গারো পাহাড়ের গদ্যে জিয়াউল হক

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইকবাল হোসেন

বীর মুক্তিযোদ্ধা মোঃ ইকবাল হোসেন, এফ.এফ. ভারতীয় তালিকা নম্বর-৪৭৯১৫, গেজেট নম্বর মনিরামপুর-২৩৪৯, লাল মুক্তিবার্তা নম্বর-০৪০৫০৫০১১২, সমন্বিত তালিকা নম্বর-০১৪১০০০১৩০৬, মোবাইল নম্বর-০১৭২১৩৭৪৪৮২, পিতা – ওমির গাজী, মাতা – নূরজাহান বেগম, স্থায়ী ঠিকানা – গ্রাম: মল্লিকপুর, ডাকঘর: ঝাঁপা, উপজেলা: মনিরামপুর, জেলা: যশোর। বর্তমান ঠিকানা: ঐ।
২ ছেলে ৫ মেয়ের মধ্যে ইকবাল হোসেন ছিলেন বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। ১৯৭১ সালে তিনি যশোর জেলার মনিরামপুর থানার ঝাঁপা উচ্চ বিদ্যালয়ের ১০ম শ্রেণিতে লেখাপড়া করতেন। ১৯৭০ সালে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়লাভ করার পরও পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান বাঙালিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে কোন মতেই রাজি ছিল না। তাইতো তিনি নানা অযুহাতে সময়ক্ষেপন করতে থাকেন। ইয়াহিয়া খানের এই অন্যায় কর্মকান্ডে ক্ষুব্ধ হয়ে বাঙালিরা রাস্তায় নেমে এসে সরকারের বিরুদ্ধে প্রচন্ড গণআন্দোলন গড়ে তোলেন। আন্দোলনের পরবতী কর্মসূচি ঘোষণার জন্য ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানের এক বিশাল জনসভায় ভাষণ প্রদান করেন। তিনি তার ভাষণে যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুকে মোকাবেলার আহবান জানান। বঙ্গবন্ধুর এই আহবানের পর ইকবাল হোসেনসহ বাঙালিরা বুঝতে পারে যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করা ছাড়া তাদের সামনে আর কোন পথ খোলা নেই। তাইতো সারা দেশে শুরু হয়ে যায় মুক্তিযুদ্ধের প্রস্তুতি।
২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনারা সারা বাংলাদেশের উপর আক্রমণ করে মানুষ হত্যার পাশাপাশি মানুষের বাড়িঘরে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিতে শুরু করেন। সেই দিন মাঝরাতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার পর পরই পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতার হন। তিনি গ্রেফতার হলেও তার স্বাধীনতার ঘোষণা অনুযায়ী সাবা বাংলাদেশে প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। পাকিস্তানি সেনাদের নৃশংস হত্যাকান্ডের বদলা নিতে এপ্রিল মাসের শেষের দিকে মুক্তিযুদ্ধে যোগদানের জন্য ইকবাল হোসেন দেশ ছেড়ে ভারতের পথে যাত্রা করেন। তারপর বাংলাদেশের তৎকালীন খুলনা জেলার কলারোয়া থানার গোগা বর্ডার পার হয়ে তিনি ভারতের বনগাঁর টালিখোলা ইয়ুথ ক্যাম্পে গিয়ে ভর্তি হন। সেখানে ১৫ দিন অবস্থান করার পর মুক্তিযুদ্ধের উচ্চতর প্রশিক্ষনের জন্য বাছাই করে ইকবাল হোসেনদের ভারতের বিহার রাজ্যের চাকুলিয়া প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে প্রেরণ করা হয়।
চাকুলিয়াতে ৩০ দিন প্রশিক্ষণ শেষে ২৪ পরগনা জেলার পেট্রাপোল সীমান্তে এনে তাদের ভারতীয় সেনাবাহিনীর অধীনে ন্যাস্ত করা হয়। সেখানে আসার পর বীর মুক্তিযোদ্ধা দৌলতের নেতৃত্বে ১০ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা গ্রুপ গঠন করে মাত্র একটা এসএমজি, কয়েকটি গ্রেনেড ও কিছু এক্সপ্লোজিভ দিয়ে ইকবাল হোসেনদের বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের ভেতরে গিয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা গ্রুপটি মনিরামপুর থানার মল্লিকপুর গ্রামে সেল্টার গ্রহণ করেন। অস্ত্রের অপ্রতুলতার জন্য তার শত্রুর বিরুদ্ধে কোন যুদ্ধে অংশগ্রহণ না করে এক্সপ্লোজিভ বিস্ফোরণ ঘটিয়ে মনিরামপুর-রাজগঞ্জ রাস্তার পাড়দিয়া সেতু ধ্বংস করার পর তারা পূনরায় ভারতে ফিরে আসেন। তারপর ফ্লাইং অফিসার ফজলুল হকের নেতৃত্বে ৩১ জন মুক্তিযোদ্ধার একটা প্লাটুন গঠন করে প্রয়োজনীয় অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ তাদের পূনরায় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে প্রেরণ করা হয়। বাংলাদেশের অভ্যন্তরে এসে নিজেদের নিরাপত্তার স্বার্থে মল্লিকপুর, রূপসপুর, ডুমুররখালি, ঝাঁপা, রাজগঞ্জসহ বিভিন্ন স্থানে তাদের সেল্টার পরিবর্তন করেন।
চন্ডিপুরের যুদ্ধ ঃ চন্ডিপুর থেকে ৩ মাইল পশ্চিম হানুয়াতে মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থান ছিল। সংখ্যায় তারা ছিল মাত্র ৬ জন। অন্যদিকে প্রায় ৫০ জনের এক বিশাল বাহিনী নিয়ে রাজাকাররা এসে পাশের রাজগঞ্জ গ্রাম আক্রমণ করে লুটপাট শুরু করলে সেই খবর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে এসে পৌছায়। সংখ্য স্বল্পতার জন্য রাজাকারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার কোন কোন ইচ্ছাই তাদের ছিল না। কিন্তু গ্রামের লোকদের চাপে তারা চন্ডিপুর গ্রামে শত্রুদের বিরুদ্ধে এ্যাম্বুস পেতে অবস্থান করতে থাকেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অবস্থানের খবর স্বাধীনতাবিরোধীরা রাজাকারদের কাছে পৌছিয়ে দিলে তারা চার দিক থেকে ঘিরে ধরে মুক্তিযোদ্ধাদের উপর আক্রমণ চালায়। তারপর উভয়পক্ষের মধ্যে শুর হয় তুমুল যুদ্ধ। এই যুদ্ধে ৩ জন রাজাকার নিহত, ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ, ১ জন জীবিত ধরা পড়ে এবং বাকি ৩ জন কোন মতে জীবন বাঁচিয়ে পালিয়ে আসতে সক্ষম হন। তারপর এই মুািক্তযোদ্ধা গ্রুপটি হানুয়া, ডুমুরখালি এবং ডিসেম্বর মাসের ৪ তারিখে রাজগঞ্জ রাজাকার ক্যাম্প আক্রমণে অংশ গ্রহণ করেন। হানুয়ায় ৮ জন, ডুমুরখালিতে ৫ জন এবং রাজগঞ্জে ৪০ জন রাজাকার নিহত হওয়ার বিপরিতে শুধুমাত্র হানুয়ার যুদ্ধে ২ জন মুক্তিযোদ্ধা শহিদ হন। তারপর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করে। ইকবাল হোসেনদের মতো বীর মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধ করে দেশ স্বাধীন করেছিল বলেই আজ বাংলাদেশের নাম পৃথিবী ব্যাপি ছড়িয়ে পড়েছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।