T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সুকন্যা সাহা

ট্রেকার্স হাট
পথ চলতে চলতে হঠাৎ থমকে গেল অরুণাংশু । চোখ কচলে আবার দেখল ভালো করে । নাহ কোনো ভুল নেই। সেই জায়গা , সেই দোকান… রাবাংলা থেকে গতকালই তারা এই ৪২ কিমি দূরের কালুকে নামের ছোট্ট পাহাড়ী জনপদটায় এসে পৌঁছেছে ।পশ্চিম সিকিমের প্রত্যন্ত অঞ্চলের রাস্তা খুব চড়াই উৎরাই … তেমনি এক পাহাড়ী বাঁকে দেখতে পেল দোকানটাকে । সেই একই নাম ট্রেকার্স হাট। সেই একই ছাঁদ । সামনের দিকে একটু ছাউনি মত আর একটা বেঞ্চ পাতা । বেশ কয়েকটা বিস্কুট লজেন্সের বয়াম। সাত পুরোনো চিপসের প্যাকেট । পিছনে একটা ছোট্ট হিটার আর গব গব করে সেদ্ধ হচ্ছে মোমো… তিন থাক ওয়ালা স্টীমার কুকারে … দোকানে সেই বুড়ো তামাং দাজু। সেই চোখ মুখ, মাথায় নেপালি টুপি, কোঁচকানো চামড়া আর প্রায় শ খানেক তাপ্পি মারা রঙচঙে জামা প্যাণ্ট। কুতকুতে চাউনি , অনাবিল হাসি মুখে আর সেই অবিরত ঘাড় নাড়া …
আর কৌতূহল দমন করতে পারল না অরুনাংশু । পাহাড়ী পথে হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে রাকা । ওকে আর দেখাও যাচ্ছে না এখান থেকে।ঢুকেই পড়ল তামাং দাজুর দোকানে । গতবারও সে ঠিক এই সময়টাতেই পাহাড়ে এসেছিল… অবশ্য একা … পাহাড়ের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়ানোটা তার একটা নেশা ।মেঘ নামা পাহাড়ের ঢাল কেমন যেন একটা ঝিম ধরা নেশা জাগায় তার রক্তে । তার টানেই তো এই বার বার ছুটে আসা। দোকানটার পাশেই পাথরের ওপরে কিছু নীল আর হলুদ রঙের পাহাড়ী জংলা ফুল ফুটে আছে … কি যে চমৎকার দেখাচ্ছে ! কিন্তু ওসব দিকে এখন মন নেই অরুণাংশুর । যে করেই হোক এই রহস্য তাকে ভেদ করতেই হবে … খুব ভারিক্কি গলায় দোকানের মধ্যে ঢুকে সে জিজ্ঞেস করল … “সিগ্রেট ?”
তামাং দাজু নিখুঁত ইংরেজীতে জিজ্ঞেস করল… “ব্র্যান্ড ?”
এই বার দাজুর চোখে চোখ রাখে অরুণাংশু… চিবিয়ে চিবিয়ে বলল,” নেভিকাট…”
কিন্তু কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না তামাং দাজুর মুখে … বিনা বাক্যব্যয়ে অরুনাংশুর দিকে এগিয়ে দিল একটা দুধ সাদা নেভিকাট।তাহলে কি লোকে ঠিকই বলে …কোনো কথা স্মৃতিতে থাকে না দাজুর ! কমপ্লিট ডিমনেশিয়া … না হলে অরুণাংশুকে দেখে চিনতে পারল না দাজু ! খুব পুরোনো ঘটনা তো নয়!
ঠিক এক বছর আগের কথা ; এমনি বর্ষাকালে পাহাড়ে এসেছিল অরুনাংশু … পাহাড়ের বর্ষা অরুনাংশুর বরাবরই প্রিয়। পাহাড়ী পথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ঠিক এই বাঁকেই ঝমঝম বৃষ্টি নেমেছিল… মাথা বাঁচাতে ট্রেকার্স হাটের ভিতর ঢুকে পড়েছিল অরুনাংশু ।আর তখনই আলাপ তামাং দাজু আর বিলকিসের সঙ্গে । মাথায় নেপালি টুপি , কোঁচকানো চামড়া আর প্রায় শ খানেক তাপ্পি মারা রঙচঙে জামা প্যান্টের বুড়ো তামাং দাজু আর বিলকিস দাদু নাতনি।
বিলকিসকে দেখেই চোখ আটকে গেছিল অরুণাংশুর … ছয় ছোট্ট চেহারার চটপটে বিলকিসের বিশেষত্ব ছিল তার অদ্ভুত নীল চোখের মণি। একবার দেখে আর চোখ ফেরাতে পারে নি অরুনাংশু।মিষ্টি লাজুক স্বভাবের বিলকিস কথা কম বলছিল ।তার হাত চটপট চলছিল মোমো বানানোয়।কথা বলছিল তামাং দাজু । অরুনাংশু কোথা থেকে এসেছে, কোথায় উঠেছে, সাইট সিনে যাবে নাকি , গেলে কবে যাবে … বার বার কেন এখানে আসে সব খবর নেওয়া হয়ে গেছিল কয়েক মূহূর্তেই ।সরল, হাসিখুশি আত্ম ভোলা তামাং দাজুর সঙ্গে গল্প জুড়ে দিতে বেশীক্ষণ লাগে নি অরুনাংশুর । এমনিতেই
সে বেশ মিশুকে টাইপের ছেলে ।দাজুও নিজের জীবনের গল্প করে যাচ্ছিল অনর্গল। দাজুর একমাত্র ছেলে পূরণ মারা যাওয়ার পর দাদু নাতনিতে মিলে চালাচ্ছে এই ট্রেকার্স হাট। কথায় কথায় বিলকিসের অনেক প্রশংসাও করল দাজু।মাধ্যমিক পাশ বিলকিস বড্ড মিষ্টি আর লাজুক স্বভাবের … আর তার হাতের তৈরী মোমো আর থুকপার
স্বাদ তো অসাধারণ … কালুক বাজারে তাদের একটা ফলের দোকানও আছে ; সকালের দিকে সেটাও দেখাশোনা করে বিলকিসই ।কথা বলতে বলতেই এক প্লেট চিকেন মোমোর অর্ডার দিয়েছিল অরুণাংশু…সত্যিই লা জবাব বিলকিসের হাতের মোমো … ততক্ষনে বৃষ্টিও ধরে এসেছে … ট্রেকার্স হাটের সামনের রাস্তাটা কে যেন জল দিয়ে ধুইয়ে দিয়েছে । পাহাড়ে এই এক বৈশিষ্ট্য … এই বৃষ্টি তো এই রোদ । বৃষ্টি কমতেই বেরিয়ে পড়েছিল অরুনাংশু ট্রেকার্স হাট থেকে
সেদিনের মতো… তবে সেবার কালুকে যতদিন ছিল প্রতিদিনই একবার ঢুঁ মারত ট্রেকার্স হাটে … মোমো খাওয়ার অছিলায় … আসলে নীল নয়না বিলকিস তাকে টানত চুম্বকের মতো …
অনেকটা হেঁটে এসে হাঁফিয়ে পড়েছে রাকা ।একটা পাথরের ওপর বসে জিরিয়ে নিচ্ছে একটু। পায়ে স্পোর্টস শু ।ট্রেকার্স হাটের বেঞ্চিতে বসা অরুণাংশুকে দেখতে পেয়ে ডাকল…” অরুণ …অ্যাই অরুণ …” অরুণাংশুও হাত নেড়ে ডাকল। এখানে চলে এস… ভালো মোমো পাওয়া যায় …
এবারে এসে বিলকিসকে দেখতে পায়নি অরুনাংশু… দাজুকে জিজ্ঞেসও করে নি কিছু ।অন্য কোথাও গেছে বোধহয় কিংবা মার্কেটের ফলের দোকানে … তবে সে নিশ্চিত তামাং দাজু তাকে চিনতে পারে নি । গতবারেই স্থানীয় লোকেদের থেকে শুনেছিল দাজুর কোনো কথা স্মৃতিতে থাকে না ; কমপ্লিট ডিমনেশিয়া …না হলে এত লোক আসে তার দোকানে সব্বার সঙ্গে বকবক করে তাদের হাঁড়ির খবর নেয় অথচ পরে দেখা হলে চিনতে পারে না তাদের কাউকেই … সেবারে বিশ্বাস করে নি অরুনাংশু… কিন্তু এবারে তো হাতে নাতে প্রমাণ পেল …
দোকানের কাছাকাছি এসে অবাক হয়ে যায় রাকা … এইখানে এত সুন্দর একটা দোকান ! ইসসস…
দু প্লেট মোমোর অর্ডার দিয়ে দোকানের বেঞ্চিতে বসে আরাম করে সিগারেট ধরায় অরুনাংশু…রাকা জিজ্ঞেস করে তুমি এখানে আগেও এসেছ না ?
উত্তর দেয় না অরুনাংশু… শুধু তার দুচোখ যেন কাউকে একটা খোঁজে …মোমোর প্লেট দুটো নিয়ে দাজু এগিয়ে এলে আর থাকতে পারে না অরুনাংশু …
“বিলকিস কাঁহা হ্যায় ?”
আশ্চর্য্য হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে দাজু “কৌন বিলকিস?”
“বিলকিস …আপকা পোতি …”
“মেরা কোই পোতি নেহী হ্যায় … ম্যায় ইস দুনিয়া মে বিলকুল আকেলা হুঁ…”
হঠাৎ অট্টহাস্যে ফেটে পড়ে তামাং দাজু। ” সব মর গ্যায়া মেরা সব কোই মর গ্যায়া । ”
হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকে রাকা… বিস্ময় বিহ্বল চোখে একবার তামাং দাজু আর একবার অরুনাংশুর মুখের দিকে তাকিয়ে চাওয়া চাওয়ি করতে থাকে সে …
নাহ আর কোনো সন্দেহই নেই অরুনাংশুর … দাজু বদ্ধ পাগল… ! না হলে বিলকিসের অনুপস্থিতির জন্য সে কি করে বলতে পারে সব কোই মর গ্যায়া ! হয়তো বা বিলকিসকেই সম্পূর্ণ ভুলে গেছে সে !কিন্তু তাই বা কি করে সম্ভব ? এই জটিল রহস্যের জট কিছুতেই খুলতে পারে না অরুনাংশু… বিলকিস তাকে বলেছিল দোকানটাকে ভালোমত সাজিয়ে একটা রেস্টুরেন্ট করতে চায় সে… তার জন্য টাকার দরকার ; অনেক টাকা …
মূহূর্তের মধ্যে পাহাড়ের গা বেয়ে মেঘ নামা বিকেলটা পানসে হয়ে যায় অরুনাংশুর কাছে … অর্ডার দেওয়া মোমোর প্লেট দুটো না ছুঁয়েই মৃদু চাপ দেয় রাকার হাতে বলে,” চল …
ফেরার পথে হতবুদ্ধি রাকা ফিসফিস করে অরুনাংশুকে বলে … লোকটা এক্কেবারে বদ্ধ পাগল না ?
আনমনা অরুনাংশু খালি ধরা গলায় বলে ,”হুঁ”… তার মন তখন সূদূর অতীতে ঘুরপাক খায় । চোখের সামনে একের পর এক ছবির মতো বদলে যেতে থাকে দৃশ্যপট…
সেবারেই একটানা বেশ কয়েকদিন ধরে বৃষ্টি চলছিল উত্তরবঙ্গে। আর কি কপাল অরুনাংশুর ! ঠিক যে সময়টা কালুকে এসেছিল সে সেই সময়টাতেই এমন অঝোর ধারায় বৃষ্টি…এরই মধ্যে একদিন তামাং দাজু আর বিলকিস ঘুরে গেছে অরূনাংশুর রেসোর্টে । পাহাড়ের গায়ে সবুজ চা বাগানে ঘেরা লনে বসে চা পান করে গেছে বিলকিস
অরুনাংশুর সঙ্গে । কথা ছিল কাছাকাছি ট্যুরিস্ট স্পটগুলো বিলকিসের সঙ্গে ঘুরবে অরুনাংশু ।বিলকিস হল অরুনাংশুর লোক্যাল ট্যুরিস্ট গাইড ।সেই মত গাড়ীও ঠিক হয়ে গিয়েছিল।সেই সময়েই ঘটল সেই অপ্রীতিকর ঘটনাটা।টেমি টী গার্ডেনে ঘুরতে ঘুরতে বিলকিসকে কাছে টেনেছিল অরুনাংশু।শরীরে এঁকে দিতে চেয়েছিল ভালোবাসার সীল মোহর। আপাত দৃষ্টিতে শান্ত লাজুক বিলকিসের সেই রুদ্র মূর্তি দেখে চমকে গিয়েছিল অরুনাংশু। রোগা পাতলা ছয় ছোট্ট চেহারার বিলকিস ঘুরিয়ে সপাটে চড় মেরেছিল অরুনাংশুকে…হিস হিস করে বলেছিল, ম্যাঁয় উস কিসম কি লেড়কি নেহী হু সাব… মেরা ভী মাংগেতর হ্যঁয়… অপমানটা হজম হয় নি অরুনাংশুর ।ভিতরে ভিতরে তখন থেকেই ফন্দি আঁটতে থাকে চরম বদলা নেওয়ার…
সুযোগও এসে গিয়েছিল। বিলকিস তার মাংগেতর রৌশন আর অরুনাংশু তিনজনে মিলে একদিন সন্ধ্যেয় একটা ক্যাসিনোতে গিয়েছিল। রৌশন মালখোর ফূর্তিবাজ টাইপের ছেলে … জুয়ার নেশায় একের পর এক পেগ হুইস্কি খেয়ে বেসামাল হয়ে পড়েছিল অচিরেই… আর সেই সুযোগে অরুনাংশুর হাতের মুঠোয় এসে গিয়েছিল বিলকিস … মত্ত বিলকিসকে ঠান্ডা মাথায় পাহাড়ের গা থেকে ফেলে দিতে একটুও হাত কাঁপে নি অরুনাংশুর…
তারপরদিনই খুব ভোরে কালুক ছাড়ে অরুনাংশু …বিলকিসের দেহ খুঁজে পাওয়ার অনেক আগেই…
কলকাতায় ফিরে খুব স্বাভাবিক জীবন যাপন করছিল অরুনাংশু… রাকাকেও এ বিষয়ে বিন্দু বিসর্গ কিছু বলে নি । কালুকের রেসোর্টে আগেরবার যে ফোনটা নিয়ে গিয়েছিল সেই নাম্বারটা ছেড়ে দেয় অরুনাংশু । ভেবেছিল কেউ জানতে পারবে না … খুঁজেও পাবে না কেউ… শুধু তামাং দাজুকে সে ভুল ভেবেছিল…
পরদিন খুব ভোরে রাকার ধাক্কায় ঘুম ভাঙ্গে অরুনাংশুর … অরুণ অ্যাই অরুণ ওঠ… দরজায় পুলিশ। ধড়মড় করে উঠে বসে অরুনাংশু… ঘরে ঢোকেন ইন্সপেক্টর একনাথ মুণ্ডে আর তার সঙ্গে তামাং দাজু! অরুনাংশুকে বিস্মিত করে দিয়ে ভোলাভালা দাজু পরিষ্কার বাংলায় বলে ওঠেন … বিলকিস আপনার কি ক্ষতি করেছিল সাব ? যে এভাবে তাকে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিলেন ? বিলকিস … মেরী বেটী…
হতভম্ব রাকার মুখের ওপর ইন্সপেক্টর মুণ্ডে অরুনাংশুর দিকে তাকিয়ে বলেন, ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট মিঃ অরুনাংশু সেন … ফর দ্য মার্ডার অফ বিলকিস দাজু …