T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সুধাংশু চক্রবর্তী

চৌতিরিশ বছর পর
বছর পঁয়ষট্টির প্রৌঢ় মৃৎশিল্পী মৃণ্ময় পাল চল্লিশ বছরের অভিজ্ঞতায় মনোযোগ দিয়ে তুলি টানছেন মাদুর্গার চোখে । মায়ের চোখে তুলির টান দিচ্ছেন একটু একটু করে । ফিবছরই মায়ের চোখ আঁকার সময়ে দুনিয়া ভুলে যান । আজও তার ব্যতিক্রম হলো না ।
মায়ের অচিন্ত্য রূপ কল্পনা করে বিভোর হয়ে চোখ আঁকছেন । সহসা দমকা বাতাসে কিছু এসে পড়লো চোখে । নিমেষেই দু’চোখের পাতা বুজেও গেল । জল দিয়ে চোখ না ধুয়ে এলেই নয় ভেবে অন্ধের মতো হাতড়াতে হাতড়াতে এগোলেন কলতলার দিকে ।
সহসা একটি কচি মেয়ে ছুটে এসে তাঁকে ধরে থামিয়ে দিয়ে মিষ্টি গলায় বলে – আর একটু হলেই তো হোঁচট খেতে আধলা ইটে পা দিয়ে । বেশ তো চোখ আঁকছিলে । এখন কেন অন্ধের মতো… এসো, তোমাকে নিয়ে যাই কলতলায় ।
কচি মেয়েটির সঙ্গে কলতলার দিকে হাঁটতে হাঁটতে প্রৌঢ় মৃন্ময় পাল শুধোলেন – কে গো মা, তুমি ? এমন মিষ্টি গলা যেন আগে কোথাও শুনেছি ?
শুনেছো গো । অনেকবারই শুনেছো । কতকাল আগেকার কথা । তাই হয়তো ভুলে গেছো আমাকে ।
শুনেছি ! তুমি কি এই বাড়িরই কেউ, মা ? যদি তাই হবে তাহলেও কেন মনে পড়ছে না আমার !
আগে জল দিয়ে ভালো করে চোখ ধুয়ে নাও । তারপর চোখ খুলে দেখে বোলো আমাকে দেখেছো কিনা । বলা শেষ করেই কচি গলায় খিলখল হাসির বান ছুটিয়ে দেয় সে ।
কচি মেয়েটি পরম মমতায় জলের ছিটে দিয়ে প্রৌঢ় মৃৎশিল্পীর চোখ ধুয়ে দেয় । চোখের ভিতরকার অস্বস্তিটা দূর হবার পর প্রৌঢ় মৃৎশিল্পী চোখ খুলে তাকালেন । মেয়েটি নেই ! চতুর্দিকে বারকয়েক চোখও বোলালেন । নেই তো নেই ! একসময়ে হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে দিয়ে আবার মনোযোগ দিলেন চোখ আঁকায় ।
অবাক কাণ্ড ! এখন যতবারই মায়ের চোখে তুলির টান দিচ্ছেন ততবারই একটি কচি মেয়ের মুখ ভেসে উঠছে তাঁর চোখের সামনে ! মুখটা চেনা চেনা ঠেকলেও মনে করতে পারছেন না কবে এবং কোথায় দেখেছেন এই মুখ । এক বুক জিজ্ঞাসা নিয়েই মায়ের চোখ আঁকা শেষ করলেন মৃৎশিল্পী ।
আঁকার শেষে বরাবরের মতো আজও বিভোর হয়ে গেলেন নিজেরই আঁকা চোখ দুটোর দিকে তাকিয়ে । মা-মা আকুল ডাকটা গুড়গুড় করছে গলার কাছে । উগড়ে দিতে না পেরে সজল চোখে মুখ ফিরিয়ে নিতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে দূর থেকে ভেসে এলো ওই কচি মেয়েটির হাঁক – কিগো, দেখতে পেয়েছো আমাকে ?
প্রৌঢ় মৃণ্ময়ের তখনই মনে পড়ে গেছিলো ঘরে ফেলে আসা অসুস্থ মেয়ের কথা । চোখ আঁকা শেষ হয়েছে যখন মেয়ের জ্বর উপশম হলো কিনা একবার গিয়ে দেখে আসা উচিৎ ভেবেই ছুটলেন বাড়ির দিকে ।
সদর দরজা দিয়ে বেরোতে যাচ্ছেন এমন সময়ে পিছন থেকে হাঁক দিয়ে তাঁকে দাঁড় করালেন এই গৃহেরই বৃদ্ধ কর্তা রমাপদ রক্ষিত – ও মৃণ্ময়, মায়ের চোখ আঁকা কি শেষ হলো ? জানি তুমি কাজ না শেষ করে মণ্ডপ ছেড়ে কোথাও যাও না । আমাকে না দেখিয়েই চলে যাবে ?
প্রৌঢ় মৃতশিল্পী ঘুরে তাকালেন । এবং চমকেও গেলেন । বৃদ্ধ রমাপদ’র হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে বছর ছয়েকের ফুটফুটে একটি মেয়ে । মেয়েটি অনিন্দসুন্দর মুখে লেগে আছে মৃদু হাসি । ওই হাসি উপেক্ষা না করতে পেরে মৃতশিল্পীকে পায়ে পায়ে ফিরে আসতেই হয় মণ্ডপে ।
মণ্ডপে এসে দেখেন, বৃদ্ধ রক্ষিতমশাই একলাই দাঁড়িয়ে আছেন ! কচি মেয়েটি নেই ! কৌতূহল দমন করতে না পেরে বৃদ্ধ রমাপদকে শুধোলেন – মেয়েটি কোথায় গেল কত্তামশাই ?
কোন মেয়েটির কথা বলছো মৃণ্ময় ?
আজ্ঞে, যে-মেয়েটি একটু আগেও আপনার হাত ধরে এখানে দাঁড়িয়ে ছিলো, তার কথাই শুধোচ্ছি ?
কই ? কেউ ছিলো না তো আমার সঙ্গে ! বৃদ্ধ রমাপদ অবাক হয়ে জবাব দিলেন ।
নাহ্ কত্তামশাই, হতেই পারে না । আমি স্বচক্ষে দেখেছি আপানর পাশে দাঁড়িয়ে ছিলো সে ।
বৃদ্ধ রমাপদ হাহা করে হাসতে হাসতে বলেন – এই বয়সেই চোখের মাথা খেয়েছো মৃন্ময় ? তাহলে আমার বয়সে যে কিছুই দেখতে পাবে না ওই চোখ দিয়ে ।
প্রৌঢ় মৃতশিল্পী যেন বিশ্বাসই হচ্ছে না । ভুল দেখেছেন সেকথাও মেনে নিতে মন চাইছে না তাঁর । তাই বিমর্ষ গলায় বলেন – ভুল দেখেছি বলছেন কত্তা ! হবে হয়তো ।
তারপরই নিজেকে সামলে নিয়ে সহজ গলায় বলেন – দেখুন কত্তা, মায়ের চোখ দুটো দেখে বলুন কেমন এঁকেছি ।
মাদুর্গার মূর্তির দিকে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই প্রৌঢ় মৃৎশিল্পী নিজেই বলেন – মনে হচ্ছে, এমন চোখ যেন আগে কখনো আঁকিনি । হয়তো দেখিওনি কোনোদিন । তবুও কি অদ্ভুত ব্যাপার, আমার হাতের তুলির টানেই কি অপূর্বই না ফুটেছে মায়ের চোখ । মনে হচ্ছে স্বয়ং মা নিজেই অধিষ্ঠান করেছেন এই মূর্তিতে !
বৃদ্ধ রমাপদ পাথরের মতো জমে আছেন মায়ের মূর্তিটির সামনে । এমন মুগ্ধ নয়নে দেখে চলেছেন যেন চোখ ফেরাতেই ভুলে গেছেন । মৃতশল্পীর বলা কথাগুলো তাঁর কানে গেছে কিনা বোঝা গেল না ।
প্রৌঢ় মন্মথ ভেবে পাচ্ছেন না কি করবেন । একবার হলেও তাঁকে যেতেই হবে বাড়িতে । সকালে দেখে এসেছেন মেয়ে ধুম জ্বরে ভুগছে । হাতের কাছেরই এক হাতুড়ে ডাক্তারের কাছ থেকে ওষুধ এনে খাইয়েছেন ঠিকই তবে তাতে রোগের উপশম হলো কিনা সেটা না জানা ইস্তক স্বস্তি হচ্ছে না তাঁর ।
যতক্ষণ মায়ের চোখ আঁকছিলেন মেয়ের কথা একবারও মনে পড়েনি । কিন্তু চোখ ধুতে যাবার সময়ে কচি মেয়েটির সঙ্গে কথা বলার পরই নিজের অসুস্থ মেয়ের কথা মনে পড়ে গেছিলো তাঁর । তখুনি একবার গিয়ে দেখে আসতে পারেননি মায়ের চোখ দুটো অসম্পূর্ণ অবস্থায় রেখে যাওয়া উচিৎ হবে না ভেবে । এখন আর সময় নষ্ট না করে তাঁকে যেতেই হবে বাড়িতে ।
পাঁচ বছর আগে এমন ঘটনা আরও একবার ঘটেছিলো তাঁর জীবনে । সেবারও মায়ের মূর্তি গড়ার সময়ে স্ত্রী অনু আচমকা অজানা জ্বরে কাবু হয়ে শয্যা নিয়েছিলেন । মেয়ে তখন মাত্র দেড় বছরের । কোনো ওষুধই কাজ করছিলো না । যেদিন মায়ের চোখ আঁকার কথা সেদিন অনুর জ্বর বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছে জেনেও মণ্ডপে এসে হাতে তুলে নিয়েছিলেন রঙ-তুলি । তারপর ভুলেও গেছিলেন অসুস্থ স্ত্রীর কথা । আঁকা শেষ হবার পরই স্ত্রীর কথা মনে পড় যাওয়ায় দ্রুত বাড়িতে ফিরে এসে দেখেন, স্ত্রী চলে গেছেন তাঁর ধরাছোঁয়ার বাইরে ।
সেইথেকে কচি মেয়েটিকে নিজের বুক দিয়ে আগলে রেখেছেন । এখন কত্তামশাই অনুমতি না দিলে তিনি যেতেও পারছেন না মেয়ের কাছে । আরও কিছুটা অন্তিক্রান্ত হবার পরও কত্তামশাই সাড়া দিচ্ছেন না দেখে একপ্রকার নিরুপায় হয়েই অনুমতি না নিয়েই ফিরে আসেন বাড়িতে । এসে দেখেন মেয়ে অনেকটাই সুস্থ হয়ে উঠেছে । মেয়েকে কিছু খাবার খাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে চলে এলেন মণ্ডপে ।
মণ্ডপে এসে দেখেন, বৃদ্ধ কত্তামশাই এখনো নিশ্চল হয়ে তাকিয়ে আছেন মাদুর্গার মুখের দিকে । এবার নতুন একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলেন মৃৎশিল্পী । বৃদ্ধ রমাপদ হাতে ধরে আছেন পুরোনো দিনের একটা সাদাকালো ছবি । কৌতুহলবশে কাছে এসে ছবিটিতে চোখ বুলিয়েই চমকে গেলেন প্রৌঢ় মন্মথ । একটি বছর ছয়েকের কচি মেয়ের ছবি । মায়ের চোখ আঁকছিলেন যখন এই কচি মুখটাই তো বারংবার ফুটে উঠছিলো তাঁর চোখের সামনে !
কি মনে হতে চোখ তুলে তাকালেন নিজেরই হাতে গড়া মায়ের মুখের দিকে । পরমুহূর্তে কত্তামশাইয়ের মতো তিনিও পাথর হয়ে জমে গেলেন সেখানে । কতকাল আগেকার চেনা কচি মুখটাই যেন নিজের অজান্তে কেটে বসিয়েছেন মৃন্ময়ী মায়ের মুখে !