
কলকাতা শহরে তখন বাবু কালচার শুরু হয়েছে। তারা মেতে উঠল ঘুড়ির প্রতিযোগিতায়। বাড়ির ছাদ থেকে, পাড়ার গলিতে ওড়ানো হতো ঘুড়ি।
ঘুড়ির গায়ে লাগিয়ে দেওয়া হতো টাকার নোট।
ঘুড়ির সঙ্গে টাকা লাগিয়ে ওড়ানোর এই রীতি নতুন মাত্রা যোগ করল বাবু কালচারে।
এত গেল শহর কলকাতার কথা। গ্রাম বাংলার বুকেও লাখো লাখো বালক কিশোর যুবকদের মনে নেশা ধরালো ঘুড়ি। পেটকাটি, চাঁদিয়াল , মোমবাতি ,মুখপোড়া, ময়ূরপঙ্খী –সে কত রকমের ঘুড়ি। আকাশে ঘুড়ি উড়ে না কিশোর বালক যুবকের স্বপ্ন ওড়ে।
ঘুড়ি ওড়ানোর আগে তার প্রস্তুতি সাংঘাতিক। এখনকার মতো আগেকার দিনে তৈরি চাইনিজ সুতো আর প্লাস্টিকের ঘুড়ি পাওয়া যেত না। ঘুড়ি পাওয়া যেত কাগজের আর মাঞ্জা তৈরি করতে হতো ঘরে। সুতোতে মাঞ্জা যত ভালো হবে তত শক্তিশালী হবে আর তাহলেই তো বিপক্ষের সঙ্গে লড়াইটা জমবে ভালো। সেই মাঞ্জা দেওয়ার জন্য ভাতের মাড় সাগু, কাচের মিহি গুঁড়ো লাগতো।
বালক কিশোরদের সেকি উৎসাহ ,হ্যারিকেনের চিমনি ভাঙা কাঁচ, ভাঙা কাঁচের শিশি সমস্ত জোগাড় করে রাখায়। তারপর সেই কাচগুলো হামন দিস্তায় একদম পাউডারের মত মিহি করে গুঁড়ো করে নেওয়া। সেই কাচের গুঁড়োর সঙ্গে
শিরীষের আঠা আর রং মিশিয়ে রিল সুতাতে মাঞ্জা দেওয়ার কাজ। তারপর সেই সুতো শুকিয়ে গেলে শুরু হত লড়াই। এত কড়া হতো সেই সুতো যে একটু অসাবধান হলে হাত কেটে রক্ত পড়তো।
লাটাই তো আগেই কেনা হয়েছে রথের মেলায়।
এবার তাতে সুতো জড়িয়ে নেওয়ার পালা।
তখনকার দিনের কাগজের ঘুড়ি একটু বাতাসের দাপট পেলেই ফেঁসে যেত। তখন সেই হতভাগাকে নামিয়ে এনে আবার অতিরিক্ত কাগজ দিয়ে রিপেয়ারিং করতে হতো। আর তাতে লাগতো বেলের আঁঠা।
লড়াই কখনো হতো পাড়ায় পাড়ায় কখনো বা বিশেষ বিশেষ উৎসব উপলক্ষে দিঘির মাঠে ঘুড়ির লড়াই হতো দু তিনটে গ্রামের মধ্যে।
সে কী উৎসাহ! শুধু কিশোর আর যুবকেরা নয়। তাড়াতাড়ি খাওয়া-দাওয়া সেরে গ্রামের প্রবীণ মানুষেরাও ভিড় জমাতেন দিঘির মাঠে। তারপর উত্তেজনায় টগবগ করে ফুটতে ফুটতে ঘুড়ির লড়াই দেখা।
একটা ছেলে ছোট থেকে এই ঘুড়ি খেলায় খুব আনন্দ পেলেও কখনো অংশগ্রহণ করতে পারেনি চোখের সমস্যার জন্য । তাই বলে সে ঘরে বসে থাকতো না। বন্ধুবান্ধব, দাদা ছোটকাদের পাশাপাশি থেকে সাধ্যমত সাহায্য করত। তবে সব থেকে তার বেশি আনন্দ হতো যখন কোন একটা ঘুড়ি ভোকাট্টা হতো।
ভোকাট্টা শব্দটা কানে গেলেই সে তীর বেগে ছুটতে শুরু করতো। তাঁর চির রুগ্ন দুই পায়ে তখন যেন হরিণের ক্ষিপ্রতা। কাঁটা ,জঙ্গল, সিয়কুলের ঝোপ, বিছুটির জঙ্গল কিছুই যেন তাকে দমিয়ে রাখতে পারত না। ওই ভোকাট্টা হওয়া ঘুড়িটা পেতেই হবে তাকে। কি যেন এক অলিখিত প্রতিযোগিতা। ঘুড়িটা লুটতে না পারলে বুঝি জীবনটাই ব্যর্থ হয়ে যাবে। অধিকাংশ সময় সেই ছেলে ঠিক পেয়ে যেত লাট খাওয়া ঘড়ি। আর তখন তার মুখে বিশ্ব বিজয়ীর হাসি। ঘুড়ি কোনদিন ওড়াতে পারলাম না তো কি হলো, লাট খাওয়া ঘুড়িটা তো কাউকে পেতে দিইনি।
ছোট থেকেই ঘুড়ির প্রতিযোগিতায় তার কান খাড়া হয়ে থাকতো, কখন কানে পৌঁছাবে ভোকাট্টা শব্দটা।
এখনো সেই ছেলেটা পরিণত বয়সে বসে আছে কখন কানে আসবে ‘ভোকাট্টা’ শব্দটা। এখন যে তাকে অনেকটা পথ দৌড়াতে হবে লক্ষ্যে পৌঁছাতে।