ক্যাফে ধারাবাহিকে সুকুমার রুজ (পর্ব – ১)

ম্যারিটাল প্লাস্টার

এক
বুবাই হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢোকে — হোয়াটস দ্য প্রবলেম টুকুন? সাত-সকালে আড়াইশো কিলোমিটার দৌড় করালি!
বলছি দাদা বলছি, আগে বস তো! তুই বেরোনোর পর স্কাইপে বউদিকে সব বলেছি। তুই এতটা রাস্তা ড্রাইভ করে আসছিস ব’লে তোকে আই-ফোনে বলতে চাইনি।
এখন তো আর ড্রাইভ করছি না, এখন দয়া করে বলো সিস্টার! তোমাদের ‘মিঞা-বিবি কিস্যা’ নাকি! আমাকে আবার ক্যালিফোর্নিয়া ফিরতে হবে। আজ অফিসে বোর্ড-মিটিং আছে।
হবে না।
কী হবে না?
বোর্ড মিটিং?
কেন?
তুই তো এক্সিকিউটিভ বডি-মেম্বার! তোকে ছাড়া মিটিং হবে কী করে?
আমাকে ছাড়া…! মানে হোয়াটস রং? টেনশন দিস না। একটু ক্লিয়ার কর।
আমাদের দু’জনকে এখুনি ইন্ডিয়ার ফ্লাইট ধরতে হবে। নেট থেকে টিকিট নিয়ে নিয়েছি।
মানে! কেসটা কী?
আওয়ার মাদার …!
এক্সপায়ার্ড এই তো! উফস! মা সারাজীবনে কোনোদিনই টাইম অ্যাডজাস্ট করতে পারল না। আর দু’দিন পরে এক্সপায়ার্ড হলে কী ক্ষতিটা হত।
ওহ! দাদা, এক্সপায়ার্ড নয়, ‘এক্স-টায়ার্ড’ বলা যেতে পারে। কথাটা শোন আগে!
‘এক্স-টায়ার্ড’ মানে?
মানে, বাবার সঙ্গে মা দীর্ঘ একচল্লিশ বছর সংসার করে এক্সট্রিমলি টায়ার্ড হয়ে পড়েছে। তাই দু’জনে এখন মিউচুয়াল-ডিভোর্সের জন্য অ্যাপিল করেছে। আগামী পরশুদিন বুধবার দুপুর বারোটায় ফ্যামিলি-কোর্টে জজের চেম্বারে ‘ইন-ক্যামেরা ট্রায়াল’ আছে। ডাক্তারকাকু আলাদাভাবে দুজনকে অনেক বুঝিয়ে ম্যানেজ করতে পারেনি। তাই ফোন করে ইমিডিয়েট যেতে বলল।
কী বলছিস তুই? ছেষট্টি বছরের মা বাহাত্তর বছরের বাবাকে ডিভোর্স করবে?
হ্যাঁ, ডাক্তারকাকু তো তাই বলল।
কেন?
তা কী করে জানব? গিয়ে সব শুনব। দেরি না করে রেডি হয়ে নে দাদা। অফিসে জানিয়ে দে, ফাদার বা মাদার এক্সপায়ার্ড… এমন একটা কিছু। সাড়ে বারোটায় ফ্লাইট।
না না, ইটস কোয়ায়েট ইমপসিবল! আজকের বোর্ড-মিটিংটা খুব ভাইটাল।
দাদা, তুই বুঝছিস না! তার চেয়ে এটা বেশি ভাইটাল। তুই ঠান্ডা মাথায় ভাব একবার! টাকা পাঠানো ছাড়া এজেড মা-বাবার আর কোন দায়িত্ব আমরা পালন করি? ওদের দেখাশোনা করা আমাদের ডিউটি। কিন্তু আমরা এখানে। কলকাতায় ওরা দু’জন একে অপরকে দেখাশোনা করে। এই বয়সে ওরাই যদি আলাদা হয়ে যায়, তাহলে দু’জনের কেউই আর বাঁচবে না।
কিন্তু আমরা এখান থেকে কয়েকদিনের জন্য গিয়ে কি ওদের মিউচুয়াল ডিভোর্স আটকাতে পারব?
আমরা অন্তত দু’জনকে বোঝাতে পারব। যা নিয়ে প্রবলেম ক্রিয়েট হচ্ছে, সেটাকে এলিমিনেট করার চেষ্টা করব। তাছাড়া তুই হিসেব কর, একবছর হয়ে গেল আমরা দু’জনের কেউই কলকাতায় যাইনি। আমরা গেলে সব ঠিক হয়ে যেতে পারে।
ঠিক আছে, কলকাতায় যাইনি, যাওয়া যাবে। সেটা আজই কী করে সম্ভব? নেক্সট উইকে ছুটি-টুটি গ্র্যান্ট করে নিয়ে যাওয়া যাবে।
দাদা, তুই বুঝছিস না। ডাক্তারকাকু অহেতুক আমাদের ফোনে ডিসটার্ব করেন না। নিশ্চয় ক্রিটিক্যাল সিচ্যুয়েশন অ্যারাইজ করেছে তাই…। এর মধ্যে মান-অভিমানে যদি দু’জনের কেউ একজন সুইসাইড করে বসে, তখন কী হবে বল তো! নিজেকে ক্ষমা করতে পারবি?
টুকুন, তুই না সবসময় সেন্টু দিস। আমেরিকায় বসবাস করবি আর ইন্ডিয়ার সেন্টিমেন্ট চেরিস করবি, ইটস হরিবল!
এখন তুই হরিবল বলছিস ঠিকই। কিন্তু বাই চান্স যদি ওদিকে হরিবোল ধ্বনি ওঠে, তুই তখন আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারবি না। আমি তো তোকে জানি। মা-মা করে তুই পাগল। সেই মায়ের যদি কিছু হয়ে যায়…!
আসল কথাটা বল না টুকুন। বাবার জন্য তোর মন খারাপ করছে। এখন একটা প্রিটেক্সট পেয়েছিস, ব্যস! নেচে উঠেছিস!
দাদা, তুই আরগুমেন্ট করবি, না একটু সিরিয়াস হবি! ওদিকে ফ্লাইটের টাইম হয়ে আসছে।
আচ্ছা, ডাক্তারকাকু কী বলেছে, আমাকে একটু খুলে বল তো!
যা বলেছে বললাম তো! মিউচুয়াল ডিভোর্সের অ্যাপিল। পরশুদিন হিয়ারিং…।
ওহ বোগাস! এসব তো এসেই শুনলাম। হোয়াট ইজ দ্য কজ? কারণ কিছু বলেছে?
না, ফোনে এতসব ডাক্তারকাকু জানাবে ভাবলি কী করে! কলকাতা থেকে এই টোরেন্টোতে এক মিনিট কথা বলতে কত বিল ওঠে জানিস তো! ডাক্তারকাকু যা কঞ্জুস!
ঠিক আছে, তুই কল-ব্যাক করতে পারতিস! ও কে, নাম্বার বল!
কিসের?
আরে বাবা! ডাক্তারকাকুর ফোন নাম্বার বল!
তুই এখন ফোন করবি?
হ্যাঁ।
এখন ওখানে বাজে রাত সাড়ে এগারোটা। ডাক্তারকাকু এখন ঘুমিয়ে রয়েছে। আর তুই…! শোন! তুই নাম্বার দে!
কার?
তোদের বস-এর?
কেন?
তুই তো বলতে ভয় পাচ্ছিস! আমিই ফোন করে জানিয়ে দিচ্ছি।
কী বলবি?
বলব ফাদার ইজ সিরিয়াসলি ইল।
তোর মাথাটা গেছে। তুই জানিস না, পেরেন্টস-ইলনেসকে কোনও প্রায়রিটি দেওয়া হয় না।
তাহলে বলব, রিয়া, মানে তোর বউ ইজ সিরিয়াসলি ইল। নিড টু অ্যাডমিট হেলথ সেন্টার ইমিডিয়েটলি।
ঠিক আছে, তুই যখন ডিটারমাইন্ড যে যাবিই, তখন আর…।
দ্যাখ দাদা, তুই আননেসেসারি রাগ করছিস। বাবা-মায়ের বয়স হয়েছে। যে কোনও মুহূর্তে যা কিছু ঘটতে পারে। আমাদের এখন গেলেও যেতে হবে, পরে গেলেও যেতে হবে।
ঠিক আছে, ঠিক আছে। আর ব্রেন ওয়াশের দরকার নেই। তোর বউদিকে জানিয়ে দে। আমি অফিসে ম্যানেজ করছি।
তোর চিন্তা নেই দাদা। বউদিকে যা বলার বলে দিয়েছি। তোর ভগ্নিপতিকেও মেল করে দিলাম। তোর যা যা দরকার প্যাক করে নে এখান থেকে।
ফ্লাইট ক’টায়?
সাড়ে বারোটায়।
তাহলে তো আধঘন্টার মধ্যেই বেরোতে হবে।

দুই
বুবাই আর টুকুন বুধবার সকাল ন’টা নাগাদ দমদমে ল্যান্ড করল। লেক গার্ডেন্সের বাড়িতে যখন পৌঁছল, তখন বেলা দশটা বেজে চৌদ্দ মিনিট। বাড়িতে ঢুকে দেখে, বাবা ও মা দু’জনেই বেরোনোর জন্য প্রস্তুত হচ্ছে। ডাক্তার-কাকু নিষেধ করায় বাবা-মা-কে জানায়নি যে ওরা আসছে।
মা অনুরাধা ওদেরকে দেখে ভূত দেখার মতো চমকে ওঠেন — কী রে! তোরা কোত্থেকে?
বুবাইয়ের কৌতুক মেশানো গলা— আকাশ থেকে।
হঠাৎ কোনও খবর না দিয়ে?
টুকুনের গলায় শ্লেষ — আসতে হল। ছেলেমেয়ের কর্তব্য। এই বয়সে তোমরা একে অপরকে ছেড়ে দেবে। দাঁড়িয়ে থেকে তার ব্যবস্থা করে দিতে হবে, তাই আসতে হল।
ঘরের ভেতর ধুতির কোঁচা গুঁজতে-গুঁজতে অনিমেষ গজ-গজ করতে থাকেন — ব্যাটা ডাক্তারকে বন্ধু ভাবতাম। ওটাই হল পয়লা নম্বর শত্রু! নিশ্চয় ও ফোন করে …। এরপর অনুর হাতের চা খেতে আসুক এ-বাড়িতে, অনুকে পরিষ্কার বলে দেবো, শত্রুকে চা দেবে না!’
অনিমেষ বিড় বিড় করে কথাটা বলার পরেই ভাবেন — আচ্ছা! ডিভোর্স হয়ে গেলে অনুরাধা তো ওর কথা শুনতে বাধ্য থাকবে না! ওকে হুকুম করার অধিকারও বোধহয় থাকবে না। তাছাড়া ডিভোর্স হয়ে গেলে তো একসঙ্গে এক বাড়িতে থাকার প্রশ্নই নেই। অনু থাকবে এ-বাড়িতে, আর ও নিজে গল্ফ গ্রীনের ফ্ল্যাটে।
টুকুন ঘরে ঢুকে কোঁচা-সামলাতে থাকা বাবাকে ঢিপ করে একটা প্রণাম করে বলে — বাবা! তোমার নিশ্চয় বাহাত্তর চলছে।
বাহাত্তর চলুক আর বাহান্ন চলুক, ডিসিশন ইজ ডিসিশন।
বাহান্নতে তো আর বাহাত্তুরে ধরে না। আর বাহাত্তুরে না ধরলে এমন সব উদ্ভট ডিসিশন কেউ না।
হোয়াট ডু য়্যু মিন বাই উদ্ভট? যে মানুষটা একচল্লিশ বছর ধরে রান্নাবান্না করে খাওয়ালো। সে হঠাৎ রান্না করে খাওয়ানো বন্ধ করে দিল, সেটা উদ্ভট নয়? যে মানুষটা এতদিন একসঙ্গে এক বিছানায় কাটাল, সে হঠাৎ বিছানা ছেড়ে ঘরের মেঝেয় অন্য বিছানায় শোওয়া শুরু করল। সেটা উদ্ভট নয়!
ওদিকে অনুরাধার শাড়ি পরা হয়ে গেছে। উনি ছেলেকে হাতের ইশারায় কাছে ডেকে নেন — তোরা যতই বলিস, আমি আর ওই মানুষটার সঙ্গে সংসার করতে রাজি নই। শুনছিস তো …!
কেন? কী এমন সমস্যা হল যে …।
আরে! ও আমাকে মেরে ফেলবে।
বাবা তোমাকে মেরে ফেলবে! কেন?
আরে বাবা! জানিস তো আমি হাইপার-টেনশনের রোগী। রাতে ভালো ঘুম না হলে ব্লাড-প্রেসার বেড়ে যায়। প্রেসার বেড়ে গেলে সেরিব্রাল অ্যাটাক হতে পারে। আর সেরিব্রাল অ্যাটাক হলে আমি বাঁচব?
মা, বুঝলাম না, বাবা তোমাকে কীভাবে মেরে ফেলবে!
আরে বাবা! সারারাত ধরে কেউ যদি মোষ ডাকার মতো নাক ডাকে, তাহলে কি ঘুম হয়?
না, কখখনো হয় না। মোষ-ডাকার মতো না ডেকে যদি ছাগল ডাকার মতো ডাকত, তা হলেও না হয় …।
না, তা হলেও হত না। আমার ঘুম পাতলা যে! একটু শব্দ হলেই ভেঙে যায়। তাছাড়া সবসময় খুব সজাগ হয়ে ঘুমোই তো! ও তুই বুঝবি না। যে বুঝবে, সে তো এসে একটা কথা বলেই বাপের সোহাগ খেতে গেল।
বাইরে থেকে ঘনঘন গাড়ির হর্ন শোনা যাচ্ছে। ড্রাইভার ছেলেটা গাড়ি বের করে তাগাদা দিচ্ছে। হর্ন শুনে অনিমেষের চোখ যায় ঘড়িতে — আরে! ঠিক বারোটায় কোর্টে হাজির হওয়ার কথা। আর মাত্র একান্ন মিনিট বাকি। তোরা এসে বক বক করে অনেকটা সময় নষ্ট করে দিলি। এসেছিস, একপক্ষে ভালই হয়েছে। তোদেরকে খবরটা দিতেই হত। যা মা, তোরা সেই দূর-দেশ থেকে এলি। ফ্রেশ-ট্রেশ হয়ে, খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নে। আমরা কোর্ট থেকে ঘুরে আসছি। তুই তো তবু বাবা… বলে এসে প্রণাম করলি! মায়ের আদরের দুলাল সেটুকু করারও সময় পেল না। মায়ের কাছে গিয়ে গুজুর-গুজুর ফুসুর-ফুসুর শুরু করেছে। যদিও ওর কোনও দোষ নেই। মায়ের কু-মন্ত্রণাতেই ছেলেরা বিগড়োয়।
এ কথার মাঝে বুবাই বাবার ঘরে ঢোকে — কে কাকে বিগড়ালো বাবা?
অনিমেষ আমতা আমতা করেন— এই বন্ধুবেশী শত্রুদের কথা বলছি। ডাক্তার সরখেলকে যতটা ভালো ভেবেছিলাম ঠিক ততটা ভালো নয়।
হ্যাঁ, আমারও তাই মনে হয় বাবা।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।