সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৬৯)

সীমানা ছাড়িয়ে

দাদা ও দিদি ঠিক বারোটার মধ্যে অমল কে সঙ্গে নিয়ে আমার বাড়িতে চলে এলেন ।তাদের দেখে আমার বুকের ছাতি চল্লিশ ইঞ্চি হয়ে গেলো মনে হচ্ছে।

ঠিক চারটের সময় মঙ্গল চন্ডীর উঠোনে গ্রামবাসীরা হাজির হয়ে গেলো । জয়ন্ত দা বলতে শুরু করলেন, আজ আমরা সবাই রাতে জেগে থাকব । কে বা কারা এই কুকর্ম করছে আমাদের জানা দরকার ।
একজন বলে উঠলেন, ভূতের সঙ্গে লড়াই করে কি পারা যাবে ।
দিদি বললেন, ভূত বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই । তারপর তিনি আরও কিছু কথা বললেন গ্রামবাসীদের সাহসী করার জন্য ।
আবার একজন বললেন, তাহলে আগুন জ্বলে উঠছে কেমন করে ।
দাদা বললেন, এসব কিছু বিজ্ঞান বিষয়ের ব্যাপার ।আগে ধরা হোক অপরাধী কে তারপর সব বোঝা যাবে ।

এখন রাত দশটা বাজে । গ্রামের সবাই জেগে আছে ।ঠিক রাত বারোটার সময় একটা দশ ফুটের লোক হেঁটে আসছে গ্রামের দিকে । দাদা থানায় ফোন করে দুজন বন্দুকধারী পুলিশ আনিয়েছেন ।সাধারণ লোকের বুদ্ধির সঙ্গে এখানে ই দাদার পার্থক্য । কখন যে সমস্ত ব্যাবস্থা করে রেখেছেন কেউ জানি না । ভূত কাছাকাছি আসা মাত্র পুলিশ দু রাউন্ড গুলি চালালো ফাঁকা আকাশে । গুলির আওয়াজ শোনা মাত্র ভূত টি ভয়ে মাটিতে পড়ে গেলো । সঙ্গে সঙ্গে গ্রামের সাহসী ছেলেরা বিকট চিৎকার করে ধরে ফেললো ভূত বাবাজিকে । বেচারা তখন জোড়া হাতে ক্ষমা চাইছে ।

তাকে বিচারের জন্য ফাঁকা জায়গায় আনা হলো ।সবাই বসে পড়লেন । এবার দাদা বলতে শুরু করলেন,দেখুন সবাই এই চোরটি রণ পা ব্যবহার করেছে লম্বা হওয়ার জন্য । রণ পা টি বাঁশের তৈরী নয় ।
একজন বললো,তাহলে ও ছোটো বড় কি করে হতো ।
দিদি বললেন, রণ পা টি বিশেষ ধরণের । এর মাঝে একটি শক্ত স্প্রিং আছে। যার ফলে এ যখন লাফ দি তো তখন এটি ছোটো বড়ো হতো ।
আর একজন বললো, তাহলে মুখ দিয়ে আগুন বেরোতো কি করে।
দিদি বললেন, এটা তো সহজ ব্যাপার । সার্কাসে আপনারা দেখে থাকবেন মুখের মধ্যে পেট্রোলিয়াম বা কেরোসিন জাতীয় দাহ্য পদার্থ ব্যবহার করে এরা মানুষকে অবাক করে দেন । এই চোরটিও তাই করেছে ।
দাদা এবার চোরটিকে ধমক দিয়ে বললেন,তুমি জঘন্য অপরাধ কেন করছো জবাব দাও ।

এবার চোরটি উঠে জোড় হাতে বললো,আমরা মাদক দ্রব্য চোরাপথে চালান করি । তাই ভূতের ভয় দেখিয়ে আমরা মানুষকে বাড়িতে ঢুকিয়ে রাখি ।এর ফলে আমাদের চোরা চালানে সুবিধা হয় ।
চোর ধরা পরলো। আর আমরা সমস্বরে আনন্দে বলে উঠলাম, চোর তুমি নিপাত যাও।

তারপর সকলেই সময়ের নিয়মে বড় হলাম। বিশু কলেজে ভরতি হয় নি। আমরা কলেজে ভরতি হলাম। বছরে একবার করে বেড়াতে যেতাম। আমরা চারবন্ধু গরমের ছুটিতে ঘুরতে যাব ঠিক করলাম।আমি, রাজু, শ্যামলী আর সোমা। চারজনই আমরা ইতিহাসের ছাত্র। এক কলেজে পড়ি। সোমা বলল, সাঁচি স্তুপ দেখে আসি চল। শ্যামলী বলল, মধ্যপ্রদেশের রাজধানী শহর ভূপাল থেকে ৪৬ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত সাঁচির বিদিশাগিরিতেঅবস্থিত বৌদ্ধ স্তূপ। সম্রাট অশোক এই স্তূপ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। রাজু বলল, হ্যাঁ ইতিহাসে পাওয়া যায় এইসব কাহিনী। অশোককের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার পরও কলিঙ্গবাসী পরাজিত হয়। এই যুদ্ধে প্রায় এক লক্ষ নরনারী প্রাণ হারায় এবং প্রায় দেড়লক্ষ নরনারী বন্দী হয়। এই যুদ্ধের এই বীভৎসতা সম্রাট অশোক কে বিষাদগ্রস্ত করে তোলে। পরে তিনি যুদ্ধের পথত্যাগ অহিংসার পথে সাম্রাজ্য পরিচালনার নীতি গ্রহণ করেন। এরপর তিনি ক্রমে ক্রমে বৌদ্ধ ধর্মের প্রতি বিশেষভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন এবং উপগুপ্ত নামক এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীর কাছে দীক্ষা নিয়ে বৌদ্ধধর্ম গ্রহণ করেন। তিনি তাঁর গুরু উপগুপ্তকে সাথে নিয়ে কপিলাবস্তু, লুম্বিনী, কুশীনগর, বুদ্ধগয়া-সহ নানা স্থানে ভ্রমণ করেন এবং বৌদ্ধ ধর্মের প্রচার করেন। এই সময় তিনি নানা স্থানে স্তূপ, স্তম্ভ এবং পাহাড়ের গায়ে বুদ্ধের বাণী লিপিবদ্ধ করে রাখার ব্যবস্থা করেন। এই সূত্রে তিনি বর্তমান সাঁচি থেকে দশ কি.মি দুরে বিদিশাগিরি নামক পাহাড়ে একটি বৌদ্ধ স্তূপ তৈরি করেছিলেন। আমি জানি, সম্রাট অশোকের তৈরি মূল স্তূপটির ব্যাস প্রায় ৩৬.৬ মিটার ও উচ্চতা প্রায় ১৬.৫ মিটার। কথিত আছে অশোকের কন্যা সঙ্ঘমিত্রা ও পুত্র মহেন্দ্র শ্রীলঙ্কায় বৌদ্ধধর্ম প্রচারে যাওয়ার আগে, সাঁচিতে এই স্তূপ পরিদর্শন করেছিলেন।
বিদিশাগিরির শীর্ষে রয়েছে সম্রাট অশোকের তৈরি মহাস্তূপ। একে এক নম্বর স্তূপ বলা হয়। মনে করা হয় এই এক নম্বর স্তূপের মধ্যে বুদ্ধদেবের ভস্ম আছে। উল্লেখ্য সম্রাট অশোক যে স্তূপ গড়েছিলেন তা এখনকার স্তূপের নিচে চাপা পড়ে গেছে। একশ বছর পরে সেই স্তূপের উপর আরো বড় স্তূপ তৈরি হয়। তা ঘিরে তৈরি হয়েছিল পাথরের অলিন্দ। কালক্রমে সে অলিন্দের পাথর অনেকটা ক্ষয়ে গিয়েছিল। এই কারণে পরে স্তূপের পাশে গোল বারান্দার মতন প্রদক্ষিণ পথ তৈরি হয়। এরও প্রায় একশ বছর পর স্তূপের চারদিকে চারটি তোরণ নির্মাণ হয়। এক নম্বর স্তূপের উত্তরমুখী তোরণ এখনও অক্ষত। এতে আছে কাঠ বা হাতির দাঁতের সূক্ষ্ম কারু কাজ। তোরণের স্তম্ভ ও ফলকে বৌদ্ধ জাতকের গল্প খোদাই করা আছে। বুদ্ধের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কিছু দৃশ্য এখানে দেখা যায়। তবে তোরণ বা স্তম্ভে বুদ্ধের কোন মূর্তি নেই। কখনও গাছ, কখনও ধর্মচক্র, কখনও পদচিহ্ন-এসব প্রতীক দিয়ে বুদ্ধের উপস্থিতি বোঝান হয়েছে। এর কারণ সম্ভবত এই যে সে সময় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের ভিতর বুদ্ধমূর্তি পূজোর নিয়ম ছিল না।
আমরা হাওড়া এসে ট্রেনে চাপলাম। তারপর যখন ভূপাল এলাম তখন রাত্রি। আগে থেকে হলিডে হোম বুক করা ছিল। এখান থেকেই আমরা সাইড সিন ঘুরে কভার করব। প্রয়োজনে ফিরে আসব এখানেই। রাজু বলল, এখান থেকে মাত্র ছেচল্লিশ কিলোমিটার দূরে বিদিশাগিরি। সেখানে ভগবান বুদ্ধের স্মৃতি বিজড়িত বৌদ্ধ স্তূপ সাঁচিতে অবস্থিত। মালপত্তর রেখে রেডিমেড খাবার খেয়ে আমরা বিশ্রাম নিলাম। আমি আসলে সোমার প্রেমে আবদ্ধ আর রাজু, শ্যামলীর প্রেমে হাবুডুবু খায়। পড়াশুনা শেষ হলে চাকরি পেয়ে বা ব্যবসা করে আমরা বিবাহসূত্রে আবদ্ধ হব একথা আমাদের দুই পরিবারই জানে। আমরা শুয়ে পড়লাম রাত একটার সময়।

তারপর সকালে উঠে বাস আসার অপেক্ষা। বাস আমাদের নিয়ে গেল আজ সাঁচী।
আমাদের গাইড বলছেন, বাবু ইতিহাসের কথা একটু মন দিয়ে শুনে লিবেন। তাহলে মজা পাবেন। সোমা বলল, লোকটা তো ভালো বাংলা বলে। আমি বললাম, হ্যাঁ।গাইড বলতে শুরু করলেন, মৌর্য বংশের অবসানের পর, ব্রাহ্মণরা বেশ কয়েকবার সাঁচির স্তূপ আক্রমণ করে ব্যাপক ধ্বংসাত্মক কার্যক্রম চালায়। এই সময় অশোকের স্তূপ ছাড়াও সাঁচির সমস্ত সৌধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও স্থানীয় গৃহী বৌদ্ধরা নতুন উদ্যমে কিছুটা মেরামত শুরু করেন। কিন্তু তৎকালীন রাজনৈতিক এবং সাম্প্রদায়িক ধাক্কা সাঁচির উপরেও পরে। ফলে নতুন উদ্যমে মঠ স্তম্ভ নির্মাণের কাজেও ভাঁটা পড়ে। এবং শেষে একেবারে থেমে যায়। গুপ্তযুগে দেশে কিছু শান্তি ও সমৃদ্ধি এলে সাঁচিতে কারুশিল্প ও স্থাপত্যের কাজ নতুন ভাবে শুরু হয়। এ সময়ই মূর্তির দেখা মেলে। এসময়ে সতেরো নম্বর মন্দিরটি নির্মিত হয়। এভাবে দুশো বছর কাজ চলতে থাকে। তারপর হুনেরা ভারত আক্রমণ করে। গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। ফলে এই স্তূপের নিয়মিত সংস্কার বন্ধ হয়ে যায়।৬০৬ খ্রিষ্টাব্দে রাজা হর্ষবর্ধনের শাসনকালে বৌদ্ধধর্ম বিস্তার লাভ করে। এই সময় সাঁচিতে বেশ কিছু মঠ ও মন্দির বানানো হয়। এই ধারা প্রায় ১২০০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। এরপর হিন্দু আধিপত্যের কারণে সাঁচিতে বৌদ্ধ-ধর্মাবলম্বীরা কোণঠাসা হয়ে পড়ে। ক্রমে স্তূপে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ফলক স্থাপিত হতে থাকে। একসময় সাঁচি বৌদ্ধশূন্য এলাকায় পরিণত হয়। উনবিংশ শতাব্দীর দিকে সাঁচির বৌদ্ধ অধ্যুষিত এলাকা একটি পরিত্যাক্ত এলাকায় পরিণত হয়। কালক্রমে স্তূপটি লোকচক্ষুর অন্তরালে চলে যায়।১৮১৮ খ্রিষ্টাব্দে ব্রিটিশ জেনারেল টেলার সাঁচির ধ্বংসস্তূপ আবিষ্কার করেন। এই সময় গুপ্তধনের আশায় লোকজন শেষবারের মতো স্তূপটির ক্ষতি করে। ১৮২২ খ্রিষ্টাব্দে ক্যাপটেন জনসন এক নম্বর স্তূপটি উপর থেকে নিচ পর্যন্ত কেটে ফেলে। ফলে স্তূপের গায়ে প্রকাণ্ড ফাটলের সৃষ্টি হয় এবং পশ্চিমের তোরণ ভেঙ্গে পড়ে। একইভাবে দু নম্বর স্তূপও ধ্বংস হয়। ১৮৫১ খ্রিষ্টাব্দে আবার দুই ও তিন নম্বর স্তূপ খোঁড়া হয়। এক নম্বর স্তূপের মধ্যে রত্নরাজির সন্ধানে লোহার রড ঢুকিয়ে পরীক্ষা করা হয়। এই সময় স্থানীয় এক হিন্দু জমিদার অশোক স্তম্ভটি তিন টুকরো করে বাড়ি নিয়ে যান।১৮৮১ খ্রিষ্টাব্দের পরে স্তূপটি সংরক্ষণের চেষ্টা করেন মেজর কোল। পরের তিন বছর তিনি এই উদ্যম সচল রাখেন। এর বেশ পরে পরে ভারতের আর্কিওলজিকাল সার্ভের ডিরেক্টর এ কাজে এগিয়ে আসেন। মেজর কোল বিদিশাগিরির জঙ্গল কেটে গোটা পাহাড় পরিষ্কার করান। এক নম্বর স্তূপের ফাটল মেরামত করেন। পশ্চিম ও দক্ষিণদিকের তোরণগুলি তুলে যথাস্থানে স্থাপন করেন। এরপর বাকি কাজ করেন স্যার জন মার্শাল। ১৯১২ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ১৯১৯ খ্রিষ্টাব্দের ভিতরে এই স্তূপের যে সংস্কার করা হয়, বর্তমানে তাই পুরাকীর্তি হিসেবে গণ্য করা হয়।

আমরা বাসের সকলে হোটেলে খাওয়াদাওয়া সেরে নিলাম। এখানে দেওয়ালের কারুকাজ দেখলেই সমগ্র ইতিহাস দেখা যায় চোখে। সোমা বলল মহামতি জীবকের কথা দেওয়ালে খচিত আছে।আমরা পড়েছি, জীবক অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন তক্ষশীলা বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসা শাস্ত্র এবং ভেষজ বিজ্ঞান অধ্যায় পর চিকিৎসক হিসেবে বিম্বিসারের সভায় যোগদান করেন এবং ভগবান বুদ্ধের শিষ্য গ্রহণ করেন। কিন্তু অজাতশত্রু রাজা হওয়ার পরে বৌদ্ধবিদ্বেষী হয়ে ওঠেন।
রাজু পুরোনো অট্টালিকায় দাঁড়িয়ে বলল, আমি অজাতশত্রুর অভিনয় করছি আর তুই হয়ে যা মহামতি জীবক। আমি বললাম, তাই হোক। তারপর আমি বললাম, আজ রাজসভায় অজাতশত্রু কথা বলছেন, রাজু শুরু করল অভিনয়। সেনাপতি সোমা আর রাজপুরোহিত শ্যামলী। সবাই এক্সপার্ট। কলেজের সোশালে ওরা নাটকে অভিনয় করে।

– শোন হে পারিষদ বর্গ। আমার রাজ্যে বৌদ্ধগান বন্ধ করতে হবে। সেনাপতি কোথায়?

– আজ্ঞে আমি, হাজির। আদেশ করুন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।