সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ১২)

কেল্লা নিজামতের পথে

মুর্শিদাবাদ ঘোরার জন্য এক দুই দিন যথেষ্ট নয়। পুরনো দিনের ভাঙাচোরা নির্মাণগুলো ছুঁয়ে দেখতেও ৫-৬ দিন কম পড়ে যায়। ধরুন, একটা টাঙা গাড়ি ভাড়া করে ঘুরতে বেড়িয়েছেন নবাবী মুর্শিদাবাদ। চলতে চলতে দেখলেন, একটা পুরনো নবাবী দরজার নিচ দিয়ে এগিয়ে গেলেন হাজারদুয়ারীর দিকে। ওপরে নহবত বসার জায়গা, নিচে নবাবী তোরণ। নির্বিঘ্নে পেরিয়ে যাওয়াই যেত সেই দরজাখানা। আশপাশ ফিরে তাকায়ইবা ক’জন। কিন্তু একটু ফিরে তাকালেই বোঝা যায় তাঁর প্রাচীনত্ব। তখনকার নবাবী মুর্শিদাবাদে প্রবেশ করার জন্য ছিল বেশ কয়েকটি দরজা। তারই অন্যতম ত্রিপলিয়া দরজা। কেল্লা নিজামতে প্রবেশের এটি একটি প্রধান তোরণ। নবাবী মুর্শিদাবাদে প্রবেশপথে এই দরজার উপরে বসত নহবত। আর পেরোলেই কেল্লার পথে প্রবেশ। তখন গমগম করত চেহেল সেতুন প্রাসাদ। সবেমাত্র দেহ রেখেছেন মুর্শিদকুলী খান। সুজাউদ্দৌলা মসনদে বসবার পর ঢেলে সাজাতে চেয়েছিলেন মুর্শিদাবাদকে, তৈরি করেছিলেন কেল্লা নিজামতে প্রবেশপথে বেশ কতগুলি দরজা। আজ ত্রিপলিয়া গেট পেরিয়ে গেলে শুধুমাত্র শহরতলী মুর্শিদাবাদ। কিন্তু সেদিনের চেহেল সেতুনে চিত্রটা ছিল একেবারে অন্যরকম। চেহেল সেতুন ভাগীরথীর পূর্ব পাড়ে এক অতুলনীয় প্রাসাদ। ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদ (তখন সুখসুদাবাদ) আসবার পর নিজের নিজামতি পরিচালনার জন্য মুর্শিদকুলী এই প্রাসাদ তৈরি করান। সেইসব অতুল ঐশ্বর্য যথাযথভাবে রক্ষা করা ও নব্য নির্মাণ সুজাউদ্দৌলার প্রধান কার্যপ্রণালীর একটি। তিনি বিলাসী ছিলেন। কিন্তু রাজ্যরক্ষায় তাঁর মতো যথাযথ নবাব বাংলা খুব কমই পেয়েছিল। আজও তাঁর স্মৃতি বুকে নিয়ে ত্রিপোলিয়া গেট দাঁড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের রাজপথে। নিচ দিয়ে পেরিয়ে চলেছে অসংখ্য মানুষ, গাড়ি-ঘোড়া। কিন্তু ক’জনের হুঁশ আছে একবার এই দরজার নিচে দাঁড়িয়ে নবাব সুজার স্থাপত্যটুকু খুঁজে দেখবার? আচ্ছা, কখনো ভেবে দেখেছেন এই দরজার উচ্চতা এত বেশি কেন? যা একটি মানুষ হেঁটে যাওয়ার থেকে অনেকটাই বেশি। আসলে এর কারণ হলো নবাবী হাতি। তখন হাতির পিঠে করে চলাফেরাই নিয়ম ছিল নবাব ও আমির ওমরাদের। তাই নগরে ঢোকবার মুল তোরণ ঠিক সেই উচ্চতাতেই বানানো হতো যেখান দিয়ে একটি হাতি নির্বিঘ্নে প্রবেশ করতে পারে তার প্রভুকে পিঠে বসিয়ে। পুরনোকে হয়তো নতুনের সঙ্গে কখনোই মেলানো যায় না, কিন্তু পুরনো থেকে যায় পুরনোর আদলেই। শুধুমাত্র তাকে চিন্তাভাবনার স্তরে নিয়ে এলে পুরনোদিনগুলোকে ফিরে পাওয়া যায় খুব সহজে। তাই আজকের মানুষ হেঁটে যাওয়া ত্রিপোলিয়া গেট আর সেদিনের হাতির প্রবেশদ্বার ত্রিপোলিয়াগেট সময়কালের অনুপাতে এক না হলেও এখনো ইতিহাসটুকু টিকিয়ে রাখা সমান প্রাসঙ্গিক। ঠিক যেরকম বড় দরজাটি দেখা যায় গঙ্গার পশ্চিম পাড়ে খোশবাগের সামনে। সমস্ত প্রাসাদ বা নিজামত বা সমাধিস্থলের মুখ্যতোরণ এমন উঁচু করাই দস্তুর ছিল। এমনকি এগুলি সবই মুঘল স্থাপত্যের অনুকরণ। প্রথমদিকে বাংলার নবাবরা ছিলেন মুঘলদেরই সিভিল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর। তাই সেই সময়কালটা ঠিক দিল্লির মতো করে ধরা রয়েছে মুর্শিদাবাদের মাটিতেও। শুধু পার্থক্যটুকু হল দিল্লি আগ্রা আজও ইতিহাসকে টিকিয়ে রেখেছে স্বমহিমায়, আর সেখানে অবহেলায় আর অযত্নে মুর্শিদাবাদ হারিয়ে ফেলেছে তার অস্তিত্বটুকু।
আজকের ত্রিপোলিয়া গেটের অদূরেই ছিল তখনকার চেহেল সেতুন। অর্থাৎ মুর্শিদকুলীর রাজবাড়ি। মুর্শিদাবাদের নবাবরা প্রায় প্রত্যেকেই নিজের নিজের রাজবাড়ি বানিয়েছিলেন। ঠিক যেমন সিরাজের হীরাঝিল। আসলে মুর্শিদাবাদ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের আঁতুড়ঘর। তাই কেউই তাঁর আগেরজনের অস্তিত্বটুকু স্বীকার করতে বা ধরে রাখতে চাননি। শুধু নবাব সুজা সুন্দরভাবে টিকিয়ে রেখেছিলেন মুর্শিদকুলীর মুর্শিদাবাদকেই। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, যেন খুব সচেতন ভাবে নষ্ট করা হয়েছে সমস্ত প্রাসাদগুলো। কিছু মসজিদ বা ধর্মস্থান টিকে থাকলেও রাজবাড়িগুলো একেবারেই নেই। বিষয়টা সত্যিই ভাবায়। এমন কী স্বার্থ ছিল যেখানে সবকটি প্রাসাদই ধ্বংস হয়ে গেল কালের গ্রাসে। চেহেল সেতুন নেই, হীরাঝিল নেই, জাফরাগঞ্জে মীরজাফরের প্রাসাদও নেই, এমন কি নেই নওয়াজেশ মহম্মদ ও ঘঁষেটি বেগমের মতিঝিলও। কিন্তু হাত পড়েনি মসজিদগুলোয়। সে ক্ষেত্রে আজও টিকে আছে মুন্নি বেগমের চক মসজিদ, সরফরাজের ফৌতি মসজিসের মত ছোট ছোট ধর্মস্থানগুলোও। এমনকি এতোটুকু ক্ষতি হয়নি মীরজাফরের কবর, আলিবর্দী বা সিরাজউদ্দৌলার কবর অথবা সুজাউদ্দৌলা বা সরফরাজের কবরও। এবার বাকিটা তোলা থাক আপনাদের চিন্তার ওপর। কী ঘটেছিল নবাবী মুর্শিদাবাদে? কিসের স্বার্থসিদ্ধিতে নিজের মতো করে নিশ্চিহ্ন করা হয়েছিল সবকটি নবাববাড়ি? অথচ আজও একইভাবে টিকে আছে নশিপুর রাজবাড়ি। রাজা দেবী সিংয়ের স্মৃতি বুকে নিয়ে অটুট রয়েছে এই স্থাপত্য। কিন্তু টিকে নেই একটিও নবাবের বাসভবন। আজ চকবাজারে দাঁড়ালে বিশ্বাস করতেই কষ্ট হয় যে এখানে একসময় মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ছিল চেহেল সেতুনের মত বিশাল প্রাসাদ। জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ বা লোকমুখে নাম দেওয়া নেমকহারাম দেউড়ির ভগ্নাবশেষ দেখলে এক হাজার বছর আগের স্থাপত্য বলে ভুল করাটাও অস্বাভাবিক নয়। অথচ এই প্রাসাদেই লেগে আছে সিরাজের শেষ রক্তের দাগটুকু। শুধু পাতলা বাংলা ইটগুলো চিনিয়ে দেয় মাত্র ২৭০ বছর আগের নবাবী স্থাপত্যের ধরন।
একা একা ঘুরে দেখছি মুর্শিদাবাদ। আসলে একা ঘুরতেই চেয়েছি। মুর্শিদাবাদের নবাবীয়ানাটুকু ছুঁয়ে দেখা বা অনুভব করা খুব জরুরি হয়ে পড়েছিল। বাংলার ইতিহাসে একটা প্রধান সময় জড়িয়ে আছে এই নগরীর সাথে। অথচ কম অত্যাচার হয়নি এর উপর। আর তাঁরই ফলে এককালের প্রাসাদ নগরী আজ এক নিছক অন্ধকার শহরতলী। এই স্বার্থসিদ্ধির পেছনে আসলে কতটা ইংরেজ স্বার্থ জড়িয়ে ছিল আর কতটাই বা নবাবী স্বার্থ তা খুঁজে দেখতে গেলে রাতের পর রাত কাবার হয়ে যায়। কিন্তু উত্তর মেলে না ঠিকভাবে। আজ হীরাঝিল এক বাঁশ বাগান, মতিঝিল হয়ে গেছে পার্ক, চেহেল সেতুনের জায়গায় বাসস্ট্যান্ড, আর জাফরাগঞ্জ প্রাসাদ রাস্তার ধারে পড়ে থাকা ভাঙাচোরা কিছু ইট। এইসবই এদের বর্তমান রূপ। একটা অন্ধকার নেমেছে এবং তা তীব্রভাবেই ঘিরে নিয়েছে শহরটাকে। আজও যেন সেই চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়ে হাঁপিয়ে পড়ে গোটা নগরীটাই। ঠিক একটা জীবন্ত জীবাশ্মের মত।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।