গল্পতে অমিত গোস্বামী

বৃহন্নলা

-চাঁদু,চাঁদু, বাড়ি আছিস?
চাঁছা বেড়ার ফাঁক দিয়ে চাঁদু দেখল আরিফ দরজার সামনে বিরক্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সকাল সকাল চাঁদুর মেজাজটা খিঁচড়ে গেল। আরিফ আবার ডাকল
– চাঁদু, এই শালা চাঁদু, মরে গেলি না কি?
আরিফ হিজড়ের দালাল। বিয়েতে বা বাচ্চা হলে হিজড়ে নাচানোর যে চল আছে গ্রাম বাংলায়, আরিফ তার বরাত ধরে। পুরুষালি মেয়ে বা মেয়েলি পুরুষদের ট্রেণিং দিয়ে নামিয়ে দেয় আসরে। পয়দা মন্দ হয় না। কিন্তু চাঁদুর এখন আর এই কাজ করতে ভাল লাগে না। করা ছেড়ে দিয়েছে।
-চাঁদু, শালা চুতমারানি, মটকা দিয়ে পড়ে আছিস? দরজা ভাঙবো?
চমকে উঠে চাঁদু ব্যাজারমুখে দরজা খুলে বলল
-কি হয়েছে? এত ষাঁড়ের মত চেল্লাছিস কেন?
আরিফ ঘরে ঢুকে তক্তাপোষের এক কোণে বসে জুত করে একটা বিড়ি ধরাল। ভাল করে ঘরের চারিদিক চোখ দিয়ে জরিপ করে বলল
-দেখে তো তোর হাঁড়ির হাল বুঝতে পারছি। আয়পয় তো ঢুঁ ঢুঁ। ময়দানে আবার না নামলে খাবি কি?
-সে কথা তোকে ভাবতে হবে না। তোকে তো বলেছি আমি আর হিজড়েগিরি করব না। না খেতে পেলেও না।
-সে জন্যে তো তোকে ডাকি না। প্রায় এক বছর হয়ে গেল। আমার কী? এ লাইনে মাল কম আছে নাকি? শালা, সবাই আমার পিছনে ঘুরঘুর করে কাজের মতলবে। তোকে ফালতু তেলিয়ে লাভ কী? নেহাত ফেঁসে গেছি, তাই এলাম।
-আমার জন্যে আবার কোথায় ফাঁসলি?
-সেই যে পটাশপুরের জমিদারের কাছে। মনে নেই? যার বিয়েতে নেচে দুহাজার টাকা বকশিশ পেলি। আমায় দিলি ঢুঁ ঢুঁ। তারপর থেকে কাজই ছেড়ে দিলি।
-হ্যাঁ,হ্যাঁ,মনে আছে। কিন্তু সে তো কবেই চুকেবুকে গেছে। এখন আবার নতুন করে কী হল?
-আরে, সেই শালা জমিদারের ছেলে হয়েছে। আঁতুড় ছাড়ানোর দিন হিজড়ে নাচানোর বায়না হয়েছে। গিন্নিমা’র ইচ্ছে চন্দ্রাণী মানে তোকে যেন নিয়ে যাই। চল, চল, ভাল পয়সা খিঁচে নিবি। এমনি তো দু’হাজার দেবে বলেছে।
চাঁদু চুপ করে গেল। মাথা কেমন ফাঁকা হয়ে উঠল। ধোঁয়া ধোঁয়া মনে হচ্ছে চারিদিক। সে শুন্যদৃষ্টিতে আরিফের দিকে তাকাল। আরিফ বলল
-কী রে শালা, যাবি তো? ওদের বলে দেই তবে?
-হ্যাঁ, যাবো। তুই বলে দে।
চাঁদু যখন হিজড়ে সাজে তখন ওর নাম পালটে যায়। তখন ও হয় চন্দ্রাণী। ফিনফিনে সিনথেটিক শাড়ির মধ্যে দেখা যায় সার্টিনের শায়া, লাল স্লিভলেসের সাথে কালো ব্রা। বাইরে থেকে যাতে পরিস্কার বোঝা যায়। পাউডার ঘষা কামানো মুখে কালো পেন্সিলে ভ্রু গাঢ় করে গালে অল্প রুজ মেখে নেয় সে। আরিফ এ লাইনে টানার সময় বলে দিয়েছিল – দুপুরবেলায় আলুসেদ্ধ দিয়ে পান্তা খাবি আর মুখ ভিজে কাপড়ে জড়িয়ে দু ঘন্টা ঘুমোবি, তারপরে নতুন ব্লেড দিয়ে দাড়ি কামালে দেখবি মুখ দিয়ে সেক্স টুপটুপিয়ে চুঁইয়ে পড়ছে। চাঁদু এসব মেনে চলে। বস্তির ঘরে ও ধীরে ধীরে সব সাজার জিনিষ কিনে নিয়েছে। প্রথম প্রথম খুব অস্বস্তি হত। অনভ্যস্ত জায়গায় ব্রা’র স্ট্র্যাপ, বুক তৈরির তুলো স্পঞ্জে লোম আটকে সে কী যন্ত্রণা, পরচুলার বেণীর খোঁচায় ঘাড় জুড়ে সে কী কুটকুটুনি। ঠোঁটে লিপস্টিক বা ঠোঁটে পাউডার ঘষলে চড়চড়ে শুকনো লাগত। পায়ের গোছে শাড়ি জড়িয়ে যেত। এখন আর ওসব হয় না। সয়ে গেছে।
স্টেশনের পাশের বস্তিতে একঘরের আস্তানা চাঁদুর। বুকে জল জমে মা মরে যেতেই চাঁদু একা হয়ে গেছে। বাপ যে তার কে তার হদিস সে কখনও পায় নি। মা একটা নাম বলত বটে, তবে চাঁদু বুঝে গেছিল হয় তার বাপ ফুটে গেছিল নয়ত কোনো ফোটা বাপের ক্রিয়াকর্মে তার জন্ম। মা মরতেই পেটে টান পড়ল চাঁদুর। খাবে কী? এইদিন নাহয় মা’র বাবুর বাড়িতে সকালের কাজ আর বিকেলেবেলায় তেলেভাজা বিক্রির পয়সায় পেটের ভাত জুটে যেত। চাঁদুর দিন কাটত হ্যা হ্যা করে, বিসর্জনের পার্টিতে, বস্তির উৎসবে ছেলানিপনায়। ফেরতা বুক নাচিয়ে জমিয়ে দিত ফুর্তি। লোকে পাঁচ দশ টাকার নোট বুকে লটকে দিত। চলে যেত চাঁদুর। এর মধ্যে মা ফুটলবা। অথৈ জলে পড়ল সে। এসময় একদিন আরিফ এসে তাকে প্রস্তাব দিল
-তোর যা খমা গুরু, তুই হিজড়ে বলে যা।
– মানে? ধোন কেটে হিজড়ে হবো? পাগল না কি?
-আব্বে গাণ্ডু, ওসব কিচ্ছু করতে হবে না। বুকে স্পঞ্জ, গায়ে শাড়ি পরে গাঁড় দোলাতে হবে, ভিত্তার নাচতে হবে, ঢং করতে হবে। ব্যস। পয়সা পাবি। বিন্দাস থাকবি।
-কিন্তু আমি তো সত্যিকারের হিজড়ে নই। সত্যিকারের হিজড়েরা টের পেলে তো আমার স্যাটা ভেঙে দেবে।
-ওদের সাথে তোর কী? তুই কি হাসপাতাল থেকে ঠিকানা এনে বাড়ি বাড়ি যাবি? না কি ট্রেনে ভিক্ষা করবি? তুই গাঁয়ের বিয়েতে, বিসর্জনে, উৎসবে নাচবি। বায়না আমি তুলব।
প্রস্তাবটা মন্দ লাগেনি চাঁদুর। পেট চালাতে গেলে যে কাজ করতে হবে সেটা সে জানে। এই কাজটা ওর মনের মত হয়েছিল। খাটনি কম। ঢ্যামনামি বেশি। কাজটা করতে করতে সে বুঝেছিল যে মানুষের সেক্স অতি বিচিত্র বস্তু। এ ব্যাপারে পয়সা ঢালতে কার্পণ্য নেই কারো। কেউ কেউ গায়ে ঢেলে পড়ে মুখে উম উম শব্দ করেই দেয় দশ টাকা। কেউ কেউ আবার বুক ছুঁতে চায় হিজড়ের বুক ফলস জেনেও। কেউ কেউ আরো সরেস, পায়ূমৈথুনের প্রস্তাব দেয়। সামলে নিতে হয় চাঁদুকে। সামলে নিতে সে শিখেছে।
গতবার পটাশপুর যাওয়ার বরাত হঠাৎই এসেছিল। ডেকেছিলেন পটাশপুরের জমিদার। জমিদারি এখন নেই, তবে বিস্তর জমিজমা। পঞ্চায়েতের প্রধান। তার সেটা ছিল তৃতীয় বিয়ে। বড় বৌ বাঁজা ছিল, মরে গেছে। দ্বিতীয় বউ তাকে খোজা বলায় বিস্তর রাগ করে জমিদারবাবু ঠিক করলেন যে আবার বিয়ে করবেন। তার সন্তান চাই। এত সম্পত্তি খাবে কে? আত্মজ ছাড়া। দ্বিতীয় বৌ অর্থাৎ গিন্নিমা তার এক দূরসম্পর্কিত বোনের সাথে বিয়ে ঠিক করেছেন। বিয়েতে হিজড়ে নাচ সন্তানলাভের সহায়ক বলেই গ্রাম বাংলার বিশ্বাস। তাই এই ডাক। অতএব চলো পটাশপুর।
বিকেল পাঁচটার আগেই পটাশপুরের ধুলোওড়া কাঁচা রাস্তা পেরিয়ে তারা যখন জমিদারবাড়ি পৌঁছল তখন অন্ধকার নামার তোড়জোড় শুরু হয়ে গিয়েছে। চারপাশের নিঝুম পরিবেশের মধ্যে এ বাড়ির আলো ও হৈ চৈ দেখে বোঝা যায় যে এ বাড়িতে কিছু একটা ব্যাপার আছে। আশেপাশের মধ্যে এই বাড়িটাই পাকা। বাকি চারিদিকে মাটির ঘর। এদিকে ওদিকে গাছপালা। সদ্য টানা ইলেকট্রিকের আলোয় চাঁদু দেখল একটি বড় ঘরে এর মধ্যেই মজলিশ বসে গেছে । ধোঁয়ায় আবছা। বিলিতি মদের খালি বোতল গড়াচ্ছে। জমিদারবাবু তার স্যাঙাতদের নিয়ে বেশ টপ ভুজঙ্গ। আরিফ হাঁক দিল
-কই গো রসিক, একবার মুখ তুলে দেখো কী মাল নিয়ে এসেছি।
– অ্যাঁ, আরিফ নাকি? এসে পড়েছ তাহলে! দেরি দেখে আমি ভাবলাম লগ্নটা না পার করে দাও।
চাঁদু দেখল ছাল ওঠা কাঁসার থালার মত হুমদো একটা মুখ, ঘাড়ে গর্দানে এক। দু চোখ বেশ তীব্র ও রক্তিম। মাথায় চুল উঠে চাঁদি যেন আধা চাঁদ। কোচানো ধুতির ওপরে সিল্কের পাঞ্জাবি। পরমুহুর্তে তার গলার ঝাঁঝ ছিটকে উঠল ঘরের দিকে কারো উদ্দেশে
-আরে, তোদের এত সাজের কী আছে! গরীবের মেয়ে উদ্ধার করতে যাচ্ছি, তার আবার সাজিগুজির ন্যাকড়া। বলি, দেখবেটা কে? তাড়াতাড়ি কর। তেনারাও তো এসে গেছেন।
জমিদারবাবুর এবার চোখ পড়ল চাঁদুর ওপরে। ডানহাত দিয়ে চাঁদুর থুতনি তুলে দেখে খপ করে বুকটা হাতের মুঠোয় ভরে চাপ দিল। চাঁদু চমকে উঠে বলল
-এ কী। ছিঁড়ে যাবে যে।
জমিদার হ্যা হ্যা করে হেসে বললেন
-না, না, দেখে নিলাম,আরিফ আবার কোন মাগীকে হিজড়ে সাজিয়ে এনেছে কি না! যা ভেজালের যুগ পড়েছে। কিন্তু তুমি তো খাঁটি বৃহন্নলা হে। যাও, বসো, চা খাও, জল খাও, আর দেখো, তোমার নাচটা যেন পুরো ঝুমকো হয়।
শাঁখের শব্দ ও উলুধ্বনির সাথে বরের যাত্রা শুরু হল। দুগগা, দুগগা – বলে যাত্রা করালেন গিন্নীমা। এক বৃদ্ধা উপাচার দিয়ে মঙ্গলাচারন করলেন। চাঁদুর বেশ মজা লাগছিল। বৌ স্বামীকে আবার বিয়ে করার অনুমতি দিয়ে আচার অনুষ্ঠান করছে এমন কথা সে বাপের জন্মে শোনেনি। এদের বিয়ে করেই রাতে ফেরা। শ্বশুর বাড়িতে রাত্রিযাপন এদের রীতিবিরুদ্ধ। শোভাযাত্রার একেবারে সামনে কিছু লোক চলেছে, মাথায় হ্যাজাক, তার পিছনে বিভিন্ন রঙের সেপাইয়ের মত পোশাক পরে কিছু লোক ড্রাম বাজাচ্ছে – ভেঁপু ভেঁপু ড্র্যামা ড্র্যামা করে। এদের পিছনে তাসা পার্টি। কুরকুরিতে বোল তুলেছে একটা প্যাঁকাটি ছোঁড়া। তার সাথে নাচছে চাঁদু, থুড়ি সে এখন চন্দ্রাণী। তাকে ঘিরে চলেছে বরের স্যাঙাতরা। তারা অহেতক হাসছে। অশ্রাব্য কথা বলছে। হুঁস নেই কোন। টলতে টলতে চলেছে। একজন আবার চাঁদুর নিতম্বে চাপড় মেরে তবলায় বোল তোলার চেষ্টা করল। চাঁদুও সেয়ানা। এমন মাতাল সামলানোর অভিজ্ঞতা তার কম নয় নাচতে নাচতেই লোকটার ধুতির ফাঁকে হাত গলিয়ে ধরে ফেলল তার কঠিন পুরুষাঙ্গ। অল্প সুড়সুড়ি দিয়ে বার কয়েক সামনে পিছনে করে দিতেই লোকটা ‘অহ, অহ” করে নিজেকে ছাড়িয়ে দৌড় দিল রাস্তার পাশে অন্ধকার মাঠে। আরিফ পেছনে এসে বলল
-চাঁদু, চালিয়ে যা। মালটা একশ টাকা দিয়ে গেল।
এভাবেই মেয়ের বাড়িতে যখন বরের গাড়ি থামল তখন চাঁদু রীতিমত হাঁফিয়ে উঠেছে। কিন্তু তাকে সাবলীল থাকতেই হবে। রঙ্গরস, ঢং সবই চলবে। কারণ বরের পরেই বিয়েবাড়িতে মূখ্য আকর্ষণ হল হিজড়া। সে মঙ্গলপ্রতীক। সে চালিয়ে যেতে থাকল তার ভান্ডারে যত অশ্লীল রসিকতা ছিল সব দিয়ে। এদিকে পেটে ছুঁচো ডনবৈঠক দিচ্ছে। কিন্তু চাঁদু বিয়েবাড়ির মাংস খাবে না। তাকে দেওয়া হবে না। তার জন্যে আলাদা সিধে। অন্য খাবার। বিশেষ ব্যবস্থা। আরিফ এর মধ্যে একটা কোল্ড ড্রিংক্স দিয়ে গেছে।
জমিদারবাবুকে বেশ ধরে ধরে পিঁড়ির ওপরে বসিয়ে বিয়ে সারা হল। বউটা নিতান্ত কচি। জমিদারের কন্যার বয়সী, কী তার থেকেও ছোট। তবে ডবকা। সুন্দরীও বেশ। দোকান পত্র মন্দ নয়। চাঁদু আড়ালে দাঁড়িয়ে সব কিছু লক্ষ্য করছে। ওর পাশ দিয়ে যাতায়াত করতে করতে একজন বলল – দিদি, একটা টুল দেব? বসবে?
ও বসেনি। বিয়ে দেখতে দেখতে ও চন্দ্রাণী থেকে চাঁদু হয়ে উঠছিল। কোঁচানো ধুতি, গলায় মালা, সিল্কের পাঞ্জাবি, চন্দনের ফোঁটা লাগিয়ে চাঁদু নিজে যদি বসত। কেমন লাগত তাকে! অন্ততঃ মানানসই হত এই কচি মেয়েটার পাশে। মেয়েটাও এমন হাঁড়িপানা মুখ করে বসে থাকত না। ভাবতে ভাবতে চাঁদু হাই তুলে ফেলল গোটা দুয়েক।
খাওয়া সেরে বৌ নিয়ে ফিরতে ফিরতে ওদের রাত গভীর হল। শহরের তুলনায় গ্রামের রাত বেশি গভীর হয়। চাঁদুকে মেয়ের বাড়ি বেশ ভাল সিধে দিয়েছে। আসলে গিন্নীমার দূর সম্পর্কের বোন হয় এই নববিবাহিতা বধুটি। কাজেই হিজড়েকে কেমন সিধে দেওয়া উচিৎ সে কথা গিন্নিমা জানিয়ে দিয়েছিল। এটা মেয়ের বাড়ির মহিলাদের কথায় বুঝেছে চাঁদু। তাই মনে মনে কৃতজ্ঞ বোধ করেছিল।
বাড়িতে ঢুকেই জমিদারবাবু স্যাঙাত দের নিয়ে বসে পড়লেন আরেক দফা স্বাস্থ্যপানে, যেন বিরাট বাঘ মেরে এসেছেন। কিন্তু সারাদিনের ধকলে কেউ বেশিক্ষন টানতে পারলেন না। বড়ঘরের টানা ফরাসে শুয়ে পড়ল তারা। জমিদারবাবুকে ধরে ধরে নিয়ে যাওয়া হল তার শোয়ার ঘরে। তিনি তখন প্রায় বাহ্যজ্ঞ্যান রহিত। বারান্দার কোণে চাঁদু চুপচাপ বসে ছিল। তার শোয়ার জায়গা হবে মহিলা মহলে কোথাও। আরিফ বাইরের কোনো ঘরে শুয়ে পড়েছে। চারিদিকে আর সাড়া শব্দ বিশেষ নেই। শুধু একটা ঘর থেকে মেয়েদের টুকরো কথা শোনা যাচ্ছে। ওখানেই নতুন বউকে নিয়ে গিন্নিমা আছেন এটা বোঝা যাচ্ছে। ঝি গোছের মাঝবয়সী একটা মেয়েছেলে চাঁদুর সামনে এসে বলল – দিদি, গিন্নিমা তোমায় ডাকছেন। আর কিছু না বলেই সে চলে গেল বারান্দার ওপারে। চাঁদু গা তুলে ক্লান্ত দ্বিধাজড়িত পায়ে ঘরটির সামনে গেল – আসতে পারি? ভারিক্কী মহিলা কন্ঠ ভেসে এল – এসো। ঘরে ঢুকে দেখল গিন্নিমা ও নতুন বৌ ওকেই দেখছে। গিন্নিমা এগিয়ে এসে মুখ খুললেন – শোনো ছোঁড়া, তুমি যে ছেলে সেটা আমি টের পেয়েছি। যখন তুমি কলঘরে গেছিলে তখন আমি চাঁছের বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখেছি। অজানা বিপদের আশংকায় চাঁদু কেঁপে উঠল। আবার কী ঝামেলা হবে কে জানে! সে নিরুত্তর রইল। গিন্নিমা আবার বললেন- কিছু উত্তর দিলে না যে? বলো, তুমি স্বাভাবিক ছেলে কিনা? তোমার হয় সবকিছু? লজ্জার মাথা খেয়ে চাঁদু বলে ওঠে – পেটের দায়ে এসব নোটাঙ্গি করি মা। কিন্তু আমি সত্যিকারের হিজড়ে নই। ছেলে। এবার যা শাস্তি দেবার দ্যান। চাঁদু লক্ষ্য করল গিন্নিমার মুখটা ক্রমেই স্নিগ্ধ হয়ে উঠছে। গিন্নিমা বললেন- শোনো বাছা, তোমায় একটা গুঢ় কথা বলার আছে। কর্তা তো বাচ্চার জন্যে পাগল হয়ে গেছে। ওদিকে ক্ষমতা নেই বাপ হওয়ার। আগের বউকে বাঁজা বলে গঞ্জনা দেওয়ায় সে আত্মহত্যা করে মুক্তি পেয়েছিল। তারপরে আমায় বিয়ে করে একই কথা। আমায় তাড়িয়ে আবার বিয়ে করার মতলব এঁটেছিল। আমি বললাম যে আমি যেমন আছি, থাকি, তুমি আরেকটা বিয়ে করো। তাই নিজেই ঠিক করলাম এই বিয়ে আমার এই বোনের সঙ্গে। কিন্তু এবার আমার একটা বাচ্চা চাই। আমার এই বোনের পেটে। তোমায় সাহায্য করতে হবে। ভয়ে কেঁপে উঠোল চাঁদু – আমি? মানে?
-ভয়ের কিছু নেই। তোমায় লোকে জানে হিজড়ে বলে। এখানেও থাকো না। কাজেই কাজ চুকেবুকে গেলে কলকাতা চলে যাবে পয়সা নিয়ে। তোমায় এখন সঙ্গম করতে হবে আমার এই বোনের সাথে। যাতে তোমার ঔরসে ওর পেটে বাচ্চা আসে। ওকে সব শিখিয়ে রেখেছি। ভয় নেই। বার দুয়েক করবে। হাজার টাকা পাবে।
চাঁদুর মাথা কেমন গুলিয়ে গেল। কী বলবে বুঝে উঠতে পারল না। ভয়ে ত্রাসে বলে ফেলল – আমি কখনও ওসব করি নি। মানে আমি ঠিকঠাক…।
-সে নিয়ে ভেবো না। আমি তো আছি। করিয়ে নেবো ঠিকঠাক। যাও রেডি হও।
-মানে?
-আর মানে বুঝতে হবে না। কাপড় জামা ছেড়ে ল্যাঙটো হয়ে এসো। আমি ওকে রেডি করছি। হাজার টাকা কম হল? না হয় আরো দু’শ বাড়িয়ে দিচ্ছি। যাও।
টলমলে পায়ে চাঁদু ঘরের কোণের দিকে গেল। সত্যি তো বারোশ টাকা কম না কি? অনেক কিছু করা যাবে। এছাড়া একটা নারী শরীর পাওয়া, যা তার অনেকদিনের কামনা। ধীরে ধীরে সে শাড়ি, সায়া, ব্লাউজ, ব্রা মায় তলার হাফপ্যান্ট খুলে ফেলল। তার নির্লোম চেহারায় একটা সুতো নেই। পুরুষাঙ্গটা দৃঢ় উত্থিত হয়ে তার স্বপ্নকে ছুঁয়ে ফেলল। গিন্নিমা ডাকলেন- এসো।
শুনেই অবনত চোখ তুলে সে দেখল এক নিরাবরণ সুন্দরী যার শরীরের প্রতিটি অঙ্গ নিখুঁত মুন্সীয়ানায় তৈরী। তার প্রতিটি বিভঙ্গ যেন চাঁদুকে উন্মাদ করে তুলছে। পাশে মূর্তিমতী রসভঙ্গ গিন্নীমা। তৃতীয় কারোর উপস্থিতিতে এসব হয়! কিন্তু কর্ত্রীর ইচ্ছেয় কর্ম। বারো’শ টাকা। কম কথা!
– যাও। বিছানায় ওঠ। তাড়াহুড়ো কর না। আগেরটা আগে কর। দেখো, ঝপ করে যেন বাইরে না পড়ে। তাহলে টাকা পাবে না।
চাঁদু এমন শর্তাধীন সঙ্গমের কথা আগে শোনে নি। কিন্তু শর্ত মেনেই সে শুরু করল পূর্বরাগ। কিছুটা অনভ্যস্ত দস্তুরে। পাশে বসে গিন্নিমা তীক্ষ্ণ নজর রাখছেন তাদের নিম্নাঙ্গের ওপর। কিছু বাদে তিনি বললেন – যোনি ভিজে গেছে। তুমি তোমারটা ঢুকিয়ে দাও। ওপরে আনো। আমি সেট করে দিচ্ছি। চাঁদু বুঝল গিন্নিমা হাত দিয়ে ধরে তার পুরুষাঙ্গ ঠিক জায়গায় রাখলেন। বললেন- চাপ দাও, পুরোটা ঢুকিয়ে দাও, বাইরে যেন না পড়ে। চাঁদু হুকুম তামিল করল। নাহ, বাইরে পড়ে নি। জায়গামতই ফেলতে সক্ষম হল চাঁদু। গিন্নিমার মুখে হাসি ফুটে উঠল। হেসেই বললেন – আধঘন্টা বাদে আবার করো। এবার একটু ইচ্ছে মত। চাঁদুর নিজেকে পাল দেওয়া পাঁঠার মত মনে হল, যে মালকিনের সাহায্যে সবে একটা ছাগলের সাথে সার্থক সঙ্গম করে হাঁফাচ্ছে।
শর্তমত দ্বিতীয় সঙ্গম করে শাড়ি জামা পড়ে টাকা ও প্রাপ্য সব কিছু পোঁটলা বেঁধে নিয়েই ভোরেই সে পৌঁছে গেল স্টেশনে। রিফের জন্যে সে অপেক্ষা করল না। শুধু গিন্নিমাকে বলে এল আরিফকে বলে দিতে যে সে একটা জরুরী ফোন পেয়ে চলে গেছে।
আরিক কলকাতায় এসে ওর প্রাপ্য খাটনির টাকা দিতে এসে অনেকবার জিজ্ঞাসা করল – কী হয়েছিল, কেন সে একাই ভোর হতে হতেই চলে এসেছিল। কেউ কী কিছু বলেছিল! চাঁদু বলেছিল- সে সব কিছু নয়, সব ঠিক ছিল। কিন্তু তার হঠাত মায়ের কথা মনে পড়ে মন খারাপ হওয়ায় সে চলে এসেছিল। একই সাথে আরিফকে সে জাইয়ে দিল যে সে আর কখনই নাচতে যাবে না। হিজড়ে সাজবে না। প্রচুর বুঝিয়ে মুখ খিস্তি করে আরিফ চলে গেল। তারপরেও বারবার ডেকেছিল আরিফ। কিন্তু চাঁদু আর যায় নি।
এখন সে বস্তির পাশে এক মন্দিরে ধোয়ামোছা ফাইফরমাস খাটার কাজ নিয়েছে। প্রসাদ পায়। সামান্য হাতখরচ। পেট চলে যায়। মাঝে মাঝে ঠাকুরের মুর্তির দিকে তাকিয়ে থাকেয়ার গিন্নীমার কথাগুলো তখন কানে ভাসে। আসার আগে গিন্নিমা বলেছিলেন – শোন, বাচ্চা যদি হয় আমার বোনের তাহলে তোমায় বকশিশ পাঠাব। কিন্তু কখনও যেত তোমায় এ মুড়োতে না দেখি। আর বাচ্চা না হলে বুঝব তুমি সত্যি হিজড়ে, তখন অন্য কাউকে খুঁজব বোনকে পাল দেওয়ানোর জন্যে। কিন্তু তোমায় যেন না দেখি।
আরিফের খবরে বড় ধন্দ্ব লেগে গেল চাঁদুর। বাচ্চা হয়েছে বলল আরিফ, ছেলে, আবার বলল গিন্নিমা চাঁদুকে বিশেষভাবে যেতে বলেছেন। কিন্তু ছেলে কার ঔরসে হয়েছে? তার? তাহলে তো গিন্নিমা বকশিস পাঠাবেন বলেছিলেন। চাঁদু যেন মুখ না দেখায় সে ধমকিও দিয়েছলেন। তাহলে ডাকলেন কেন? অন্য কোন পুরুষের ঔরসে ছেলে হয়েছে? আর তাকে ডেকে বলা- তুমি সত্যি হিজড়ে। বার’শ টাকা বেফালতু হজম করেছো। চাঁদু নির্বোধের মত তাকিয়ে থাকে ট্রেনের জানলার বাইরে। তার শরীরে আজ কোন সাড় নেই। পরচুলা কুটকুট করছে না। ব্রার স্ট্র্যাপ কেটে পিঠে বসে যাচ্ছে না, বুকে স্পঞ্জের গরম লাগছে না। শুধু জট ঘুরছে মাথা জুড়ে। উলটো দিকে আরিফ হেলান দিয়ে ঘুমোচ্ছে। পটাশপুর পৌঁছতে আরও ঘন্টা তিনেক।
স্টেশনে যখন ট্রেন থামল তখন ঠিক দুপুর বারোটা। ওরা বাইরে বেরিয়ে দেখল পটাশপুর যাওয়ার জন্যে ওদের জন্যে গাড়ি পাঠানো হয়েছে। খাতিরযত্ন একটু বেশি কি? হতেই পারে। জমিদারবাবুর মন নিশ্চয়ই ফুরফুরে। তবে আরিফ বলেছিল সন্ধ্যের ট্রেন ধরে রাতের মধ্যে বাড়ি পৌঁছে যাবো। গাড়িতে পটাশপুর যেতে মিনিট চল্লিশ লাগে। জমিদার বাড়িতে পৌঁছে বাইরের থেকে ভিতরের উৎসবের রেশ পেল চাঁদু। বাইরে কাপড়ের তোরণ পেরিয়ে ওরা দু’জনে ভিতরে প্রবেশ করতেই ব্যাণ্ড তাসা বেজে উঠল। ওদের স্বাগতম জানানো হল ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে দিয়ে। কিছুক্ষনের মধ্যেই চাঁদু বুঝল যে আজকের অনুষ্ঠানে মুখ্যভূমিকা তারই। তার মনের ধন্ধ্ব কেটে যাচ্ছে। তার মানে তারই ঔরসজাত সন্তানের আজ আঁতুড়ভাঙা অনুষ্ঠান। তার সন্তানই যদি না হয় তবে তার এত খাতিরযত্ন কেন? ও বসতেই এক বয়স্কা মহিলা চাঁদুর সামনে চারটে বড় সাইজের মিষ্টি রাখলেন আর এক গ্লাস জল। চাঁদুকে বললেন – খেয়ে নাও দিদি, এখুনি আঁতুড় ভাঙ্গা হবে। কিছুক্ষনের মধ্যে উঠোনটা ভরে গেল গন্যমান্য আত্মীয়স্বজনে। চাঁদু উঠে দাঁড়াল। এখুনি নব জাতককে নিয়ে তার মা আসবেন। বাচ্চাকে তুলে দেবেন হিজড়ের হাতে। হিজড়ে আশীর্বাদ করে তুলে দেবে বাবার হাতে। এটাই প্রথা। এ সময় চাঁদুকে বাপ মা ও বাচ্চাকে ঘিরে নাচতে হবে। এটুকুর জন্যে চাঁদু পাবে দু’হাজার টাকা। বড় দাঁও।
সবাই নিজের আসনে বসতেই উলুধ্বনি শোনা গেল। চাঁদু দেখল বারান্দা ছাড়িয়ে গিন্নিমা নতুন বউকে ধরে ধরে এগিয়ে আনছেন। নতুন বউয়ের হাতে একটা কাঁথার পুঁটুলি। চাঁদুর হাত’পা কেমন অসাড় হয়ে গেল। মনের মধ্যে তীব্র ঝড়। শরীরে রক্তের দাপাদাপি। এ কি তার ঔরসজাত সন্তান? চাঁদু প্রায় জোর করে উঠে দাঁড়াল। সামনে তীব্র দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছেন গিন্নীমা। চাঁদুর খুব ইচ্ছে করছে গিন্নীমাকে জিজ্ঞাসা করে এ কি সেই? তার ঔরসজাত সন্তান? সবার মাঝখানে কী করে জিজ্ঞাসা করে সে! নতুন বৌ কাঁথার পুঁটুলিটা ধীরে ধীরে এগিয়ে দিচ্ছে তার দিকে। তার এখন সামান্য ছেনালি করে পুঁটুলিটা গ্রহন করার কথা। কিন্তু ছেনালি তার আসছে না। গিন্নিমা বলে উঠলেন– নাও ধরো। আশীর্বাদ করো। চাঁদু খুব সাবধানে ধরল নবজাতককে। পিটপিট করে শিশুটি চাঁদুকে দেখছিল। চাঁদুর মনে হল তারই মত মুখ। মাথায় হাত রাখল সে। মনে মনে বলে উঠল- বাপধন, বাপধন। এবার সে শিশুটিকে তুলে দিল জমিদারবাবুর হাতে। ব্যান্ড তাসা বেজে উঠল। চাঁদুর নাচার কথা, পারছে না সে। বুক যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, পাঁজর জুড়ে রোড রোলার চলছে। সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। হিজড়ে নাচ দেখবে সবাই। চাঁদু বাজনার সাথে কয়েকপাক নেচেই গিন্নিমা’কে বলল- পায়ে বড্ড ব্যথা। জমিদারবাবু সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠলেন-থাক থাক, তোমায় আর নাচতে হবে না। তুমি এসেছ, আশীর্বাদ করেছ, এই ঢের। তোমার পয়েই তো আমার ছেলে হল।
আরো কিছুক্ষন সে বাড়িতে চাঁদুকে থাকতে হল। ভেবেছিল একবার গিন্নিমার সাথে কথা বলবে। কিন্তু নতুন বৌ বা গিন্নিমা কেউই বেরোলেন না। সেও ঢুকল না অন্দরমহলে। বড্ড জানার ইচ্ছে ছিল- এই সন্তান তার কি না? গিন্নিমার দেওয়া সিধে হাতে নিয়ে স্টেশনে আসতে আসতে আরিফ গুনে গুনে হাতে দু’হাজার টাকা গুঁজে দিয়ে বলল- কী রে শালা, এবার খুশ তো? না খেটেই আজ অনেক কামালি।
-আরিফ, আজ তুই আমায় না এনে একটা আসল হিজড়ে আনলে ভাল করতি।
-আসল হিজড়ে আনলে কী হত?
-বাচ্চাটার সত্যিকারের কল্যাণ হত রে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।