গল্পেরা জোনাকি তে রীতা চক্রবর্তী

অম্বুবাচীর সকালে
বৈশালী আজ খুব ব্যস্ত। ঘুম থেকে উঠে স্নান করে মায়ের একটা নতুন শাড়ি পাট ভেঙে পড়েছে। খুব যত্ন করে নিজেকে সাজিয়েছে। এবার পূজার ঘরে যাবে যেখানে ঠাম্মি ওর জন্য অপেক্ষা করছে। আজ অম্বুবাচী লাগবে যে! তাই ঠাম্মি তাড়াতাড়ি পূজো করবে। তারপর লক্ষ্মীঠাকুর, সরস্বতী ঠাকুরের মূর্তি আর কালীঠাকুরের ছবিটা শালু কাপড় দিয়ে ঢেকে দেবে। অম্বুবাচীতে দেবীর মুখ নাকি দেখতে নেই! এই তিনদিন তো দেবীর পূজোও হবে না। অম্বুবাচী ছাড়লে পুরো সিংহাসনের কাপড় বদলাতে হবে ঠিক ঠাম্মির জামাকাপড় বিছানাপাটি ধোয়া’র মতো করে। তারপর আবার পূজো হবে।
অম্বুবাচী লেগে গেলে ঠাম্মি আর ভাত খাবেনা। আসলে অম্বুবাচীর কটা দিন ঠাম্মি আগুনে গরম করা কোনো কিছুই খাবেনা। এই কটা দিন ঠাম্মি ওই একঘেয়ে সাবু মাখা খাবে। কেউ এভাবে দিনের পর দিন ভাত না খেয়ে থাকতে পারে?
অম্বুবাচী লাগার আগে ঠাম্মিকে আজ একটু গরম গরম খাবার দেবে বলে মা’ও সকাল থেকে রান্নাঘরে ব্যস্ত আছে।
এরমধ্যেই ঠাম্মি ডেকে ওঠে, – “বিশু হল তোর? একটু পা’ চালিয়ে আয় ‘ভাই।”
ঠাম্মির ডাক শুনে বৈশালী তাড়াতাড়ি ঠাকুরঘরে পৌঁছে যায়।
সদ্য কলেজে ভর্তি হওয়া বৈশালীর মনের মানুষ হল’ বিথিকা চ্যাটার্জি’ মানে ওর ঠাম্মি, পাড়ার লোকে যাকে বিথি মাসিমা, বিথি কাকিমা বলে ডাকে। ঠাম্মি স্কুলের টিচার ছিলেন বলে সবাই চেনে এবং সম্মান করে। আর তারই খানিকটা ভাগ বৈশালীও পায়। পাড়ার সবাই ওকে খুব ভালোবাসে। আর বৈশালীর সবটুকু ভালোবাসা, আদর, আব্দার সব ঠাম্মির জন্যে।
ঠাম্মিকে নিয়ে ওর খুব গর্ব হয়। তিনি এমন একজন শিক্ষিকা যিনি আলোচ্য বিষয়ের ভালোমন্দ যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দিতে পারেন কিন্তু বিষয়টাকে চাপিয়ে দেননা। সেই মানুষ যখন এই অম্বুবাচীতে ভাত না খেয়ে থাকে তখন ওর কিছুই ভালো লাগে না।
বৈশালী শুনেছে যে ‘অম্বুবাচীতে মাটিতে কোদাল দেয় না।’ – সেটা ঠিক আছে। এটা কৃষিজমির জন্য তৈরি একটা নিয়ম। এতে কৃষক ও তার জমি উভয়েই বিশ্রাম পায়। বৈশাখ জৈষ্ঠ্যের কাঠফাটা গরমের পর প্রথম আষাঢ়ের জলে জমি ভিজে নরম হবে। তারপর যখন চাষ শুরু হবে তখন মাঠে মাঠে সবুজের ছড়াছড়ি। এতো খুবই ভালো নিয়ম। এরসাথে বিধবাদের অন্নগ্রহনের কি সম্পর্ক আছে? শুধু বিধবারাই কেন অম্বুবাচী পালন করবে? কি কারণে এই কটা দিন বিধবাদের খাবারের ওপর নিয়মের ফরমান জারি করা হয়েছে?
ঠাম্মির কাছেও এ প্রশ্নের উত্তর নেই। তাঁর শুধু একটাই কথা, “দুদিন ভাত না খেলে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না রে দিদি’ বরং একটু হাল্কা হয়। তাতে প্রেসার, সুগারের রোগীদের একটু চিকিৎসা হয়ে যায়। ফলমূল, সাবুদানা শরীরকে হাল্কা রাখে আবার উপোস করেও থাকতে হয় না। তাই বলি যে ও নিয়ে তুই এত ভাবিসনা।
বয়স হলে একটু নিয়ম মেনে চলাই ভালো। নাহলে যদি কখনো কোনো অঘটন ঘটে তবে বারে বারে মনে হবে ‘অমুক নিয়ম ভাঙ্গার জন্যই অমুক ঘটনাটা ঘটেছিল।’ সে এক দুর্বিসহ পরিস্থিতি, ভাবলেই ভয় হয়। সেই মানসিক যন্ত্রণা মানুষকে পাগল করে দেয় রে। তার থেকে দুদিন উপোস দেয়া অনেক ভালো।
চিরাচরিত প্রথা বলে ঠাম্মিকেও মেনে নিতে হয়েছে প্রচলিত নিয়মগুলো। বৈশালীও অনেক ভেবেছে এটা নিয়ে। বারে বারে প্রশ্ন জেগেছে ওর মনে,”কেন ঠাম্মি অম্বুবাচীতে রান্না করা খাবার খাবেনা? কোথায়, কোন বইয়ে লেখা আছে যে, বিধবাদের এই সময় রান্না করা খাবার খেতে নেই? পৃথিবীতে সবাই খাবেদাবে আর ঠাম্মি বিধবা বলে এই সময় না খেয়ে থাকবে? কেন? রান্না করা খাবার খেয়ে কারো যদি কোন ক্ষতি না হয় তবে একজন বিধবা মহিলারই বা কি ক্ষতি হতে পারে ?” রাশি রাশি প্রশ্ন কিন্তু তার উত্তর কোথাও নেই। অম্বুবাচীতে যদি ধরিত্রীমা রজস্বঃলা হয় তার সাথে বিধবাদের ভাত খাবার কি সম্পর্ক? টানা বাহাত্তর ঘন্টা কোনো সলিড ফুড না খেয়ে থাকার জন্য মায়েদের শরীর যদি খারাপ হয়ে পরে তো বাড়ির কারোরই তো যত্ন হবেনা! তখন কি হবে?
যে বিধবা মায়ের ফলমূল কিনে খাবার টাকা নেই সে কি খাবে? যারা লোকের বাড়িতে কাজ করে তাদের জন্য কে এই স্পেশাল খাবারের ব্যবস্থা করে দেবে? যার সন্তান ছোট সেই মা নিজে না খেয়ে ছেলেমেয়েদের জন্য রান্না করবে, আগুনের কাছে থাকবে, তাতে নিয়ম ভাঙবেনা?
তার যদি শরীর খারাপ হয় তবে কে দেখবে তাকে? যে বিধবা মায়েরা অফিস কাছারিতে কাজ করে তাদের জন্য স্পেশাল ছুটি আছে কিছু? না থাকলে তারা কি করে অম্বুবাচী পালন করবে?
এটা জাস্ট একটা ইরিটেটিং রিচুয়ালস্ বলে মনে হয় বৈশালীর। আদমসুমারী’র মতো এলাকায় কার কার বাড়িতে বিধবা মহিলা রয়েছে তার যেন বাৎসরিক ‘বিধবাসুমারী’ ব্যবস্থা এটা। বিধবা মহিলাদের পরিসংখ্যান কারা জানতে চায়? কি তাদের উদ্দেশ্য?
এদিকে দেখ, অম্বুবাচীতে দেবীর মুখ দেখা বারন আর অন্য দিকে এই অম্বুবাচী চলাকালীন বিপত্তারিণীর পূজো হবে। যদি অম্বুবাচীতে
দেবীর পূজো নিষিদ্ধ হয় তবে মা বিপত্তারিণীর পূজো হয় কি করে? যত্তসব আজগুবি ব্যাপার!
এরকম নিয়ম তো থাকাই উচিত নয়!
মাথার ভেতরে যখন এরকম চিন্তাভাবনা কিলবিল করছে তখনই ঠাম্মির ডাকে সম্বিত ফেরে। তাড়াতাড়ি করে চন্দনটা বাটিতে তুলে দিয়ে পূজোর জল আনতে চলে যায় বৈশালী।