সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে উজ্জ্বল কুমার মল্লিক (পর্ব – ৫)

সাদা মিহি বালি

(প্রথম অধ্যায়, ২য় পর্বের পরের অংশ)

রাতে সবাই ঐ পুজো-আট-চালায় আসর জমায়;তাদের ‘মা’, ‘মা’ চীৎকার দূর থেকেও শুনতে পাওয়া যায়। মেইন- রাস্তার পশ্চিম দিকে হচ্ছে আড্ডা; পুব দিকে গঙ্গা নদী ও রাস্তার মাঝে রয়েছে ‘গুয়ে গাঁদার’ জঙ্গলে আচ্ছাদিত কিছুটা উঁচু ডাঙ্গা, তারপরেই নেমে গেছে নদী- খাত। একটু দূরেই রয়েছে আদি ঘোষাল বাড়ির গঙ্গার ঘাট; কোনো কালে
এ ঘাটে সতীদাহ হয়েছিল; সতী- মায়ের মূর্তি রয়েছে। মিউনিসিপ্যালিটি, এ ঘাটে মৃতদেহ সৎকারের ব্যবস্থা করেছে। শব –
যাত্রীদের মধ্যে দ্রব্যগুণের প্রভাবজাত
কারণে, এ অঞ্চল সব- সময়ই মৌ, মৌ করে; একটা ভীতি-জনক অবস্থা, প্রায় সব সময়ই এখানে বিদ্যমান।

নৃপেন্দ্রনারায়ণের ঘেরা জায়গার উত্তরে, মেইন-রাস্তার পাশ দিয়ে একটা মোটামুটি চওড়া
রাস্তা, বটুকেশ্বর মন্দির ছাড়িয়ে ভিতরে চলে গেছে; ঐখানেই রয়েছে হরেকৃষ্ণ ঘোষালের পুরোনো প্রাসাদ। এ প্রাসাদও শরিকদের অনীহায় প্রায় ভগ্নস্তূপ।
এ প্রাসাদের উত্তর পুরুষদের মধ্যে
দু’ আনার অংশীদার হরেকৃষ্ণ নারায়ণের পুত্রদ্বয়, বটকৃষ্ণ ও পশুপতি ঘোষাল এখানে বসবাস করেন। হরেকৃষ্ণ নারায়ণ, বৃটিশ সরকারের অনুগ্রহে, হুগলী নদীতে
বালি তোলার অনুমতি পান। বটকৃষ্ণ ঘোষাল ও পশুপতি, পিতার ব্যবসাকে নিষ্ঠার সঙ্গে বাঁচিয়ে রেখেছেন। জেলা-শাসকের কাছ থেকে টেন্ডার মারফৎ, শ্রীরামপুর হতে ত্রিবেণী পর্যন্ত জলপথ ইজারা নিয়ে বড় বড় নৌকো দিয়ে নদীর বুক থেকে সাদা বালি তুলে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বিক্রয়ের ব্যবস্থা করেছেন। বটকৃষ্ণের চারপুত্র ও এক কন্যার মধ্যে বড় হচ্ছেন এই রাঘবেন্দ্র; কাকা, পশুপতি ঘোষালের চেয়ে প্রায় দশ বছরের ছোট। কাকার খুবই স্নেহপাত্র। কাকা যে কেন অকৃতদারই রয়ে গেলেন, তা ঠারে, ঠোরে অনুমান করলেও, তিনি তা মোটেই সমর্থন করেন না। ঠাকুর-দা হরেকৃষ্ণ নারায়ণ ঘোষাল ও ঠাকুমা নিভাননী দেবী খুবই গোঁড়া ছিলেন;ব্রাহ্মণ্য- জাত্যভিমান এতো ছিল, যে তার জন্য( ্জে্জে্জে্জ্জে্জে্জে্জ) নিজের
পুত্রকেও ত্যাজ্যপুত্র করতে পিছপা ছিলেন না;হয়তো, সেই রকম কোন ঘটনা ঘটেছে, আর কাকা, পশুপতিও ছাদনাতলার দিকে পা বাড়াতে সাহসী হননি।জাত্যভিমান, জগদ্দল পাথরের মত সামনে দাঁড়ায়; না,সে পাথরকে চূর্ণ করে মিহি বালিতে পরিণত করতে পশুপতি সক্ষম হননি।বটকৃষ্ণ ঘোষালের মৃত্যুর পর এই কাকাই, ভাইপো রাঘবেন্দ্র বাবুকে, ব্যবসা চালাতে সাহস জুগিয়েছেন। এখন, তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। মায়ের মৃত্যুর পর, কাকাই, রাঘবেন্দ্রের স্ত্রী
রমনীকে পছন্দ করে, এ সংসারে নিয়ে আসেন;ছোট ভাই অমর ও সবার ছোট, বোন শিবানী, তখন সবে শৈশবে পা দিয়েছে; বলতে গেলে, রমনীই ওদের নিজের পুত্র- কন্যা স্নেহে মানুষ করেছে।

রাঘবেন্দ্রবাবু, একজন উদ্যোগী পুরুষ; উদার প্রকৃতির হলেও, বংশের সামন্ততান্ত্রিক মনোভাব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হতে পারেননি। এটুকু বোঝেন, যে পূর্ব- পুরুষরা, অনেক মানুষের চোখের জল ঝরিয়ে এ সম্পদ করেছেন;বংশের ধারা- বাহিক গুণগুলোকে যথাসম্ভব এড়িয়ে ভাই – বোনেদের মধ্যে আধুনিক চিন্তা ধারায় অনুপ্রাণিত করতে তিনি সচেষ্ট। স্ত্রী, রমনীও স্বামীর পদাঙ্ক অনুসরন করে চলেছেন। প্রত্যেক ভাই, যেন নিজের যোগ্যতায় জীবনে প্রতিষ্ঠিত হয়, যেন কর্মবীর হয়, সেদিকে তাঁর সজাগ দৃষ্টি; থাকলে কী হবে, জ্ঞাতি- বিদ্বেষ যে পিছু ছাড়তে চায় না। অন্যগোষ্ঠীর নীলাদ্রিনারায়ণ ঘোষালের সংগে মেজ- ভাই, শিবশংকরের সম্পর্ক যেন আদায়- কাঁচকলায়। প্রথম, প্রথম ওদের মধ্যে, ঝগড়া-ঝাঁটি, বাক্য- বাণেই সীমাবদ্ধ থাকতো; এখন তা, হাতাহাতি,
বোমাবাজি পর্যায়ে এসে পৌঁছেছে; এ জন্য তিনি খুবই উদ্বিগ্ন।

দেশ, দ্বি- খণ্ডিত হয়ে স্বাধীন হয়েছে। কাতারে কাতারে, উদ্বাস্তু মানুষ, পঃ বাংলায় প্রাণভয়ে ছুটে এসেছে। দেশে, জমিদারি প্রথার বিলোপ ঘটেছে। স্বাধীন দেশের সরকার, ঐ সব ছিন্নমূলীদের পুনর্বাসনের জন্য জমি অধিগ্রহণ করেছে। রাঘবেন্দ্রবাবু, স্বেচ্ছায় নিজেদের উদ্বৃত্ত জমি সরকারকে
দিয়েছেন। সরকারি-মহলে, তাঁর উদ্যোগ প্রশংসিত হয়েছে। শাসক- মহলে, তিনি এখন বিশিষ্ট জন। শাসকের এম- এল- এ নির্বাচনে,
তাঁর ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অতএব, তাঁর ও তাঁর ভাইদের ব্যবসা- উদ্যোগের ব্যাপারে, সরকারি আনুকূল্য অভাবের প্রশ্ন- ই ওঠে না।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।