T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় শিশির দাশগুপ্ত

“উফ্,আর সহ্য হয় না।কী আরম্ভ হয়েছে ঘরের মধ্যে।”
রাজীব তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে গজগজ করতে করতে কলঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
অরুনিমা মুখ তুলে রাজীবের দিকে তাকালো।অশনি সংকেত টের পেলো।সে জানে রেগে গেলেই রাজীব মুখ খারাপ করে ফেলে।তখন তার মাথায় থাকে না অরুনিমা সংসারটার জন্য কী করে,কেন এতোরাতেও সে জেগে থাকে।

কলঘর থেকে বেরিয়েই রাজীবের চিৎকারঃ
— এই তোমার দিদিমনিগিরি বন্ধ করো তো।আমি লাইট নিভিয়ে দেবো।জ্বালাতন আর সহ্য হচ্ছে না।
— জ্বালাতন! জ্বালাতন বলছো! তুমি না বাবা হয়েছ, এতটুকু সহ্যশক্তি নেই তোমার?
— না, নেই।দরকার নেই অমন সহ্যশক্তির।বেশি মুখ চালিও না।এরপর মুখ দিয়ে কীর্তন বেরিয়ে আসবে।
— হ্যাঁ,তো করো না কীর্তন। আর কী জানো তুমি? একদিনও নিয়ে বসো ছেলেটাকে ; তোমার দায়িত্ব নেই?
— এই ভারী আমার দায়িত্বমাড়ানী এসেছিস রে!
তুই দায়িত্ব বুঝিস? আমার যে এখন ঘুম দরকার, বুঝিস?
— এই মুখ সামলে কথা বলো
— কেন,কী করবে?
বলতে বলতেই প্রায় শরীরের কাছে এসে গেছিল রাজীব।
অরুনিমা রাগে ছেলে তুতানের বইপত্র,খাতা ঠেলে ছুঁড়ে সরিয়ে দিল।
— যা তোকে পড়তে হবে না।বড় হয়ে টোটো চালাবি।
রাজীব এগিয়ে এসে ছেলের হাত ধরে বিছানার দিকে এগিয়ে গেল।

রাজীব লাইট নিভিয়ে তুতানকে নিয়ে শুয়ে পড়ে।অন্ধকারের মধ্যেই অরুনিমা পশ্চিমের জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়।এটা বাড়ীর পিছন দিক।সরু গলিতে একটাই স্ট্রিটল্যাম্প দুলছে বাতাসের দোলায়।জোরে ছুটে গেল একটা বাইক।শিশির পড়ার টুপটাপ শব্দও শোনা গেল মনে হয়।

পুজোর পরেই তুতানের পঞ্চম শ্রেণীর প্রবেশিকা পরীক্ষা।এ যেন অরুনিমার কাছে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ। ছেলেকে মিশনে ভর্তি করতেই হবে।ছেলের জন্যে দিনাতিপাত করে খাটছে অরুনিমা।যোগাড় করেছে আগের বছরের প্রশ্নপত্র।তুতানকে ভর্তিও করে দিয়েছে এক প্রাইভেট টিচারের কাছে।শুনেছে সেখানে পড়ালে ভর্তির চান্স বেশি।

মাত্র দু’মাসের জন্য পাঁচ হাজার টাকা।তাও অগ্রিম।একসাথে প্রায় চল্লিশটা বাচ্চাকে নিয়ে বসেন টিচারটা।মায়েরা বাইরে গল্পগুজবে ব্যস্ত থাকেন।সবই স্বামী-শ্বাশুড়ী কাহিনী।কেউ কেউ সেক্সের আলোচনাও করেন।

অরুনিমার এসব ভালো লাগে না।সে প্রশ্নপত্র যোগাড় করে,কে কোন অঙ্কবই ফলো করছে জানতে চায়।অরুনিমা বুঝতে পারে এরা কেউই সত্যি বলে না।এখানে চলে অভিনব মিথ্যা বলার প্রতিযোগিতা।

অরুনিমা চুপ করে দাঁড়িয়ে ভাবছিল তার দোষ কোথায়? কেন সে এমন মুখ শুনবে? ভাবতে ভাবতেই অরুনিমা টের পেল কাঁধে রাজীবের হাত।
— শুতে চলো।কাল অফিস আছে।
— তুমি শুয়ে পড়ো।আমি এখন ঘুমাবো না।
লাইট জ্বালালো অরুনিমা।তাকিয়ে দেখলো তুতান ঘুমিয়ে পড়েছে।
অরুনিমা আয়নার কাছে এসে খোঁপাটা খুলে ফেলল।
অরুনিমার দিকে রাজীব একদৃষ্টে তাকিয়ে।
গাড় নীল ব্লাউজের নিচের মসৃণ ফর্সা সুন্দর ত্বক রাজীবকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছে।পিঠে আলতো চুমু খেল রাজীব।অরুনিমা সড়ে দাঁড়ালো।
— আমার এসব এখন ভালো লাগছে না।
— কী ভালো লাগছে না,কেনো ভালো লাগছে না,স্বামীকে ভালো লাগছে না?
বলতে বলতেই আলো নিভিয়ে পাঁজাকোলে করে অরুনিমাকে মেঝেতেই শুইয়ে দিলো রাজীব।
দেহসুখে মত্ত রাজীব দেখতেও পেলো না অরুনিমার চোখে তখন বর্ষা নেমেছে।

* * * * * * * *

পুজোর ছুটি শেষ।আর দু’দিন পরেই তুতানের পরীক্ষা।এখন চলছে শেষপর্বের প্রস্তুতি।তুতানও এখন অনেক সিরিয়াস।প্রিপারেশন তুঙ্গে।

একটা অঙ্ক পরপর তিনবার ভুল করায় ক্ষেপে গেল অরুনিমা।স্কেলটা দিয়ে ঘা- কতক বসিয়ে দিল তুতানকে।
এমন সময় শ্বশুরমশাই বলে উঠলেনঃ
— বৌমা,কী হচ্ছে? কথায় কথায় মারছো কেন?
— চুপ করুন তো বাবা। আপনারাই লাই দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছেন।
শ্বাশুড়ি চিৎকার করে উঠলেনঃ
— কী বললে? আমরা লাই দিচ্ছি?সাবধান বলে দিচ্ছি।আমরা ছেলে মানুষ করিনি?
শ্বশুড়মশাই ততক্ষণে তুতানকে ডাক দিয়েছেন।তুতান একছুটে দাদুর কাছে।
গর্জে উঠলো অরুনিমা।
— ওরে শয়তান ছেলে।চলে গেলি পড়া ফেলে।দেখিস, আজ তোকে কী করি!
শ্বাশুড়িও বলে উঠলোঃ
— কী করবে? মারবে? মারো তো দেখি।নাতি দাদুর কাছে গেলে দোষ!
অরুনিমা আর সহ্য করতে পারলো না।
— জেনে রাখ তুতান,তুই যদি মিশনে চান্স না পাস,তোকে যদি অন্য স্কুলে ভর্তি করতে হয়,তাহলে আমি গলায় দড়ি দেবো।

* * * * * * *

পরীক্ষা মিটেছে।তিনদিন বাপের বাড়ী কাটিয়ে আজই অরুনিমা আর তুতান ফিরলো বাড়িতে।আগামীকাল লিস্ট ঝোলাবে।

রাতে স্বামীর বুকের উপর মুখ রেখে অরুনিমা দুটো আঙুল দেখিয়ে স্বামীকে বলেঃ
— ধরো তো কোনও একটা।
— কেন,কী হবে?
— আহা,ধরোই না।একটা।
পালটা রাজীবও দুটো আঙুল দেখিয়ে বলেঃ
— তুমি ধরতো দেখি একটা।
— ওমা,তুমিও! তোমার মধ্যে তুতানকে নিয়ে এতো টেনশন বুঝিনি তো কখনো

একথা ওকথার মধ্যেই দুজন দুজনকে আরো উষ্ণ করতে থাকে।আজ অরুনিমা ক্লান্ত হলেও চোখে অনন্ত হাসি।আজ রাজীব জানিয়েছে, স্কুলের কাছেই দু’কামরার ফ্ল্যাট সে দেখে রেখেছে।লিস্টে নাম উঠলেই বুক করবে রাজীব।

* * * * * * * *

পরেরদিন বেলা এগারোটা।রাজীবের বাবা মা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছেন।রেজাল্ট জানার আগ্রহ এখন এই দুজনকেও পেয়ে বসেছে।কলিংবেলের আওয়াজে সচকিত হয়ে উঠলো দুজনেই।

দরজা খুলতেই তিনজনের মুখে হাসি দেখেই বোঝা গেলো নাতি সফল।রাজীব তুতানকে বললো দাদু ঠাম্মাকে প্রণাম করতে।দাদুসোনা বলে তুতানকে জড়িয়ে ধরলো রাজীবের বাবা।এখন এই সংসারে খুব আনন্দ।রাজীবের বাবা বললেন– আমি একটু বাজারে যাবো।চিকেন আনবো আর দাদুভাইয়ের জন্য ক্যাডবেরি। রাজীবের মা বললেন– দাঁড়াও আমিও যাবো।

দুপুরে লাঞ্চ সেরে উঠে আরামকেদারায় হেলান দিয়েছে এ বাড়ির দুই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা।রাজীব চেয়ারে,হাতে খবরের কাগজ।অরুনিমা টুকিটাকি কাজে ব্যস্ত।
— হ্যাঁরে,রাজীব, ওর ভর্তি কবে?
— হ্যাঁ,বাবা কালকেই।
— আচ্ছা বৌমা শোনো, তোমার শ্বাশুড়ি তোমাকে কিছু বলবেন।
তারপরেই ঘাড় ঘুরিয়ে তুতানকে কাছে ডাকলেন।ফ্রিজ থেকে বার করে তুতানের হাতে তুলে দিলেন ক্যাডবেরির প্যাকেট।সেলিব্রেশন।
রাজীবের মা অরুনিমাকে ডেকে বললেনঃ
– এই নাও বৌমা, তোমার লড়াইয়ের শংসাপত্র।এই জামদানিটা আমি তোমায় দিলাম।আসল যুদ্ধ তো তুমিই জিতেছ।
এইসময় রাজীব বলে উঠলোঃ
– বারে, আর আমি! আমার বুঝি কিছুই পার্টিসিপেশন নেই?
সবাই হেসে উঠলো।রাজীবের মা ছেলের গালে হাত বোলাতে বোলাতে বললো— তোর জন্য তো রয়েছি আমরা সবাই।

রাজীব বললো — যাক্ শোনো, তোমাদের দুজনকেই বলি, এখন থেকে আমরা অর্থাৎ আমি,অরু আর তুতান এখানে থাকবো না।স্কুলের সামনেই একটা ফ্ল্যাট বুকড্ করলাম।সামনের সপ্তাহেই প্রসেসিং কমপ্লিট হবে।মাঝে মাঝে আমরা আসবো।আর তোমাদের একটা মোবাইল দিয়ে দেবো।তুতান শিখিয়ে দেবে অপারেটিং।ফোনে যোগাযোগ থাকবে।

রাজীবের বাবা মা দুজনেই আকাশ থেকে পড়লেন।দুজনেরই এখন চোখে জল।ওরা বুঝতে দিচ্ছে না এটা কষ্টের কান্না না সাফল্যের।দুজনেই এখন তুতানকে আদর করছেন বেশি বেশি করে।

তুতান তারমধ্যেই বলে চলেছেঃ
— দাদু ঠাম্মা, আই উইল টিচ ইউ হাউ ইউ কিপ রিলেশন অন মোবাইল।

রাজীবের বাবা মুখ তুলে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে।দেখলেন খসে খসে যাচ্ছে তার আদরের বাড়ির ছাদ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।