ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৭৫)

সুমনা ও জাদু পালক
লাল কাপড়ের মোড়ক খুলতেই ভিতর থেকে বেরিয়ে এলো অপূর্ব কারুকার্যমণ্ডিত হাত খানেক লম্বা একটি সুবর্ণ নির্মিত দণ্ড। দণ্ডটির মাথায় একটি মস্ত বড় শুভ্র কান্তি রৌপ্য নির্মিত তারকা লাগানো। দণ্ডটির গায়ে বিভিন্ন আকৃতির, বিভিন্ন বর্ণের মূল্যবান পাথর লাগিয়ে দণ্ডটির সৌন্দর্য বাড়ানো হয়েছে।
সুবর্ণ দণ্ডটির গা থেকে হালকা নীলাভ আলো বিচ্ছুরিত হচ্ছে।
খুবই অবাক হল সুমনা।কী ওটা ? জাদুকর হূডু বাইরে যাবার সময় নিশ্চয়ই তার জাদুদণ্ডটি সঙ্গে নিয়ে বেরিয়েছে। তাছাড়া সেটা ফটোর পিছনে ওভাবে লুকিয়ে রাখার কোন প্রশ্নই নেই। তবে এটা ঠিক যে ,এই দণ্ডটি অত্যন্ত মূল্যবান জিনিস। আর সেটা সাধারণের চোখে পড়ুক এটা দুষ্টু জাদুকর চায়না। তবে কি ওটা পরীরানীর জাদুদণ্ড? তাই হবে হয়তো। এটাকে কিছুতেই আর এখানে রাখা চলবে না। সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে। তার আগে ফটোটাকে যথাস্থানে রেখে দিতে হবে ,যাতে জাদুকরের কোন সন্দেহ না হয়।
তাছাড়া এক দন্ড সময় শেষ হতে আর বোধহয় বেশিক্ষণ বাকি নেই। অদৃশ্য অবস্থায় না ফিরতে পারলে হূডুর পুতুল কর্মচারীদের নজরে পড়লে একটা হইচই হবে।
ঘরের দেওয়ালে ঝোলানো হাতির দাঁতের তৈরি একটা লম্বা খেলনা দেওয়াল থেকে পেড়ে নিল সুমনা। তারপর সেটাকে লাল কাপড় টা দিয়ে মুড়বে বলে সুমনা যেই মুহূর্তে সুবর্ণ দণ্ডটি হাতে তুলে নিল, সেই মুহূর্তে তার সারা শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। হঠাৎ সুমনার মনে হল, সে যেন অমিত শক্তির অধিকারী।
সুমনা তখন ওই সুবর্ণ দণ্ডটি হাতে নিয়ে মাথায় ঠেকিয়ে বলল, হে সুবর্ণ দণ্ড , আমি জানিনা, আপনি পরী রানীর জাদুদণ্ড নাকি অন্য কোন দেব বা দেবীর অস্ত্র। তবে আপনি যে মহাশক্তিশালী এবং শুভশক্তির আধার এতে আমার কোন সন্দেহ নেই। তাই আপনাকে করজোড়ে প্রণাম জানিয়ে বলি,
আমি এখানে দুষ্টু জাদুকর হূডুর অশুভ জাদু শক্তিকে পরাহত করে পরী রানীকে মুক্ত করতে চাই । আমি উদ্ধার করতে চাই এই পুষ্প নগর রাজ্যের রাজকুমার হিরণ কুমার কে। আমি রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার মা-বাবা ও তাদের রাজ্য সবুজের দেশের সব মানুষকে অভিশাপ মুক্ত করতে চাই।আমি অভিশপ্ত কনকনগর রাজ্যকে আগের রূপে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমি মনে করি,এ সমস্ত কাজই শুভ কাজ। আর তাই আমি প্রার্থনা করি, আমাকে সাহায্য করুন।
কথা শেষ করে সুমনা লাল কাপড়ে মোড়া হাতির দাঁতের তৈরি খেলনাটিকে কুলুঙ্গিতে রেখে , তৈলচিত্রটিকে পূর্বের মতোই দেয়ালে টাঙিয়ে দিল।
এবার ফিরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সুমনা সুবর্ণ দণ্ডটি হাতে তুলে নিল। ওই দন্ডটি হাতে নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুমনার আবার মনে হল সে অমিত শক্তির অধিকারী । শুধু তাই নয়, তার মনে হতে লাগলো, সুবর্ণ দণ্ডটি যেন তাকে আকর্ষণ করছে। কিন্তু কেন? ওই দণ্ডটি কী তাকে কোথাও যেতে বলছে? সুমনা দ্বিধাগ্রস্ত হলো। দণ্ডটি কার দণ্ড? সে কোথায় নিয়ে যেতে চায় তাকে ? কেন নিয়ে যেতে চায় ? বেশি দেরি হলে সে তো আর অদৃশ্য থাকতে পারবে না ।তাহলে?এখন সে কী করবে?
আর সেই মুহূর্তে সে অদৃশ্য কন্ঠ বলে উঠলো,
রাজকুমারী রত্নমালা, এই স্বর্ণদণ্ড তোমাকে যেখানে নিয়ে যেতে চাইছে, সেখানে যাও, শুভ হবে।
সুমনা অনেকক্ষণ পরে অদৃশ্যকণ্ঠের কন্ঠে কথা শুনে বিস্মিত হয়ে বলল, তুমি আছো হে অদৃশ্য কন্ঠ?
—— আছি তো। আমি কখনো তোমাকে ছেড়ে যাইনি। তুমি যখন যে মুহূর্তে রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছ, ঠিক তখনই আমি রাজপ্রাসাদে প্রবেশ করেছি। এখনো পর্যন্ত তুমি সঠিক পথে এগোচ্ছ বলে আমার কোন নির্দেশ দেওয়ার প্রয়োজন হয়নি। তাই চুপচাপ ছিলাম। এখন তুমি দ্বিধাগ্রস্ত বলে আমায় কথা বলতে হল। ওই দণ্ড তোমাকে যেদিকে নিয়ে যায়, সেদিকে যাও। তোমার ভালই হবে।
—- বেশ , তাই হোক।
সুমনার কথা শেষ হওয়া মাত্র ওই স্বর্ণদণ্ড যেন দ্বিগুণশক্তিতে আকর্ষণ করতে লাগলো সুমনাকে। সেই আকর্ষণে অদৃশ্য সুমনা পুতুলের মত হাঁটতে হাঁটতে এক এক করে বারান্দা, সিঁড়ি,
রাজ দরবার পেরিয়ে, দরবার কক্ষের যে দিক দিয়ে সে প্রবেশ করেছিল ,ঠিক তার উল্টোদিকে এসে দাঁড়ালো।
সামনে এক বিশাল দরজা। কিন্তু দরজাটা বন্ধ।
সুমনা দরজাটা খোলার চেষ্টা করলো, পারলো না। তখন সেই স্বর্ণদণ্ড দরজা স্পর্শ করতেই খুলে গেল দরজা। আবার স্বর্ণদণ্ডের পিছনে
চলতে চলতে এক মস্ত বড় বাগানে এসে পৌঁছল সুমন। নানা রকম ফুলের গাছে ভর্তি সে বাগান এখন যেন কেমন শুকনো প্রাণহীন হয়ে পড়েছে।
স্বর্ণদণ্ড সুমনাকে আকর্ষণ করে বাগানের শেষ প্রান্তে একটা মস্ত ঘরের সামনে দাঁড় করালো।
চলবে