সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে কৌশিক চক্রবর্ত্তী(পর্ব – ৬)

কেল্লা নিজামতের পথে
মুর্শিদকুলী যে জাতে হিন্দু ব্রাহ্মণ তা আগেই বলেছি। কিন্তু কপালের ফের। তাই তাঁর মনে সবসময়ই একটা ঘোরতর গোঁড়া মুসলিম হয়ে ওঠার লড়াই কাজ করত। জন্মগত ভাবে ইসলাম ধর্মাবলম্বী না হওয়ায় সবসময় ভাবতেন গোঁড়া মুসলিম সমাজ হয়ত তাঁকে সম্ভ্রান্ত চোখে নেয় না। এ এক মানসিক পীড়া। আবার হিন্দু সমাজও কখনো জাতিভ্রষ্ট হিন্দুকে মেনে নেবে না। তাই তাঁর আর হালে পানি নেই৷ কোন কুলই যেন তাঁর আপনার নয়। কিন্তু এসবই তাঁর ভ্রান্ত ধারণা। আর সেই মানসিক বিকার থেকেই তাঁর মধ্যে জাঁকিয়ে বসে নিজেকে ধর্মপ্রাণ মুসলিম প্রমাণ করার তাগিদ। হিন্দু জমিদারগণ ঠিক সময়ে জায়গীর না দিলে ছেড়ে কথা বলবার মানুষ তিনি নন। কিভাবে জায়গীর আদায় করতে হয় তা তাঁর চেয়ে ভালো কেউ জানেনা।
যাই হোক একটা গল্প বলা যাক। বাদশার সালতানতের দখলে থাকা দাক্ষিণাত্য ঘুরে জাইগীর মুর্শিদকুলী তখন বাংলায়। আগেই বলেছি মোঘল দরবারের নিয়োগপত্র হাতে নিয়ে সেই সময় ঢাকা থেকে বাংলার নবাবি করছেন বাদশা ঔরঙ্গজেবের নাতি সুলতান আজীমুদ্দিন ওরফে নবাব আজীমউশ্বান। হুগলীতে আবার মুলত বিদেশী নাবিকদের ওপর নজরদারির জন্য মুঘল দরবার থেকে পুরোদস্তুর নিয়োজিত আছেন একজন ফৌজদার। নাকের ডগায় ইংরেজ এবং পর্তুগীজ কুঠি। ইউরোপীয়দের বাড়বাড়ন্তের সীমা নেই। সোনার বাংলায় তারাও যেন দখলের লড়াইতে নেমে পড়েছে। নামেই বাণিজ। আসলে সকলেই এক একটা নিজস্ব দুর্গ জাঁকিয়ে বসেছে। সকলেই যে যার মত চেষ্টা করছে বাণিজ্যের দখল নিতে। এই রাজনৈতিক অবস্থায় বাদশার দক্ষ সিভিল অফিসার মুর্শিদকুলী শুরু করলেন নজরে পড়ার মত কাজ। কেন্দ্র সেই মুর্শিদাবাদ। স্থানীয় হিন্দু জমিদারদের থেকে অত্যাচার করে আদায় করা শুরু করলেন সীমাহীন কর। শান্তিতে নিজেদের এস্টেট সামলানো জমিদারদের সে এক অপ্রত্যাশিত অশান্তি। খাজনা না পাঠালে নবাবী তলব আর শাস্তি মুর্শিদাবাদের জেল৷ সেই অযথা ঝামেলা আর কে চায়। আর সেইসব খাজনার প্রায় সবটাই রূপোর টাকায় গরুর গাড়ি চাপিয়ে প্রতি বছর পাঠানো চললো দিল্লীতে বাদশার দরবারে। সেযুগের হিসাবে অংকটা এক কোটি পর্যন্তও পৌঁছেছিল। বাদশার কাছে মুর্শিদকুলী তখন নায়ক। কিন্তু এদিকে হল মহা বিপদ। বাংলার সব রূপো টাকা চলে যেতে লাগলো বাদশার হাতে। আর শেষ বয়সের সত্তর পেরনো বাদশা তখন অসম্ভব ব্যস্ত দক্ষিণে যুদ্ধ নিয়ে। তাই যথারীতি মুর্শিদকুলী হয়ে উঠলো বাদশার প্রিয় অফিসার। যদিও সাহেনশা প্রথম থেকেই তাঁর কাজে যারপরনাই খুশি ছিলেন। আর সেই ভরসাতেই তাঁকে অনেক আশা নিয়ে বাংলায় পোস্টিং দেয়া। তবে বাংলার সাধারণ মানুষ আর জমিদারদের হাত প্রায় শূন্য। অগত্যা উপায় না থাকায় তখন বেশিরভাগ কেনাবেচাই হতে থাকলো কড়ির মাধ্যমে। রূপোর মুদ্রা ডুমুরের ফুলে পরিণত হল। আজকের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে ব্যাখ্যা করলে মুদ্রার অবমূল্যায়ন বেশ চোখে পড়ার মতন। কিন্তু চাহিদা অনুযায়ী কড়ির মূল্যে বাজার নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় জিনিসপত্রের দামও বেশ কমতে লাগলো পাল্লা দিয়ে। শোনা যায় নবাব ইব্রাহিম খাঁ’র সময়ে এক আনায় আটমণ চাল পাওয়া যেত এই বাংলায়। পরে নবাব সরফরাজ খাঁ’র আমলেও বাজারমূল্য ভীষণ কমে গেছিল। আর সেই থেকেই আমাদের মুখে মুখে টাকাকড়ি শব্দটা প্রচলিত হয়ে ওঠে।
বাজারদর কেমন ছিল শুনবেন নাকি? শোনা যায়, নবাব সুজাউদ্দিনের সময়ে টাকায় আট মণ চাল পাওয়া যেত। শায়েস্তা খাঁয়ের পরে এই সময়েই বাংলার বাজারদর সবথেকে শস্তা হয়।
এসব আজকের কথা নয়৷ কিন্তু মুর্শিদাবাদ কথা বলে। নিজের মত করে কানে কানে বলে যায় কত কথা। যেমন নিজামতের আশেপাশে খুঁজে খুঁজেও যখন নবাব মুর্শিদকুলীর সমাধি বের করতে পারলাম না, তখন কিছুটা ভাবতে বসলাম বৈ কি৷ খোসবাগে নবাব সিরাজ, আলীবর্দি খাঁ, জাফরাগঞ্জে মীরজাফর ও তাঁর পরিবার, সবই প্রকাশ্য দিবালোকের মতন পরিস্কার৷ কিন্তু কোথায় বাংলার প্রথম স্বাধীন নবাব? কোথায় নিশ্চিন্তে শুয়ে আছেন তিনি? শেষে খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছলাম কাটরা মসজিদ। নবাব মুর্শিদকুলীর নিজহাতে তৈরি একমাত্র মসজিদ যা আজও অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে মুর্শিদাবাদের বুকে৷ সেখানে গিয়েও নবাবের সমাধিস্থল খুঁজতে গিয়ে খানিক বেগ পেতে হল। অদ্ভুত ভাবে তিনি আজও শুয়ে রয়েছেন মসজিদের মুল সিঁড়ির ঠিক নীচে, যেখান দিয়ে হেঁটে উঠে যান হাজার হাজার ধর্মপ্রাণ মানুষ। রাজকীয় নবাবের এ কেমন সমাধি গ্রহণ! কিন্তু পুরোটাই তাঁর ইচ্ছের ফল৷ ধর্মপ্রাণ গোঁড়া মুসলিম নবাব মৃত্যুর পর থাকতে চেয়েছিলেন অনাড়ম্বর। থাকতে চেয়েছিলেন অসংখ্য মুসলিম ভক্ত পীড়ের পায়ের ঠিক নীচে। এতটুকু অমান্য করা হয়নি তাঁর শেষ ইচ্ছে৷ নীচু হয়ে হাঁটু গেড়ে বসলে দেখা যায় শায়িত নবাবের সমাধিটি৷ আশ্চর্য এক সমাপতন। জামাই সুজাউদ্দিন ছিলেন উডিষ্যার শাসনকর্তা। মৃত্যুর পর তাঁর হাতেই তামাম বাংলার দায়দায়িত্ব ছেড়ে কি স্বস্তিতে ছিলেন নবাব মুর্শিদকুলী? এ প্রশ্ন যেন আজও তাড়া করে বেড়ায় মুর্শিদাবাদের আকাশে বাতাসে। কেউ এসে বলে যায়, নবান, আর স্বাধীন ছিল না তোমার বাংলা। তুমি জানতেও পারোনি, ইংরেজ আগ্রাসন কেড়ে নিয়ে গেছে অনেক প্রাণ। বদলে গেছে তোমার শহর৷ আর আমূল বদলে গেছে বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট।