ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২৪)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম
ফুল পাথরের কাজ:-
এই ফুল পাথর হচ্ছে এক ধরনের নরম লাল রঙের পাথর। এই পাথরের উপর খোদাই করে সূক্ষ্ম কাজ করা যায়। ফুল পাথরের উপরে অলংকরণের কাজগুলো দেখলে টেরাকাটার কাজ বলেই মনে হয়। শিল্পীরা ফুলপাথরের টুকরোগুলোকে সারারাত জলে ভিজিয়ে রেখে পরদিন হাতুড়ি ও ছেনির সাহায্যে পাথরের উপর বিভিন্ন ধরনের শিল্প রচনা করেন। এই পাথরের মধ্যে দানা না থাকার জন্য এই ফুল পাথরের উপর কাজ পোড়ামাটির কাজের মতই হয়।
উত্তর-পশ্চিম বীরভূম ও ঝাড়খন্ড এলাকায় এই ফুল পাথরের মন্দির দেখা যায়। টেরাকোটার তুলনায় এর স্থায়িত্ব বেশি। তাছাড়া টেরাকোটার ফলকে তৈরি মূর্তিগুলির থেকে লাল ফুল পাথর খোদাই করে যে মূর্তি তৈরি হয় সেগুলো বেশি সূক্ষ্ম। টেরাকোটার মূর্তি অর্থাৎ পোড়া মাটির ফলকগুলি একটু স্থূল ধরনের হয়।
মন্দির সজ্জার জন্য এই ক্লোরাইট পাথরের ব্যবহার বাঁকুড়া ও হুগলি জেলার দু একটি স্থানে দেখা গেলেও বীরভূম জেলায় মন্দিরে এর ব্যবহার সবচেয়ে বেশি।
বীরভূম জেলার মধ্যে ফুল পাথরের অলংকরণ যুক্ত যে সমস্ত মন্দির দেখা যায় তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি সংখ্যার মন্দির আছে গণপুর ও মল্লারপুরে। এছাড়া চিনপাই লাভপুর ইলামবাজার তারাপীঠ ও সিউড়ি র সোনাতোড় পাড়া প্রভৃতি স্থানে এই জাতীয় অলংকরণ যুক্ত মন্দির আছে। সিউড়ির সোনাতোড় পাড়ার
দামোদর মন্দিরটি সবচেয়ে বেশি অলংকরণে সমৃদ্ধ।
রামপুরহাটের দক্ষিণ পশ্চিমে পশ্চিমবাংলার সীমান্তে অবস্থিত ঝাড়খন্ড রাজ্যের সাঁওতাল পরগনার অন্তর্গত মলুটি গ্রামে নানকর রাজাদের প্রতিষ্ঠিত প্রায় ৭০ টি ছোট-বড় বাংলা রীতির মন্দির এই ধরনের অলংকরণ সমৃদ্ধ। কথিত আছে, এই ছোট্ট গ্রামটিতে আগে ১০৮ টি
মন্দির ছিল। অনেকগুলি ধ্বংস হয়ে গেছে। এখন ৭০ টি মত মন্দির আছে। যেগুলোর মধ্যে অনেকগুলি কালের প্রভাবে ধ্বংসের পথে। লাল পাথর খোদাই করে অসাধারণ শিল্পকর্ম এখানের মন্দিরগুলোতে দেখা যায়। ঝাড়খন্ড সরকার এখন মন্দির গুলির মেরামতির কাজ শুরু করছে।
সিউড়ি শহরের সোনাতোড় পাড়ায় শতাব্দী প্রাচীন দামোদর মন্দিরটির গা থেকে খসে পড়েছে অনেক টালি। মন্দিরের কারু কাজের মধ্যে বৈষ্ণব প্রভাব স্পষ্ট। এখানেও মন্দিরের গায়ে রাধা কৃষ্ণের প্রেম, অনন্ত শয্যায় বিষ্ণু প্রভৃতি অলংকৃত হয়েছে
বীরভূম জেলার মহম্মদ বাজার ব্লকের অন্তর্গত গণপুর গ্রামের কালী তলায় অবস্থিত চৌদ্দটি চারচালা শিব মন্দির গুলি ১৭৭৬ থেকে ১৭৭৯ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ওই গ্রামের ধনী চৌধুরী পরিবার কর্তৃক নির্মিত হয়। কথিত আছে, ওই সময় বীরভূম জেলায় দারুন দুর্ভিক্ষ হয়। দরিদ্র গ্রামবাসীদের মন্দির নির্মাণে সহায়তার বিনিময়ে খাদ্যের ব্যবস্থা করে দেন ওই গ্রামের বিত্তশালী চৌধুরী পরিবার।
মন্দির গুলির সামনের দেওয়ালে ফুল পাথরের উপর অলংকরণ করা আছে।
লঙ্কা যুদ্ধ, সপরিবারে দেবী দুর্গা, ভগীরথের গঙ্গা আনয়ন, বৃষপৃষ্ঠে শিব, দশাবতার মূর্তি, গণেশ প্রভৃতি মন্দির গাত্রে উৎকীর্ণ আছে। ওই কালীতলা তেই লাল পাথরের কাজ করা একটি অসাধারণ দোল মঞ্চ আছে। গ্রামের বিভিন্ন জায়গায় আরো কতগুলি মন্দির আছে সেগুলির গায়েও লাল পাথরের সূক্ষ্ম কাজ করা আছে।
এই গনপুর থেকে কয়েক কিলোমিটার দূরে মল্লারপুরে আছে মল্লেশ্বর শিব মন্দির। প্রাচীর দিয়ে ঘেরা একটি বিশাল ক্ষেত্রের মধ্যে ২৪ টি মন্দির। প্রায় ৪০০ বছর আগে এই মন্দিররাজি প্রতিষ্ঠিত হয়।
মন্দির গুলির অধিকাংশ চারচালারীতির। মন্দির গুলির গায়ে অনেক ফুল পাথরের নকশা করা কাজ আছে। যদিও সেগুলোর উপরে সংস্কারের নামে লাল রংয়ের পোচ মারার জন্য সেগুলো সঠিকভাবে বোঝা যায় না ।
আগেই বলেছি, ফুল পাথরে খোদাই অলংকরণের মধ্যে যে সূক্ষ্মতা ও সজীবতা দেখা যায় পোড়ামাটির ভাস্কর্যে তা অনুপস্থিত। এদিক থেকে পরিমাণে অল্প ও একটি বিশেষ এলাকায় সীমাবদ্ধ হলেও ফুল পাথরের সাহায্যে এই মন্দির সজ্জা বাংলার সংস্কৃতির এক মূল্যবান সম্পদ সে বিষয়ে কোন সন্দেহ নেই।
চলবে