সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে প্রদীপ গুপ্ত (পর্ব – ৯)

বাউল রাজা
তৃতীয় খন্ড (নবম পর্ব)
দুজনের হাসির দমকে গাম্ভীর্যের অন্ধকার খানিকটা তরল হলো। আমরা পাশাপাশি হাঁটছি। এতোক্ষণে বাউলদিদির বাঁ পায়ের তর্জনীতে বাঁধা একটা রুপোর চুটকির মৃদু রিনিঝিনি আওয়াজ কানে এলো।
— আওয়াজটা কি কানাইদার মনে পৌঁছুনোর একটা কৌশল নাকি গো বাউলদিদি?
— কোন আওয়াজ?
— ওই যে, চলিতে চলিতে রাধিকার পায়ে বাজিছে নূপুর ছন্দে —
— যদি সেটাই হবে তাহলে ও শব্দ তোমার কানে পৌচুলো কেন ঠাকুর? তোমার দারনা ঠিক কিন্তু ক্ষেত্তর আলাদা গো।
যে আমারে ভালোবাসার রঙ্গ জানে
মন ভোলানোর ভঙ্গিতে
এ নূপুরধ্বনির রিনিঝিনি তারই কানে
যেন বাজে মধুর সঙ্গীতে।
ঠাকুর এ নূপুরেরও বুজি মন আচে গো। সে ঠিক আমার গোপালঠাকুরের কানে গিয়ে পেমের ধ্বনি তোলে।
আগে নদী পেরোনোর জন্য যেখান থেকে বাঁদিকে বাঁক নিতে হতো সেখানটাতে এখন আর রাস্তার চিহ্নমাত্র নেই। এতোক্ষণ খেয়াল করিনি, যে রাস্তার দুধারে বেশ কটা হোটেল মাথা তুলেছে। আর বেশ কিছুটা পথ আর নুড়িপথ নেই, সেখানে কালো পিচের ছোঁয়া লেগেছে।
— তাহলে নদী পেরোবো কীভাবে বাউলদিদি?
— কেন? ওই তো সামনেই — ও হরি, তুমি তো বহুদিন বাদে এলে গো। সেটা তো ভুলেই মেরে দিয়েচিলাম। একন তো আর খেয়া পেরোতে হয় না গো। সরকার নদীর ওপর বিরিজ বানিয়ে দিয়েচে। পাকা সিমেন্টের বিরিজ গো ঠাকুর।
— তাহলে নদী? তার কী হলো?
— নদী তো সেই আগের নদীই আচে গো, তুমি সত্যিই ছেলেমানুষ। তবে একটা কতা কই গো ঠাকুর। বিরিজে বাঁদা পইড়ে নদীর খুব কষ্ট গো, কেঁদে কেঁদে আমার সই একেবারে শুইকে কাঠ হয়ে গেচে গো।
আমরা ব্রীজের ওপর পা রাখলাম। নদীর দুপারকে পাকাপাকিভাবে বেঁধে দেওয়া হয়েছে। এখানটায় নদীর দুপারের বুকের ওপর দিয়ে কংক্রিটের শাসন কায়েম হয়েছে। ব্রীজটা পেরিয়ে যাচ্ছি, হঠাৎ থমকে গেলাম। একটা চেনা স্বর।
— কীগো ঠাকুর, এই কুহকী রাজ্যে ফের পা রাকলে?
আমি চমকে উঠলাম। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বাউলদিদির কাঁধটা খিমচে ধরলাম।
— কী গো ঠাকুর, অসুস্ত লাগচে? এদিকে এসো দেখি।
বলেই বাউলনি আমার ডানহাত ধরে হাল্কা করে টান দিলো।
— না না, একদম ঠিক আছে। কিন্তু…
— নদীর কতা ছাড়ো দিকি। ওর স্ববাবই এরকম। ও নিজে কি এই রাজ্যের একজন নয়! তাহলে এসব কতা কয়ে সবার মন ভাঙায় কেন?
তাহলে কি কথাটা সত্যি সত্যিই নদীই বললো? কিন্তু ও যে অভিমান করে আমার সাথে কথা কওয়া বন্ধ করে রেখেছিলো? সেই অভিমান কি দূর হলো? আমি নদীর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম — ভালো আছো সই?
ক্রমশ