সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী (পর্ব – ৯)

কেল্লা নিজামতের পথে
কেল্লা হীরাঝিলের কথা তো হলো। কিন্তু তার পরিণতি? এত বড় একটা পেল্লায় কেল্লা আজ গেল কোথায়? আজকের মুর্শিদাবাদের কাছেও যেন এই প্রশ্নের কোন সদুত্তর নেই। আর উত্তর থাকবেই বা কি করে। এই সদুত্তরের রাস্তাগুলোই যে অবরুদ্ধ। সেই যে রাত্রে নির্মমভাবে হত্যা করা হলো নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে, তারপর আর কোথায় কী! আজ কোথায় নবাব আর কোথায় তার সাধের হীরাঝিল! যুদ্ধে পরাজয়ের পর সেই যে ছদ্মবেশে স্ত্রী লুৎফুন্নিসা এবং কন্যা উম্মে জহরাকে নিয়ে ২৪শে জুন, ১৭৫৬ র রাতে হীরাঝিল ত্যাগ, তারপর আর ফিরে আসার সুযোগটুকুও পাননি নবাব। আর নবাবের মৃত্যুর পর মুর্শিদাবাদ যায় ক্লাইভের দখলে। স্বভাবতই হীরাঝিলও হয় পরিত্যক্ত। যুদ্ধের পরে হীরাঝিলে আসে নতুন নবাব মীরজাফর। ক্লাইভ ও তার দলবল যুদ্ধের কটা দিন পরে ২৯ শে জুন মুর্শিদাবাদের মোরাদবাগে এসে পৌঁছোয়৷ সেখানেই বাসস্থান পছন্দ করে থাকবার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। এবং ওই দিনই হীরাঝিলে এসে নবাব মীরজাফরের সঙ্গে দেখা করে ক্লাইভ। হীরাঝিল প্রাসাদের উত্তরে রাখা ছিল সিরাজের মস্ত সিংহাসন। ক্লাইভ বড় মুখ করে মীরজাফরের হাত ধরে নবাব বানিয়ে সেখানেই বসিয়ে দেয় তাকে। সাথে উপহার হিসেবে একপাত্র স্বর্ণমুদ্রা তুলে দেয় নবাবের হাতে। তামাম বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব তখন সেই। ক্লাইভের কল্যাণে তার এই উত্থান। কিন্তু তারপর পালা করে শুরু হয় হীরাঝিল লুণ্ঠন। নবাবের অকুল সম্পত্তি ও ধনসম্পদ লুটপাট করতে বেশি সময় নেয়নি ক্লাইভ ও মীরজাফররা। সে সম্পদ যে সে পরিমাণ নয়। তার হিসাব দিতে বসলে যেন সমস্ত অংকও কম পড়ে যায়। আজও মুর্শিদাবাদের রাস্তায় ঘুরতে ঘুরতে যেন হিসাব করছিলাম সেই লুটতরাজ হওয়া সম্পত্তির। সিরাজের সম্পত্তির ভাগ নিতে মানুষের অভাব পড়েনি সেদিন। মীরজাফর নবাব হওয়ার পর হীরাঝিলেই যেন এসে হাজির হয় মুর্শিদাবাদের সকল লোভী চোখগুলো। তার প্রকাশ্য ধন ভান্ডারের হিসাব করতে বসলে চোখ উঠে যায় কপালে। এর পরিমাণ সম্বন্ধে একটু আলোচনা করা যাক। প্রায় ১ কোটি ৭৬ লক্ষ রৌপ্য মুদ্রা, ৩২ লক্ষ স্বর্ণমুদ্রা, দুই বাক্স স্বর্ণ পিণ্ড, চার বাক্স গয়নার উপযোগী হীরে, জহরত, চুনি, পান্না এবং দেশ-বিদেশের বিভিন্ন দামি পাথরখণ্ড। মৃত নবাবের এই সীমাহীন ধনসম্পত্তির লোভ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেননি অনেকেই। স্বয়ং লর্ড ক্লাইভ থেকে শুরু করে, কাশিমবাজার কুঠির ওয়ার্টস, ওয়ালস, নবাব মীরজাফর দেওয়ান রামচাঁদ, মুন্সি নবকৃষ্ণ প্রায় প্রত্যেকেই ছুটে এসেছিলেন লুণ্ঠিত সম্পত্তির ভাগ বুঝে নিতে। যে রামচাঁদ ও নবকৃষ্ণ ক্লাইভ এর কাছে মাত্র ৬০ টাকা মাসিক বেতনে কাজ করতেন, কিছুদিন পর তারাই হয়ে উঠলেন অসীম সম্পত্তির অধিকারী। শোনা যায় শোভাবাজারের রাজা নবকৃষ্ণ মায়ের শ্রাদ্ধে প্রায় ৯ লক্ষ টাকা ব্যয় করেন। আর পলাশীর যুদ্ধের দশ বছর পর মৃত্যুকালে দেওয়ান রামচাঁদ এর কাছে নগদ এবং হুন্ডি মিলিয়ে প্রায় ৭২ লক্ষ টাকা এবং ৪০০ টি সোনা ও রুপোর কলসি থাকবার উল্লেখ পাওয়া যায়। যার মধ্যে ৮০ টি সোনার এবং বাকি রুপোর। আন্দুল রাজপরিবারের আদি পুরুষ রামচাঁদ। আজও তাঁর সম্পত্তির কথা লোকমুখে ঘোরে। আর শোভাবাজারে রাজা নবকৃষ্ণের রাজবাড়ী আজও পলাশীর যুদ্ধ পরবর্তী দিনগুলোর সাক্ষ্য বহন করে।
পলাশীর পরে মৃত নবাব সিরাজউদ্দৌলার সৌজন্যে এক কথায় যেন পাল্টে যায় বাংলার ইতিহাস। আর যেখান থেকে এই ইতিহাসের পালাবদলের সূচনা, সেই হীরাঝিল ডুবে যায় কালের গর্ভে। আজ কষ্ট করে খুঁজে খুঁজে তার একটা ভিত খুঁজে বার করতে সারাদিন কেটে যায়। বর্তমান হীরাঝিল প্রাসাদের ভিতে ছেয়ে যাওয়া বাঁশ আর আমবাগানের তলায় দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম, সত্যিই মুর্শিদাবাদের মতো এভাবে হারিয়ে যায়নি ভারতের কোনো ঐতিহাসিক রাজধানী। সেই জৌলুস, সেই সম্পদের ছিটেফোঁটাও আজ আর টিকে নেই। যেটুকু পাঁচিল, দালান টিকে ছিল একসময়, তাও আজ ভাগীরথীর গ্রাসে ভেসে গেছে সময়ের সাথে সাথে। যাই হোক এ তো গেল প্রকাশ্য রাজকোষের কথা। কিন্তু শোনা যায় এই প্রকাশ্য রাজকোষ বাদেও নবাব সিরাজের অন্দরমহলে ছিল এক গোপন অর্থ ভান্ডার। আর হীরাঝিল প্রাসাদ থেকে ক্লাইভ ও সাহেবদের দল ফিরে যাওয়ার পর শুরু হলো আর এক অন্য তল্লাশি। নবাব মীরজাফর, রামচাঁদ, এবং মুন্সি নবকৃষ্ণ তন্নতন্ন করে খুঁজে বেড়ালেন হীরাঝিল প্রাসাদের গোপন সিন্দুক ও ধনভান্ডার। গোপন সম্পত্তির আশা তারা কখনোই ছাড়েননি। আর বিফলেও যায়নি তাদের তল্লাশি। গোপন রাজকোষ থেকে তারা খুঁজে পান প্রায় নগদ ৮ কোটি নবাবী টাকা। মীরজাফর, তার কর্মচারী আমির বেগ খাঁ, রামচাঁদ এবং নব কৃষ্ণের মধ্যে বাটোয়ারা হয়ে যায় এই অর্থ। ক্লাইভ এবং ইংরেজের দল কোনদিনই এই অর্থের কথা জানতে পারেননি। এভাবেই শুরু হয় হীরাঝিলের ওপর নির্মম আঘাত। স্থানীয় এক মাস্টারমশাই বলছিলেন আজ থেকে ৪০ বছর আগেও হীরাঝিল প্রাসাদের জায়গা থেকে খেলতে যাওয়া বাচ্চারা খুঁজে পেত নবাবের মুদ্রা, নবাবী বাসনপত্র এবং হীরাঝিল প্রাসাদের বিভিন্ন দামি পাথরের অংশ। শোনা যায় নবাব সিরাজউদ্দৌলা অনেক সাধ করে গৌড়ের ভাঙ্গা প্রাসাদ থেকে মার্বেল এবং অন্যান্য পাথর খুলে এনে বানিয়েছিলেন হীরাঝিল। বড় মাসি ঘষেটি বেগম ও তার স্বামী নওয়াজেস মোহাম্মদ খাঁর প্রাসাদ মতিঝিলের আদলে তিনি বানাতে চেয়েছিলেন তার প্রাণের হীরাঝিল। মাঝখানে ঝিল খনন করে সৌন্দর্য বাড়িয়েছিলেন প্রাসাদের। কিন্তু বেশিদিন প্রিয় জায়গায় থাকবার সৌভাগ্য হয়নি তরুণ নবাবের। দাদু আলীবর্দী মারা যাওয়ার পর ওই একটি বছর ইংরেজদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এবং আশপাশের বিশ্বস্ত লোকেদের সাথে অস্তিত্বের লড়াই করতে করতেই কেটে যায় তাঁর। একপাশে মীরজাফর, অন্যদিকে মাসি ঘষেটি বেগম ও তার দেওয়ান ঢাকার রাজা রাজবল্লভ, অপরদিকে ক্লাইভ, ওয়াটস এবং কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম প্রাসাদের ড্রেক সাহেব, এই চক্রাবর্তের মধ্যে পড়ে তাঁর পলাশীর যুদ্ধের দিনটির দিকে এগিয়ে আসা। বাকিটা ইতিহাসে খুব পরিচিত এবং সকলের পড়া। হীরাঝিল আজ আর নেই। সামান্য ভিতের কয়েকটি ইট ছাড়া নবাবের স্মৃতি ধরে রাখবার কোন কিছুই অবশিষ্ট নেই। লোকমুখে শুনলাম একটি ছোট্ট ইটের ঢিপি কখনোই নাকি ভাঙবার চেষ্টা করা হয়নি। দেখলামও সেটি নিজচোখে। সেটি ভাঙতে গিয়ে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিপত্তির মুখে পড়তে হয়েছে মানুষজনকে। তাই আর চেষ্টা করেননি কেউ। কিন্তু সবটাই প্রায় ধ্বংসাবশেষ। অস্তিত্ব হারিয়েও সামান্য অস্তিত্বটুকু টিকিয়ে রাখবার মতনও নয় আজকের হীরাঝিল। হাঁটতে-চলতে সেই কথাই যেন ধাক্কা দেয় বারবার। এত বড় প্রাসাদ, এত ঐশ্বর্য, এত সম্পদ, নির্বাকভাবে মাটির তলায় চাপা পড়ে নেই তো? হয়তো ভবিষ্যৎ কখনো এর উত্তর দেবে।