সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে রীতা পাল (পর্ব – ৬)

যাও পাখি দূরে

“সেই বাড়ী ফিরল কিন্তু জীবন্ত লাশ হয়ে!”
“ চুপ করো। এভাবে বলো না সবিতা। ও আমাদের একমাত্র মেয়ে। সব ঠিক হয়ে যাবে। দেখো,আজ রাতে ডাক্তারের সাথে কথা বলবো এবোরশন নিয়ে।”
“ কি বলছ?”
“ ঠিকই বলছি সবিতা । একটা ভুলের মাশুল সারা জীবন ও কেন দেবে? আসল ঘটনা আমাকে জানতেই হবে। এই শোনো,পুলিশ যে নাম্বার গুলো পাঠিয়েছে দেখতো তার মধ্যে রঞ্জনার নাম্বার আছে কিনা? দরকার হলে কোলাঘাটে যাব। সেদিন রাতে ঠিক কী ঘটেছিল আমাকে জানতেই হবে।”সবিতা দেবী হতাসার সুরে বললেন,
“ কাল,সন্ধ্যা এসেছিল। আমি ওকে সব বলেছি। দেখি ও কি করে? ওর ছেলের জন্যই তো!ও তো অলকের সাথেই মেলামেশা করতো।”
“ সঠিক ঘটনা আমরা কেউ জানি কি সবিতা! যে জানে,সে নির্বাক। আমাদের হুট করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।”
“ এ কেমন পরীক্ষায় ফেললে ভগবান!”
বমির শব্দে দু’জনেই কুমারীর ঘরের দিকে ছুটলেন। আয়া দিদি পরম যত্নে কুমারীর বুকে হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। সবিতা দেবী তাড়াতাড়ি জল নিয়ে এলেন। কুমারীর মুখ ধুইয়ে আস্তে আস্তে শুইয়ে দিলেন। এমন সময় সুখেন বাবুর মোবাইল ফোনটা বেজে উঠলো।
“ হ্যাঁ,ডাক্তারবাবু বলুন।”
“ আমি গাইনোকোলজিস্টের সাথে কথা বলেছি। উনি পরিষ্কার জানিয়েছেন এই অবস্থায় এবোরশন করা যাবে না। এমনিতেই ওর নার্ভাস সিস্টেম খারাপ অবস্থায় আছে। তার উপর এত বড় অপারেশন হয়ে গেছে। মাসখানেক না গেলে কিছুই করা যাবে না। তবুও আমি বলেছি ওকে একবার দেখতে। তারপর সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে।”
“ ডাক্তার বাবু,আপনি তো সবই জানেন। মেয়ের বাবা হয়ে আমি হাতজোড় করে বলছি, এই বিপদ থেকে আপনারাই পারেন ওকে রক্ষা করতে। ও নিজেই অসুস্থ। কথা বলে না। তার উপর এই বোঝা,ও সামলাবে কি করে?”
“ সব বুঝতে পারছি। আপনারাও জানেন আমরা ওর জন্য কত লড়াই করছি। এক সময় আমাদের মেডিকেল টিম ভাবতো হয়তো ও আর ভালো হবে না। ব্রেইন অপারেশনের পর সাতদিন তো একদম মরার মতন পড়েছিল। কিন্তু তার পর আস্তে আস্তে রেসপন্স করতে থাকে। আমরা প্রবল উদ্যমে ট্রিটমেন্ট শুরু করি। আবার মেডিকেল টিম বসানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। দেখি কি হয়? ভগবানের উপর ভরসা রাখুন।”
ফোনটা কেটে যেতেই পেছন ফিরে দেখেন সবিতা দেবী দাঁড়িয়ে সব কথা শুনেছেন। সবিতা দেবীর মাথায় হাত রেখে বললেন,“ শক্ত হও সবিতা। ও ভালো হয়ে যাবে। ও আবার নাচ করবে,গল্প করবে,মা মা বলে জড়িয়ে ধরবে,দেখো।” কান্না আর চাপতে পারলেন না। বাচ্চাদের মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলেন। সবিতা দেবী স্বামীকে এতটা ভেঙে পড়তে আগে কখনো দেখেননি। দাঁতে দাঁত চেপে মেয়ের জন্য লড়াই করে গেছেন। কিন্তু আজ চোখের জল আর বাঁধ মানছে না। সবিতা দেবী আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছতে মুছতে বললেন,“ আমরা তো কখনো কারোর ক্ষতি করিনি দেখো,আমাদের মেয়ে ঠিক সুস্থ হয়ে উঠবেন। ও আবার মা বলবে,দেখো।”

দু’দিন ধরে অলক এত ব্যস্ত যে সন্ধ্যা ছেলেকে বলবে বলবে করেও বলতে পারেননি। আজ ডিনার টেবিলে কথা বলবে ঠিক করেছেন কিন্তু কিভাবে যে শুরু করবেন সেটা ঠিক বুঝতে পারছেন না। দু’বছর আগে সন্ধ্যা স্বামীকে হারিয়েছেন। ছেলেকে সব কথা বলেন। আজ ঐ কথা বলতে গিয়েও বলতে পারছেন না। অলোক খেতে-খেতে অনেকক্ষণ ধরেই মাকে লক্ষ্য করছিল। নিজেই বললো,“ মা,তুমি কি কিছু বলবে?”
“ হ্যাঁরে,কিন্তু কোথা থেকে শুরু করব ঠিক বুঝতে পারছি না।”
“ তুমি কি কুমারীর ব্যাপারে কিছু বলতে চাও? ওদের বাড়িতে তো সেদিন গেছিলে কি কথা হলো?”
“ বাবু,দু’বছর হলো তোর বাবা চলে গিয়েছেন। তুই আমার সব। যদি কোন ভুল হয়ে থাকে তার জন্য মেয়েটা একা কেন শাস্তি পাবে? আমরা সবাই সাহায্য করলে ও আবার স্বাভাবিক জীবন ফিরে পাবে। তাই না,বল?” “ আমিও তো তাই চাই মা। ও সুস্থ স্বাভাবিক হয়ে আগের মত হয়ে হয়ে উঠুক। ওটা একটা এক্সিডেন্ট, মা। ভুল বলে কষ্ট পাওয়ার কোন মানে হয় না। ও শকটা ভুলতে পারছে না তাই হয়তো কথা বলছে না। পা টা ঠিক হলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“ বাবু,একটা জিনিস কি করে ঠিক হবে? কুমারী প্রেগনেন্ট!

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।