গল্পেসল্পে শুভাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়

যাত্রা

‘ স্যার আমি অরুণোদয় বলছি। জন্মদিনের একরাশ শুভেচ্ছা। ভালো থাকবেন…’
‘ মাই প্লেজার। অ্যাট ফার্স্ট তুমিই ফোন করলে। এরপর হয়তো আরো অনেকে…। তবে প্রথম বার্তার মাঝে একটা অন্যরকম ফ্র্যাগ্রান্স সবসময়েই লুকিয়ে থাকে। জানলা দিয়ে দেখা ভোরের আলোর মতো। তারপর, তোমার ছবির খবর কী? ‘
‘ ওই বিষয়েই আপনার সঙ্গে একটু জরুরি কথা ছিল স্যার। বাড়িতে এসেই বলতাম। প্রসঙ্গটা যখন উঠলোই, না বলে থাকতেও পারছি না। ‘
‘ বলো।’
‘ নতুন ছবি করতে চলেছি। শরৎচন্দ্রের দেবদাস। মুখ্য ভূমিকায় আপনাকে দেখতে চাই।’
‘ সরি। তোমার এ অনুরোধ রাখতে পারলাম না।’
‘ আপনাকে ছাড়া এই মূহুর্তে আর যে কাউকে দেখি না স্যার….’
‘ আমি পারবো না ভাই। ঐ অভিনয়ে আমি অযোগ্য। অন্য কাউকে খোঁজো। পাবে না কেন, ঠিক পাবে। ভালো করে দেখছো না। তাই পাচ্ছো না। অভিনেতার কি অভাব?’
‘ স্যার আমার একান্ত অনুরোধ ….গোটা প্রোডাকশন হাউজের অনুরোধ…’
‘ অফার বলো, অনুরোধ বলো…বিশ বছর আগেও যেমন রাজী হই নি, এই মধ্য পঞ্চাশে এসে রাজী হবো.. ভাবলে কি করে? তাছাড়া জানো তো আমি এখন বেছে বেছে কাজ নিই। সব রোল সবাইকে সুট করে না, মানায় না…কোনো কোনো ক্ষেত্রে আজীবন বেমানানই রয়ে যায়। অভিনয় যে করে এই রিয়ালাইজেশন তার জীবনে ফার্স্ট প্রায়োরিটি।’
‘ তবু আর একবার ভেবে দেখলে হতো না স্যার? ‘
‘ যেভাবে বলছো, তাতে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে। উপায় নেই। এটা একেবারেই আমার নিজস্ব জায়গা অরুণ। তোমার পরিচালনার ওপর আমার যথেষ্ট আস্থা। আশা রাখি ছবি তোমার সাকসেস পাবেই। দেবদাস আমার সারাজীবনের প্রিয় সিনেমার একটি। এ ছবিতে অভিনয় করতে পারলে নিজেই খুশি হতাম। যদি বলো অন্য কোনো রোল করতে, ভেবে দেখতে পারি৷ কিন্তু ঐ ট্র্যাজিক হিরোর চরিত্র আমার পক্ষে করা সম্ভব নয়। ঘটনাচক্রে আজ প্রমথেশ বড়ুয়ারও জন্মদিন। আমার ঘরের ড্রয়িং রুমে টাঙানো বড়ুয়া সাহেবের ফটোটা মুছে পরিষ্কার করে সবে মালা পরাচ্ছিলাম, তখনই তোমার ফোনটা এলো। যতটা আনন্দ পেয়েছি, ততটাই এমব্যারাস্ড হলাম বিশ বছর আগের মতো হঠাৎ করে ফিরে আসা আবার সেই অফার এবং তাকে ঘিরে অনুরোধ উপরোধ এইসব শব্দ গুলোর মাঝে নিজেকে জড়িয়ে। সময় তো এগোয়। ইচ্ছে থাকলেও চল্লিশের দশকের বড়ুয়া সাহেবের সে অভিনয়কে কখনো কি ছুঁতে পারবো? যে সৃষ্টি মানুষের মনে গেঁথে থাকে তা বারবার হয় না। একবারই হয়। তার শেকড় ওপরানো অত সহজ কাজ নয়। শুধু শুধু প্রমথেশ বাবুকে নকল করতে গিয়ে আমি আমার ইমেজকে খোয়াতে পারবো না অরুণ। ভালো ছবি, ভিন্ন ধারার ছবি হয়তো আবারো ফিরে ফিরে আসবে। আরো অপ্রাসঙ্গিক হবে চল্লিশের ঘরানা। এই পঞ্চান্নর কমলাকান্ত মিত্তিরের মনোজগতকে বটগাছের ছায়ার মতো ততবেশি করে আঁকড়ে ধরবে আজকের ইন্দ্রপুরী স্টুডিওর আসা যাওয়ার রাস্তা থেকে বহু পেছনে পড়ে থাকা কোনো এক দেবদাস চরিত্রের নিশ্ছিদ্র আলো… হারিয়ে যাওয়া ছবি, হারিয়ে যাওয়া সেট, হারিয়ে যাওয়া জানলার কোণে, গরাদের গায়ে এসে পড়া সে টুকরো চাঁদের লুকোনো নীরব স্পর্শ….এটাই তো জীবনের নিয়ম অরুণ। যাঁর ছবিকে সামনে রেখে এই ইন্ডাস্ট্রিতে পা রাখি…আজ তাঁর জন্মদিনকে জানি না, সত্যিই জানি না কটা মানুষ আবেগে ভরে রাখবে। প্রত্যেক বছরই এই দিনটাতে এসে এক অদ্ভুত সেন্টিমেন্ট আমাকে গ্রাস করে। মনের যে জায়গাটাতে আজ অবধি কাউকে বসাতে পারিনি, সেখানে তুমি আমায় বসাতে চাইছো…যদি সত্যিই সে আবেগকে প্রাধান্য দিতে চাও, তাহলে আর এ অনুরোধ কোরো না…’
‘ পারমিশন যখন দিলেনই তাহলে ঐ আর একটা রিকোয়েস্ট কি করতে পারি স্যার? চুনিলালের চরিত্র…প্লিজ না করবেন না স্যার….অন্তত ঐ চরিত্রে আপনাকেই দেখতে চাই..’
‘ এতক্ষণে ভালো প্রপোজাল দিলে। বয়স এবং সময়…সবদিক থেকেই আমার কাছে মানানসই…স্ক্রিপ্ট রেডি করো..আপাতত হাতে আর কোনো কাজ রাখতে চাইছি না। কটা দিন চুনিলালেই মজে থাকা যাবে বেশ।’

দেবদাস ছবির শেষ দিনের শুটিং সেরে মেকআপ রুম থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে আসছিলেন পঞ্চান্নর কমলাকান্ত মিত্র। পেছন থেকে গলার আওয়াজ শুনে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভ্রাতৃপ্রতিম অনমিত্র, অনমিত্র ঘোষ। এ ইন্ডাস্ট্রিতে বারো বছরের অভিনয় জীবন। দেবদাস ছবির মনোনীত মুখ্য চরিত্র।
‘ কনগ্র্যাচুলেশন কমল দা! দক্ষতা, অভিজ্ঞতা আর ক্যারিশমা তিনদিক থেকেই দেবদাসকে একেবারে ছাপিয়ে চলে গেলেন যে! বলতে বাধা নেই, এ ছবি যদি বাজার করে তো সে চুনিলালের দিকে তাকিয়েই করবে। মিলিয়ে নেবেন কথাটা।’
‘ কি যে বলো ভাই! দেবদাসকে ছোঁয়ার ক্ষমতা কি আমার আছে? যদি থাকতো, বিশ বছর আগেই ছুঁয়ে ফেলতাম। তা যখন হলো না, তখন ঐ চুনীলালই ভরসা। সে ভরসায় পা রেখেই খানিকটা পাশে থাকার চেষ্টা করলাম, এই আর কি।’
‘ কি যে বলেন দাদা! যখন অভিনয় জীবনে পা রাখি, আপনি খুব দামী কয়েকটা কথা বলেছিলেন…” সস্তা জনপ্রিয়তার জন্য অভিনয় কোরো না। লোকে একদিন মনে রাখবে। দ্বিতীয় দিন ভুলে যাবে। পাবলিক সেন্টিমেন্ট বড় বেকায়দার জায়গা। সেল্ফ রিয়ালাইজেশন না থাকলে অভিনেতা তৈরি হয় না। আজ এই বারো বছর পর নিজেকে দিয়ে যেটুকু রিয়েলাইজ করেছি তার ভিত্তিতেই বলছি দাদা…আপনি পাশে না থাকলে আমি হয়তো এ কদিনে জীবনের একটা নতুন পথের বাঁকে এসে পৌঁছতাম না। অবসরে, শ্যুটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে যে টিপসগুলো আপনার কাছ থেকে পেয়েছি… ‘
‘ থাক না অনমিত্র, এসব কথা থাক…যথেষ্ট ভালো অভিনয় করছো তুমি…আমার চলা না হয় এখানেই শেষ… তোমার এখনো আরো অনেকগুলো শ্যুটিং বাকি আছে…একটা গোটা সিনেমার ফোকাস তোমাকে কেন্দ্র করে…আশা রাখি ধারাবাহিকতায় ভাঁটা পড়বে না।’
দর্শকমনে প্রত্যাশা জাগানো ভ্রাতৃপ্রতিম ছেলেটিকে ঘিরে কমলাকান্ত মিত্তিরের অনেক আশা। নিজের মতো করে,নিজের ঘরানায় অভিনয় করে ও। যথেষ্ট স্বচ্ছন্দ, সাবলীল। ওর অভিনয়ের ধারা কারো সঙ্গে মেলে না। কেরিয়ারের শুরুর দিকে খানিকটা জড়তা ছিল বটে, এখন সেসব অতীত। না হলে কি আর নায়কের পাঠ পায়? এসব ছেলেকে টিপস দিয়েও আনন্দ। দেবদাস চরিত্রে অরুণ ওকে সিলেক্ট করে ভুল করে নি। সিলেকশনের আগের দিনও তাঁর সঙ্গে ফোনে এ ব্যাপারে কথা হয়েছিল অরুণের…
প্রসঙ্গক্রমে ‘ অনমিত্র ঘোষ ‘ নামটা কমলাকান্তর মুখ থেকেই প্রথম বেরিয়ে আসে।
‘ তাহলে কি ওকে নেবো দাদা? বলছেন?’
‘ এই মূহুর্তে ঐ ছেলেটির প্যারালালি আর কাউকে তো খুঁজে পাচ্ছি না। ভেরী প্রমিসিং। এটা আমার রিয়েলাইজেশন।’
অনমিত্র মুখ রেখেছে। শ্যুটিং ফ্লোরে একাম্তে দাঁড়িয়ে বলেছিল অরুণ…’ খুব টেন্সড ছিলাম কমল দা। মূল চরিত্রে আপনার বদলে অন্য কাকে ভাববো, সে কেমন পারফর্ম করবে…এখনো পর্যন্ত যা দেখছি, যেমনটা চেয়েছিলাম ঠিক সে পথেই কাজ করছে ছেলেটি।’
এ ব্যাপারে পরিচালক অরুণের থেকে কমলাকান্তের ব্যক্তিগত আনন্দের জায়গা টুকুও নেহাৎ কম নয়। যদিও অভিনেতা আর অভিনয়ের মাঝে খুঁতখুঁত ব্যাপার বলে একটা শব্দ সবসময় থেকেই যায়। অভিনয়ে স্যাটিসফ্যাকশান চলে না। যদি চলতো তাহলে ‘ দেবদাস’ সময়ের মুখ দেখতো না। অরুণ তরফদারের ছবি নতুন করে আশা জাগাতো না এভাবে।
…’ কলেজ লাইফে দেখা প্রমথেশ বাবু অভিনীত দেবদাস ছবিটি যদি আমায় ইন্সপিরেশন না জোগাতো বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে নতুন করে দেবদাস সিনেমা করবার মতো কোনো পরিকল্পনা আমার অবচেতনে বাসা বাঁধতো কিনা সত্যিই জানি না…’
বলেছিল অরুণ, সেদিন কমলাকান্তের জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে বাড়িতে এসে।
‘ ফোনে এত কথা হলো, তোমার এই ইন্সপিরেশনের কথা আগে তো বলোনি হে! ‘
‘ সব কি আর ফোনালাপে হয় দাদা! কিছু কথা যা সামনা সামনি না হলে…যাক, এই যাত্রাপথে আপনাকে শেষমেশ যে পেয়েছি… ‘
‘ কি জানো হে, এখন মনে হচ্ছে তোমার দেওয়া মূল চরিত্রের অফার ফেরৎ দিয়ে আমি ঠিক যতটা আনন্দ পেয়েছি, ততটাই আফশোসে ভুগতাম যদি না চুনিলালের অফারটা যাত্রাপথের সওয়ারীর মতো সামনে এসে দাঁড়াতো…’

স্বল্পদৈর্ঘের পাঠ। ছোট ছোট সংলাপ। নিয়ম মতো আজকেই শেষ হলো কমলাকান্তের শ্যুটিংয়ের মেয়াদ। চল্লিশের দশকের আলোয় এ যেন সত্যিই এক যাত্রাপথ…যে পথের সওয়ারী হওয়ার সুযোগ এ জীবনে আর কখনো তিনি পাবেন কিনা জানা নেই…
শ্যুটিং ফ্লোরের বাইরে একতলার সিঁড়ির নীচে দাঁড়িয়ে অনমিত্রের মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে মনে হলো কমলাকান্তের।
দিনের শ্যুটিং প্যাকআপ করে ওপরের ঘর থেকে নেমে আসছিলেন পরিচালক অরুণ, অরুণোদয় বাগচি।
‘ এত তাড়াতাড়ি জার্ণিটা শেষ করে দিলেন দাদা…!’
এগিয়ে এলেন কমলাকান্ত। নায়ক এবং পরিচালক.. দুজনের পিঠে আলতো হাত রাখলেন…
‘ কে বলেছে জার্ণি শেষ হয়ে গেল? দেবদাস থেকে চুনীলাল…এ যাত্রা যে কখনো শেষ হবার নয়..’
মুহূর্ত কয়েক থেমে গেলেন অরুণ বাগচি। গলায় ভালোবাসার সুর। হয়তো বা আক্ষেপের সুরও…
‘ যেমনটা চেয়েছিলাম অনেক বেশিই ফিরিয়ে দিলেন দাদা! অবিস্মরণীয় শটগুলো এখনো কানে বাজছে…!’
‘ সেটা বুঝলে অথচ আগাগোড়া অভিনয়টা ছবি বিশ্বাসকে নকল করে গেলাম,আঁকড়ে ধরে রইলাম, এটা কেউ টের পেলে না..অদ্ভুত! ‘ দেবদাস ‘ ছবির আর এক মহারথী। তখন কতই বা বয়স ছবি দার। চিত্র জগতে অল্প কিছুদিনের আনাগোনা। কাবুলিওয়ালা সিনেমা দেখে এসে ভরদুপুরবেলা বাড়ির চিলেকোঠার ছাদে উঠে কাবুলিওয়ালা সেজে হেঁটে বেড়াতাম আর ওর মতো গলা করে যা মনে আসতো তাই বলে যেতাম। কখনো বা আলমারির দেরাজে রাখা বাপ ঠাকুর্দার আমলের পিতলের হুঁকো আর কলকেটা সন্তর্পণে বের করে, পুজোয় বাবার কিনে দেওয়া জমকালো পাজামা পাঞ্জাবিখানা পরে জলসাঘরের জমিদার বিশ্বম্ভর রায় সেজে চলতো ছাদ পরিক্রমা। লুকোনো স্পটলাইটের আলোয় মুহূর্ত গুলো এখন ছবির মতো মনে হয়। শৈশবের সে গন্ধ কিছুটা হলেও যদি…চেষ্টা করেছিলাম, হয়তো সত্যিই ছুঁতে পারিনি…’
অনমিত্রের চোখেমুখে বিস্ময় খেলে যায়। এই সূক্ষ্ণতার আর এক নামই কি সেলফ রিয়ালাইজেশন? সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে নির্নিমেষ চোখে তাকিয়ে থাকেন অরুণোদয় বাগচি। চলে যাচ্ছেন মানুষটা…শ্যুটিং ফ্লোর ছেড়ে…স্টুডিও চত্বর ছেড়ে…একটু একটু করে মেইন গেটের দিকে….এক ভিন্ন আলোক বৃত্তে। প্রমথেশ বড়ুয়া থেকে ছবি বিশ্বাস না কি অন্তরালের দেবদাস থেকে অভিনীত চুনীলাল? ছুঁয়ে যায় জীবন, যাত্রাপথের কোথাও একটা…ধূলিকণার স্তরে স্তরে।।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।