নজরুল ভাবনায় দীর্ঘ কবিতায় সজ্জ্বল দত্ত

লোহা

(শ্রদ্ধা : কাজী নজরুল ইসলাম)

… তারপর আগুন আবিষ্কার
চকমকি ঘষাঘষি
ইড়া পিঙ্গলায় খিদে
মাংসাশীর মাংস বুঝে সুষুম্নাসচল –
ধারালো পাথরখণ্ডে মৃত্যুশব্দ কাছে
ব্রহ্মাণ্ডে বিষের মহরত ।
শরীরে জড়ানো সুতো
জঙ্গল ঢাকছে ,
আড়মোড়া ভেঙে সূর্য
আলোয় গরম বাড়ছে
সমুদ্রে নুন বাড়ছে
কখন যে অতিবেগুনী ছুঁয়ে যাচ্ছে চোখ
চাকা গড়াচ্ছে
ফসল ফলছে
মুদ্রা … সোনা রুপো তামা … রাজা মন্ত্রী … রাজকোষ
মন্দির-মসজিদ গাঁথনি
প্রজার রক্তপাত ।
লোহাগরম ছ্যাঁকা !
কোনপ্রান্তে কোথায় কোন্ জগতে সংসারে
তে-কোণা ব-দ্বীপ চেরা
জরায়ু ফুলেফেঁপে হাজার-লক্ষ ডিগ্রী …

অদ্ভুত অঘটন !
তখনো মৌলবীর আমাকে প্রার্থনা
ঘুমন্ত রাস্তাটুকু লম্বা লম্বা পায়ে আমিও পেরোতে চাই
এতোটা ভাবোনি হিংস্র কেউটে-কালো
ভেতরের কালিঝুলি
এতোটা ফতুর-আত্মা ভাবতেও পারোনি ।
জোয়ান শরীর কেঁপে ছন্দে ছন্দে নীচু
জ্বালাপোড়া যোনীমুখ ,
উনুনে গরম বীর্য জেলী-জেলী গর্ভকেশর ।
কাঁচালোহা ছটফট –
– ” আল্লা , পুরুষ চাই ! ” –
বোঁটাছেঁড়া স্তনকথা ক্ষতচিহ্নে ব্ল্যাকহোল ।
অশুভ অমঙ্গল সংকেত তারপর
বজ্রপাত শিলাবৃষ্টি হিমঠাণ্ডা চরাচর
নিকোনো মাটির ঘরে আজানে লোহাজন্ম
পীরমন্ত্র … শুভসূচনা ।
নাড়ি ছিঁড়ে ঢালুপথে জরায়ু ফাটিয়ে বাইরে
লম্বা লোহার শিক
অনন্ত শূন্যে লাফ … গনগনে লাল আমি
ডাঁশ ডাঁশ লালপিঁপড়ের ঢিবি ছুঁয়ে ঘেঁটে ভেঙেচুরে
( চুলকে টাটকা ঘা )
যত যা পুঁজরক্ত সবটুকু শুষে
এই পবিত্র বিষের রাজ্যে তিনকাল এক করে …

” গাহি সাম্যের গান ”
কার কাঁধে কার হাত হিন্দু-মুসল.. প্রাণ

ধুয়ে যাক শরিয়ত
একই জরায়ু থেকে – লোহার কৈফিয়ত

লোহাপেটা হাড়মাস
যতই আগুন খায় বুক জ্বলে , জ্বলে শ্বাস

বাঁধা টিকি ছিঁড়ে ফেলি
আগুনে লাভায় মাথা শব্দের ঠেলাঠেলি

জড়ো করো জঞ্জাল
মুক্ত-রুদ্ধ দল কলাবৃত্ত কঙ্কাল

খিদেশব্দ কিলবিল
নাড়িপোড়া মাঝরাত মড়ায় অন্ত্যমিল

আগুনে আমিষ পদ
সন্তানে-শয়তানে ফোয়ারা বিলিতি মদ

ডেকচিতে মহাকাল
মাংস শুষছে তেল টগবগে কড়া ঝাল !

আমার ছোট্ট ঘর একদিন বুঝে নেবে গায়ে কোনো মরচে ছিল না । ইঁদুরের সংসারে ঝালাই মেশিনে আমি আগুনের ফুলঝুরি , চুম্বকে ঢুকে পড়ি গোখরো সাপের গর্তে । ঠাকুর্দার বাপের বাপের বাপের হাতের বাজুতে আমি মন্ত্রপুতঃ রাহুর মাদুলি , নাতির নাতির নাতির চওড়া কবজিতে ঝুলছি সাজানো প্রতীক বালা । কোটি কোটি বচ্ছর তীব্র তাপে ফেলে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক ব্লাস্টফারনেস থেকে শুদ্ধ আমায় এনে পৃথিবীর ছাদ ঢালাই … আকাশ পাতাল বায়ু বিন্দু নক্ষত্রলোক দূর থেকে ভেসে আয় —

ঘোর ভাঙে ধীরে ধীরে
মেথর কুলিকামিন ভিখিরি ভ্যানওয়ালা
অনন্ত ছায়াপথে
ঘামলোকে একসাথে আলোয় পেছল গা ।
আদিম সুপ্তক্রোধ চাঁড়ালের হাড় খোঁজে ,
মড়াঘাঁটা তাজা হাড় ।
দগ্ধ হাড়ের মুখ এ’ জন্মে ঘুরে এসে
আমার লোহাকলম
সে বুক সে হাত ছুঁয়ে মাথা ছুঁয়ে চোখ ছুঁয়ে
আলোর কবিতা লেখে ,
রামধনু আলো-ঘাম প্রেমিক মেঘের কথা ।

সৃষ্টি আপন স্থিত স্থিতিমঞ্চে প্রলয় সংকেত
লোহার খাতায় লেখা অনন্ত সবুজ ধানক্ষেত ।

মেঘকাব্যে অস্ত্রাগার অলৌকিকে সমস্ত লৌকিক
শান্তি … শান্ত লোহা আগুনে পুড়তে থাকা শিক ।

কঠিন কঠোর – শেষ ,অস্ত্র গলে জ্যোৎস্নাসাদা মোম
পৃথিবী শিমুল তুলো মাখামাখি ভালোবাসা ওম ।

ভালোবাসা জাদুমন্ত্র : নরক পলাশ-লালে লাল
ইমাম সন্ত সাধুর বকধর্ম মাটিধর্মে কাল ।

গাছে গাছে লাল নীল থোকা থোকা সাদা ফুল
বন্ধ্যা অসাড় মাটি উপচে সোনালী ধান
বৈশাখে কালো মেঘ বৃষ্টিপূর্বাভাস
সেইদিন কাছে আয় ভরাপেটে ভিজি তবে
আবীরে সূর্যোদয়
নাখোদা-অযোধ্যা জুড়ে গাঁথনির খাঁজে খাঁজে
কর্ণিক দিয়ে যদি চটকানো ভাতে ভাত
ভোরের গঙ্গাপারে লোহার ঠাণ্ডাস্নান
হৃদয় ডুবিয়ে জলে লোহামানুষ লোহাকলম
তপ্ত লোহাজন্ম ত্রয়ী –
জাগো নীচু , সম হই ,
খরায় বর্ষাগন্ধ কবিশব্দে ব্রহ্ম ছুঁই
পরজন্ম সোনার : ‘ ছিনু সর্বহারা হবো সর্বজয়ী ‘ ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।