সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রীতা পাল (পর্ব – ১২)

যাও পাখি দূরে
রঞ্জনাদের বাড়ির ডোর বেল বাজতেই একটা কাজের লোক এসে দরজাটা খুলে দিল। জিজ্ঞাসা করল,“ কাকে চাই?”
সবিতা দেবী বললেন,“ এটা রঞ্জনাদের বাড়ি তো? রঞ্জনা আছে? আমরা ওর বন্ধু কুমারীর বাবা-মা। ওর সাথে একটু দেখা করতে এসেছি।”
“ দাঁড়ান”,বলেই একটা ঘরে কাজের মহিলাটি চলে গেল। ঘর থেকে একজন ভদ্রলোক বেরিয়ে উনাদের বসতে বললেন।
“ আমি অমরেশ গুহ,রঞ্জনার বাবা।”
সুখেন বাবু হাতজোড় করে বললেন,“ নমস্কার। আমি কুমারীর বাবা। ও সবিতা,আমার স্ত্রী। আমরা একটু রঞ্জনার সাথে দেখা করতে চাই। ও এখন কেমন আছে? আমাদের মেয়ে সবে হাসপাতাল থেকে ফিরেছে। আমরা কারো খবর নিতে পারিনি। আমার মেয়ে এখনো কারো সাথে কোনো কথা বলছে না। সেদিন ঠিক কী ঘটেছিল সেটা জানতেই রঞ্জনার কাছে ছুটে আসা।”
অমরেশ বাবু দোতলার সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বললেন,“ ও তো এখানে নেই। এত বড় আঘাত সহ্য করতে পারেনি। দিনদিন ডিপ্রেশনে চলে যাচ্ছিল তাই ওর মা ওকে নিয়ে ব্যাঙ্গালোরে ওর মাসির বাড়ি গেছে। ওখানে ওর মাসির ছেলে মেয়ের সাথে একসাথে থাকবে। তাতে যদি ওর মনটা ভালো হয়ে যায়।”
দু’জনেরই মুখ শুকিয়ে গেল। আশার আলোটাও ক্ষীন হয়ে আসছে।
সবিতা দেবী বললেন,“ আচ্ছা,একটা কথা জানতে পারি?”
সমরেশ,“ নিশ্চয়ই। বলুন।”
“ আপনার বাড়ি থেকে ওরা কখন বেরিয়ে ছিল?”
সমরেশ ভ্রু কুঁচকে,“ আমার বাড়ি থেকে! আমার বাড়ি থেকে কেন বেরোবে? ওরা তো আমাদের এখানে আসেনি। ওরা তো দিঘা থেকে ফিরছিল।”
সবিতা দেবী,“ রাতে ওদের গাড়ি খারাপ হয়ে গেছিল?”
“ কেন গাড়ি খারাপ হবে! ললিতের নতুন গাড়ি ছিল। খারাপ হবার কথা নয়। ওরা তো সবাই মিলে দীঘা গেছিল। কেন আপনারা জানেন না?”
সুখেন বাবু কথাটা ঘুরিয়ে দিয়ে বললেন, “ আসলে আপনার বাড়ি ওখানে তাই ওরা ফেরার সময় হয়তো আপনার বাড়ি থেকে গেছে।”
“ না না। ওরা দীঘা থেকে সরাসরি কলকাতা ফিরছিল। ললিতের একটা জরুরী মিটিং ছিল পরের দিন ওরা কোলাঘাটের ওখানে লাঞ্চ করেছিল, তারপরে তো সব শেষ হয়ে গেল। ”
সবিতা বলল,“ ললিত! ললিত কে?”
“ আমার বন্ধুর ছেলে। ওরা বোম্বে থাকে। ওখানেই ওদের ব্যবসা। ব্যবসার কাজে এখানে এসেছিল। তারপরে এই ঘটনা। ওর মা তো কিছুতেই এই ঘটনা মেনে নিতে পারছে না। বারবার অসুস্থ হয়ে নার্সিংহোমে ভর্তি হচ্ছে। এখানে এসে এমন একটা ঘটনা ঘটাবে আমরাও ভাবতে পারিনি।”
দোতলা থেকে ঝনঝন করে একটা কাঁচ ভাঙার শব্দ ভেসে এল – –
অমরেশ তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। হাতজোড় করে বললেন,“ আমাকে একটু বেরোতে হবে। রঞ্জনা আসলে আমি আপনাদের খবর দেবো।”
বাইরে বেরিয়ে দু’জনেই খানিকক্ষণ চুপ করে রইলো। হতাশা কুয়াশার মতো ঘিরে ধরেছে। রাস্তাটা পেরিয়ে চায়ের দোকানে বসে পড়লেন। অমরেশ এক গ্লাস জলও দেয়নি। গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেছে। সবিতা একটা জলের বোতল নিয়ে খানিকটা গলায় ঢাললো।
সবিতা বয়স্ক দোকানদারকে চিনি ছাড়া দু’কাপ চা সাথে দু’টো বিস্কিট দিতে বলল।
চা খেতে খেতে দোকানদারকে জিজ্ঞাসা করল,“ দাদা এখান থেকে এয়ারপোর্ট বা ধর্মতলা বাস পাওয়া যাবে?” দোকানদার বললেন,“ হ্যাঁ,এখান থেকেই পাবেন। আপনারা কোথা থেকে আসছেন?”
সুখেন বাবু বললেন, “এয়ারপোর্টের কাছাকাছি।”
“ আপনারা কি ইঞ্জিনিয়ার বাবুর বাড়িতে এসেছিলেন?”
সবিতা,সুখেন দুইজন দু’জনের দিকে তাকিয়ে রইলেন! সবিতা বললেন,“ অমরেশ বাবুর বাড়ি এসেছিলাম। ওনার মেয়ে আর আমার মেয়ে একসাথে ইউনিভারসিটিতে পড়ে।”
“ ওনার কথাই বলছি। উনি তো এই পাওয়ার প্লান্টের ইঞ্জিনিয়ার। মেয়েটার কি কপাল! হবু বর অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল।”
সুখেন বাবু,“ কি বললেন ? মেয়ের হবু বর!”
“ আরে হ্যাঁ। মাস তিনেক আগে দীঘা থেকে ফেরার পথে কোলাঘাট পেরিয়ে সাংঘাতিক একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়। আর তাতেই তো ওনার বন্ধুর ছেলে মারা যায়। মেয়েকে নামিয়ে বন্ধুবান্ধবদের নিয়ে কলকাতা ফিরছিল আর তারপরেই এই দুর্ঘটনা ঘটে।”
সবিতা বিস্ময়ের সাথে বলে,“ তবে যে বললো ওরা এখানে সেদিন আসেনি।”
ক্রমশঃ