অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ২৬)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

মাঝে মাঝে মেঘ নামে মনে
নিজেকে ক্লান্ত মনে হয়
কবিজন্ম বলে কিছু আছে ?
মরীচিকা ? শুধু পরাজয় ?
নিঃস্ব মনে হয়
ক্লান্ত মনে হয়…

আজ বেলপাহাড়ির মোড়ে ক্রমশ তেতে ওঠা ফাগুন রোদ্দুরে দেখা হলো অমলেন্দুর দুই প্রিয় কবি প্রলয় ও শুভব্রতর পরষ্পরের সঙ্গে।।ফলের দোকান , ওষুধের দোকান, মানুষের কোলাহল , আর ঝরা পাতাদের‌ সঙ্গে নিয়ে ঘূর্ণিধুলো দুই কবিকে বাধ্য করলো রোদ্দুর বাঁচিয়ে একটা চায়ের দোকানে ঢুকতে । এই বেলপাহাড়ির মোড়ে দাঁড়ালেই যেন একটা দিগন্ত ছোঁয়া আহ্বান ভেসে আসে–চলো বেরিয়ে পড়ি ! একটার পর একটা বাস ঝাড়গ্রাম, মেদিনীপুর থেকে এসে স্টপেজে দাঁড়াচ্ছে । ডানদিকের ‌রাস্তা ফুলকুশমা ছুঁয়ে চলে গেছে বাঁকুড়া শহরের দিকে । বাঁদিকের রাস্তা পাহাড় জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে আমলাশোলের দিকে । সেখান থেকে যেন হাতের নাগালের মধ্যেই ঝাড়খন্ডের ঘাটশিলা।মানে , বিভূতিভূষণের ধারাগিরি ঝর্ণা আর সুবর্ণরেখা নদীর সেই চিরদিনের ঘাটশিলা ! সোজা রাস্তা চলে গেছে পুরুলিয়ার দিগন্তে । চায়ে চুমুক দিতে দিতে প্রলয়ের হাত ধরে শুভ ভাবছিলো , সে তো একটা শান্ত নিরুদ্বেগ জীবন চেয়েছিলো । চেয়েছিলো এই ভরা শিমুল আর তুমুল পলাশের মরসুমে, হৃদয়নন্দনবনে , নিজস্ব নারীর কাঁধে হাত রেখে পাতাঝরা শালজঙ্গলে হারিয়ে যেতে। এই বেলপাহাড়ির মোড়ে এলেই প্রলয়দাকে ডেকে নিয়ে মনের কথা বলতে ইচ্ছে করে। তাদের গ্রামে চায়ের দোকানে বেলপাহাড়ির মতো বেকারির বিস্কুট পাওয়া যায় না। মনে থাকলে বাড়ির জন্য এক প্যাকেট নিয়ে যেতেই হবে।বাড়ির কেউ ওকে , ওর বেকারত্ব নিয়ে খোঁটা না দিলেও , ইদানিং শুভ বন্ধুদের এড়িয়ে চলে । কেন চলে,তার কোনো উত্তর নেই। আচ্ছা , তিরিশ পেরোনোর আগেই নিজেকে সে এত গুটিয়ে নিচ্ছে কেন ? উত্তর নেই । মাঝে মাঝে খুব ক্লান্ত মনে হয়। মায়ের হাল্কা উদ্বেগ , বাবার সংসারজীবনে একটু বেশিই চুপ করে যাওয়া , ওকে ক্রমশ কবিতা থেকে দূরে ঠেলে দিচ্ছে না তো ! মা ওর অগোছালো টেবিল , কবিতার খাতা , সব‌ই যত্ন করে গুছিয়ে রেখে দেয়। কিন্তু শুভ কেন ইদানিং একটা নতুন কবিতাও লিখতে পারছে না ? বাঁকুড়ার ফুলকুশমা থেকে বেলপাহাড়ি ছুটে আসতে , ফিরে যেতে বাসভাড়াতেই অনেক পয়সা লেগে যায় । তা জেনেও ও কেন ছুটে এল আজ সকালে ? কারণ , কাছের মানুষ অমলেন্দু স্যারের থেকেও‌ ওর নিকটতম ভালোবাসার নাম কবি প্রলয় ,ওর প্রলয়দা। প্রলয়দারও তো তেমন কিছু গোছানো জীবন নয় , যে চট করে শুভর একটা ব্যবস্থা করে দিতে পারবে ! বাবা মা ক্রমশ অসুস্থ হয়ে পড়ছে , বাচ্চাটা ছোট। শুভ ভাবে‌ , যে সাংবাদিকতার ভুবন প্রলয়দাকে সাফল্যের মালা পরাতে পারতো , সেই ফেলে আসা জীবনটার অস্তিত্ব মুছে ফেলে , তার প্রিয় প্রলয়দা আজ রুটিরুজির নানা অপশন ঘেঁটে বেড়াচ্ছে । হঠাৎ ওঠা চৈত্রের ঝড়ের মতো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে ওদের কবিজীবন। প্রলয়দার দিকে চোখ তুলতেই , দৃষ্টিতে স্নেহ আর হতাশা দুটোই ফুটে উঠলো। যেন এতক্ষণ খালি হয়ে যাওয়া চায়ের ভাঁড় হাতে , দুজন দুজনের মনের কথা শুনছিল । প্রলয়ই স্তদ্ধতা ভাঙলো । কিছুটা অনিশ্চিত ভাঙা ভাঙা শব্দে কোনোরকমে বললো–অমলেন্দুদা এই স্বপ্নের কথা বলে আমাকে যদি আটকে না দিতো , তাহলে এপ্রিলের গোড়াতেই পাটনার একটা লোহা লক্কড়ের কারখানাতে হাফ ম্যানেজার গোছের পদে যোগ দিতাম।শুভ, আমার বাবা যখন গ্রুপ থিয়েটার কর্মী ছিলেন , তখন উচ্চশিক্ষিত হয়েও শুধু থিয়েটার আঁকড়ে সংসার চালানো যেত না । আমাদের মানুষ করবার জন্য বাবাকে স্কুলের চাকরি নিতে হয়েছিল। আজ অনেকগুলো বছর পরে , তোমার আমার জীবনে শুধু কবিতা আঁকড়ে বেঁচে থাকার কোনো স্কোপ নেই । ইচ্ছে থাকলে , এই মুহূর্তে তুমি আমি কেউই একটা সুপার ফাস্ট বাসে চড়ে মাঠাবুরুর দিগন্তে ভেসে যেতে পারবো না। ওখানে আমাদের জন্য কিংশুক ছোঁয়া কবিতা ছিলো‌। ফাগুন মঞ্জরী ছিলো । পাহাড়ি শঙ্খচিল ছিলো । যা তোমার আমার খাতায় কবিতার শব্দ হয়ে ঝরে পড়তো । কিন্তু , তোমাকে বাস ধরে তোমার গ্রামে ফিরে যেতে হবে ,আর আমাকে অফিসে ঢুকে, মে আই কাম ইন স্যার — বলে হাত কচলাতে হবে । জানি‌ না অমলেন্দুদা কোন দিবাস্বপ্নে কবিতা জীবনের আকাশকুসুম কল্পনাতে বুঁদ হয়ে আছেন। আমি বড়জোর আর এক বছর দেখবো । তারপর…..
শুভ আবার ওর হাত চেপে ধরে বললো–না প্রলয়দা ,আর একটু দেখি , ধৈর্য ধরি । কেননা , অমলেন্দু স্যারের কবিতা ভুবনে আমাদের মতো ছন্নছাড়াদের জন্য একটু জায়গা হয়তো থাকবে । তুমি সংসারী মানুষ , আমাদের কবিতা শিক্ষক হয়ে অন্তত থেকো । ওখান থেকে আমরা একটা কবিতা পত্রিকা‌ নিয়মিত প্রকাশ করবো । আমাদের সবাইকেই তো সে দায়িত্ব নিতে হবে । উন্মনাদির মতো সুন্দর মনের মানুষকে যদি আমরা পাই…
না না , প্রলয়দা আপাতত পাটনায় চলে যাওয়ার কথা বোলো না। লেখাপড়াটা ভালো করে শিখেছিলাম। তাই দু একটা কোচিং ক্লাস চালু করেছি । স্কুটি না থাক , আমার আধভাঙা সাইকেলটা চরিয়ে চরিয়ে একটা পেটের দানাপানি ঠিক জুটিয়ে নেবো। তুমি ভেঙে পোড়োনা প্রলয়দা , আমি ভোরের স্বপ্নে দেখেছি–অমলেন্দু স্যারের উঠোনে টগবগ করে ফুটছে মোটা চালের ভাত । আঃ ! কী সুগন্ধ ! ওগো কবিজন্মের চিরপ্রণম্য অন্ন‌ ,‌ তোমার গন্ধে আমাদের কলম যেন ডাঁটো থাকে। অমলেন্দু স্যারের স্নিগ্ধতা , উন্মনাদির সবকিছুতেই বিস্মিত হওয়া অবাক চাহনি ,বয়সে ছোটো কয়েকজন কবির প্রতিদিনের কবিতার খাতা , ভালোবাসার কুটিরে জন্ম নেওয়া নির্বাণহীন সত্যের মতো কবিতা আমাদের বাঁচিয়ে রাখুক। ‌
চায়ের দাম মিটিয়ে পায়ে পায়ে কখন যেন ওরা বাসস্ট্যান্ডে এসে দাঁড়িয়েছে। প্রলয় অবাক হয়ে ভাবছে শুভর কথা । ধীরে ধীরে সরকারি চাকরির বয়স বয়ে যাচ্ছে । স্কুলের চাকরি হয়তো আর জুটবেনা । তবু ছাত্র পড়ানোর অদ্ভুত নেশায় আচ্ছন্ন এই তরুণ কবি আজ তাকে বেশ একটা ঝাঁকুনি দিয়ে গেলো । প্রলয় চিরদিনই একটু সংযত , চোখে জল এলেও সামলে নিতে জানে। তবু , বাঁকুড়ার বাসের গেটে পা রাখা শুভকে শেষবার জড়িয়ে ধরে কোনোরকমে বলতে পারলো — পাশে আছি কবি। আজ রাত দশটা নাগাদ কনফারেন্স কলে উন্মনাদি , অমলেন্দুদার সঙ্গে কথা বলবো । মনে থাকবে ?

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।