একটা গল্প বলবে মা? টুপুর বলে ওঠে। ঘুমের সময় টুপুরের মাথায় রোজ আলতো হাত রাখে অদিতি। ঘুমপাড়ানি গল্পে গানে ঘুম আসে টুপুরের। অদিতি সেদিন বলল, আজ উল্টোটা হোক। রোজ আমি বলি আজ তুই আমায় বরং একটা গল্প বল।
টুপুর মায়ের মাথার ওপর হাত রাখে। আজ চাউমিনটা খুব ভালো হয়েছিল,মা ।
অদিতি বলে, আমার সোনা মা। যা বানিয়ে দিই সোনা হেন মুখ করে খেয়ে নেয় মেয়েটা। মেয়ের নরম হাতের স্পর্শে ঘুম এসে যায় অদিতির। টুপুর গল্প বলে চলে ।
আমার একটা মিষ্টি মা আছে। আমার মা জল ফুটিয়ে তার মধ্যে এক চিমটি নুন ফেলে নরম হাতে দুমুঠো চাউ সেদ্ধ করে। ফুটন্ত সেই নুনজলে চাউমিন সেদ্ধ করতে করতে মা ভাবে বাবার কথা। তবুও আমার মা কিন্তু চাউমিন গলিয়ে ফেলে না। চাউমিনের জল ঝরিয়ে নিয়ে মা গাজর, বিনস, বাঁধাকপি, ক্যাপসিকাম আর পিঁয়াজ কেটে নেয় ঝিরিঝিরি করে। কাটতে কাটতে মা কেবলই ভাবে তার টুপুরের কথা। কড়াইতে তেল দিয়ে মা ডিমের ভুর্জি করে নেয়। বাবা আর টুপুরকে নিয়ে মায়ের সব চিন্তাভাবনার পরত গুলো খুলে এলোমেলো হয়ে যায় তখন। মা এবার প্রথমে পেঁয়াজ তারপরে সব সবজীগুলো একে একে দিয়ে দেয় কড়াইয়ের মধ্যে। নুন আর গোলমরিচের গুঁড়ো ছড়িয়ে দেয় । কাটা সবজীগুলো যখন গরমে ন্যায়দম খায় মা তখন নিজের কথা ভাবে। তারপর কড়াইয়ের মধ্যে হুস করে সেদ্ধ চাউমিন দিয়ে একটু তেল আর সয়াস্যস দিয়ে শুরু হয় মায়ের হাতের কেরামতি। মা কাঁচালঙ্কা দেয় না। টুপুরকে মা মোটেও ঝাল খাওয়া শেখায়নি । এবার মায়ের খুশি দেখে কে? গরমগরম চাউমিন তৈরী টুপুরের জন্য। মা তুমি শুনছ তো ? ওমা?
মা নড়ে ওঠেন। বলেন হু। বেশ তো চলছিল মাঝখানে থামলি কেন? ঘুম ভেঙে যাবে যে। টুপুর আবারো শুরু করে।
আমি সেই ছোটবেলাতেই জেনে গেছিলাম মা। তুমি আমাকে কুড়িয়ে এনে মানুষ করেছিলে। পাশের বাড়ির ঐ কাকিমাটা বলে দিয়েছিল একদিন । আমি তখন ক্লাস থ্রি তে পড়ি।
আমি নাকি জন্মের পরেই খোলা নর্দমার ধারে ন্যাকড়া জড়ানো অবস্থায় *পড়েছিলাম। তুমি নাকি মর্নিংওয়াকে যাবার সময় আমাকে দেখে কুড়িয়ে নিয়েছিলে। তারপর থেকে আমি তোমার টুপুর হলাম আর তুমি হলে আমার মা। স্কুলের পেরেন্ট মিটিং এ সবার বাবা যায় দেখে তোমায় কতদিন জিগ্যেস করেছি মা। আমার বাবা কে? বাবার নাম কি? তুমি সব লুকিয়েছ আমার কাছে। তুমি বলেছ মায়ের পরিচয়ই থাক। সবার কি আর বাবা থাকে?
আমি বিশ্বাস করেছি তোমাকে। ওমা শুনতে পাচ্ছ? আমার বাবা কে ছিল মা?
মায়ের ঘুম ভেঙে যায়। অদিতি বলে ওঠেন, সব শুনছি টুপুর। আমায় বিশ্বাস না করে তুমি কি করতে? তোমার বাবা কোথায় আমার তো জানা নেই মা। কেমন করে আমি তার খোঁজ দেব?
কেউ তো একজন ছিল মা। নয়ত আমি এলাম কি করে? তিনি কোথায় হারিয়ে গেলেন? আমার খুব জানতে ইচ্ছে করে যে।
অদিতি এবার বিছানা ছেড়ে ধড়মড়িয়ে উঠে বসে। তোমার পাশের বাড়ির কাকীমাকেই জিগেস কর বরং। তিনি যখন সব বলতে পারলেন বাকীটাও বলে দিন তবে।
টুপুর বলে ওঠে, সেকি মা? তিনি যা জানেন তুমি তা জানোনা?
সাধে পাড়ার লোকের সঙ্গে মিশিনা আমি। তারা ভালো করতে পারেনা, মন্দ করতে পারে।
এতে আর মন্দের কি হল মা? টুপুর বলে। তুই আমার পেটের মেয়ে নয় জেনে তোর কি লাভ হবে টুপুর? বরং তুই আমার থেকে দূরে সরে যাবি। পাড়ার লোক এটাই চায় রে।
কিন্তু তাই বলে সত্যিটা না জেনে আমি সারাজীবন এভাবেই কাটিয়ে যাব?
তোর অসুবিধে হচ্ছে এভাবে মায়ের মেয়ে হয়ে বেঁচে থাকতে? তুই আমাকে ভালোবাসিস না?
টুপুর মায়ের চোখ থেকে চোখ নামিয়ে নেয়।
তাহলে সত্যিটাই শুনে রাখ টুপুর। তুই আমার পেটেই হয়েছিলি। আর পাশের বাড়ির কাকীমার কথাও সত্যি। তোদের বাড়ির লোকজন মানে তোর বাবা, মা, ঠাকুমা সবাই আমাকে বাধ্য করেছিল। তাই তোকে জন্মের পরেই ওরা ফেলে এসেছিল। তোর ঐ কাকীমাই তোকে কুড়িয়ে নিয়ে পরে আমার কাছে দিয়ে আসে। আমি ডিভোর্সের পর কাকীমার দেখে দেওয়া এই ফ্ল্যাটেই তোকে নিয়ে এসে থাকতে শুরু করি।
একের পর এক তিন তিনটে মেয়ে হয়েছিল আমার। প্রথম দুটোকে ওরা শুরুতেই ফেলে দিতে বাধ্য করে। তখন আমার জেদ চেপে যায়। তবুও হারিনি আমি। তাই আজ আমার টুপুর এতবড় হয়েছে। আমি কখনো তার চাউমিনে কাঁচালঙ্কা দিই না।কারণ সেই অসভ্য লোকটা যাকে টুপুরের বাবা বলে ডাকার কথা সে ঝাল খেতে বড্ড ভালবাসত যে।