অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ১৩)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

ক্লান্ত দিনের শেষে শালজঙ্গল ঘুমে চুপ
কথা শেষে পড়ে আছে দৃষ্টি বিনিময়
জানার গভীরে কত অজানাও লেগে থাকে
দুচোখের বিস্ময়ে জানি থাকে হারাবার ভয় !

অনেকক্ষণ সন্ধে পেরিয়ে গেছে।শালজঙ্গলের মাথার উপর নেমে এসেছে কাঁপানো ঠান্ডার রাত।মেঘলার বন্ধু অনামিকার বাড়ির ড্রয়িং রুমে ওরা কয়েকজন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছে। ওরা মানে অনামিকা,মেঘলা, শুভব্রত,প্রলয়,উন্মনা আর অমলেন্দু। ঘটমান বর্তমান যখন অনতিঅতীত হয়ে যায়,সেই আনন্দ বেদনার,সেই সন্ধ্যা ও রাতের যুগলবন্দিকে বেঁধে রাখে ঘনবদ্ধ টাটকা স্মৃতি।বসে থাকা সব মানুষগুলোর শূন্য চোখে, সারা দিনের টুকরো টুকরো ছবি।মোবাইলের স্ক্রিনে আর অন্তরের অ্যালবামে।যারা এসেছিল,যারা ভীষণভাবে ছিল,সেইসব তরুণ কবিরা, কয়েকজন প্রাজ্ঞ ও প্রতিষ্ঠিত কবি,সবাই এতক্ষণে নিজের বাড়ির অনেকটা কাছাকাছি চলে গেছে হয়তো। কেউ বাসে,কেউ ট্রেনে । গতকাল এইসময় প্রস্তুতির যে অকুণ্ঠ আয়োজন ছিল,মাত্র চব্বিশ ঘন্টা পরে কোথায় গেল সফলতার জয়ধ্বনি ? একটা সুন্দর সাহিত্য বাসর শেষ করে, সকলের তো গেয়ে ওঠার কথা ছিল– উই শ্যাল ওভারকাম….
কিন্তু তার বদলে,মুখর অতীত ফেলে স্তব্ধ বর্তমানকেই যেন সবাই বেছে নিয়েছে।অমলেন্দু সবার কাছে মার্জনা চেয়ে নিয়ে,ল্যাপটপে কিছু জরুরী সংবাদ পাঠিয়ে দিচ্ছে ওর পত্রিকা অফিসে। কথা ও কন্ঠ যার সম্পদ , সেই মেঘলাও যেন পরীক্ষার হলের স্তব্ধতায় নিজের মধ্যে ডুবে। অনামিকার স্বামী সন্ধের ট্রেনে কলকাতা চলে গেছে। আগামীকাল সকালে ওর হেড অফিসের জরুরি মিটিং আছে। সমবেত নীরবতা ভাঙতে হঠাৎ উদ্যোগী হয়ে উঠলো প্রলয়–এসো তো শুভব্রত, অনামিকাদির রান্নাঘরের একটু খবর নিয়ে আসি।টিভি সিরিয়াল পাগল অনামিকাও যেন এতক্ষণে দম বন্ধ স্তব্ধতা থেকে উৎসারিত আলোর মতো চলকে উঠলো । হ্যাঁ রে উন্মনা , তুই কম কথা বলিস জানি , তবু আজ এরকম পাথরের স্তুপ হয়ে বসে আছিস কেন ? মন খারাপ লাগছে, মেয়ের জন্যে ? উন্মনা যেন কোন অতল থেকে জেগে উঠে জবাব দিল–হ্যাঁ দিদিভাই,তা একটু হচ্ছে। আমার মায়ের শরীরটাতো ভালো না । মেয়েকে ঠিকমতো সামলাতে পারছে তো ? আমাদের গ্রামে অনেক সময় ফোনের টাওয়ার থাকে না । যতক্ষণ না খবর পাচ্ছি…
শুভব্রত আর প্রলয় হৈ হৈ করে কফি আর প্লেটভর্তি ডিমের পাকোড়া নিয়ে ঢুকলো। শুভব্রত উন্মনার সোফার পাশে হাঁটুগেড়ে বসে বললো–কিচ্ছু চিন্তা কোরোনা দিদিভাই , তোমাদের কাছাকাছি আমার এক বন্ধু থাকে।তাকে বলে দিচ্ছি , খোঁজ নিয়ে আমাকে রাতে ফোন করবে । অমলেন্দুর বোধহয় কানে গেল কথাটা।ল্যাপটপের স্ক্রিনে চোখ রেখেই বাঁ হাতের ইশারায় শুভব্রতকে থামিয়ে বললো– ওনার মা’র কাছে তো একটা ফোন আছে।তেমন প্রয়োজন পড়লে তিনি নিজেই ফোন করবেন। এত রাতে কাউকে আর ছোটাছুটি করিওনা । আমি দেখছি কি করা যায়। হঠাৎ উন্মনা চেঁচিয়ে উঠলো–হ্যালো, তোমরা দুজন ঠিক আছো তো ? সারাদিন ব্যস্ততায় কোনো‌ খোঁজ নিতে পারিনি। হ্যালো.. ছোট্ট রাজকুমারী, সারাদিন কোনো দুষ্টুমি করোনি তো ,হ্যালো ,শোনো.. তোমার মামা মাসিরা আমাকে কাল ছাড়বে না, লক্ষ্মী হয়ে থেকো কেমন? আমার যেতে একটু রাত হবে। তোমার জন্যে অনেক নতুন গল্প নিয়ে যাবো।ওদিক থেকে মেঘলা চেঁচিয়ে উঠলো –তোমার মায়ের ব্যাগভর্তি ক্যাডবেরিও থাকবে।উন্মনা স্পিকার অন করে দিলো। তারপর ভিডিও ক্যামেরা অন করতেই ওপারে ভেসে উঠলো আরেকটা স্বপ্ন টলটলে মুখ । প্রলয় দুটো ডিমের পাকোড়া তুলে নিয়ে বললো– আমরা সবাই গরম কফি আর পকোড়া খেতে খেতে তোমার কাছে কিছু শুনবো–গান বা কবিতা। বলো কি শোনাবে ? ছোট্ট মেয়ে করতোয়া , মা আর অন্য সবার মুখগুলো দেখে একটুও না ভেবে বলে উঠলো– রবীন্দ্রনাথের নৌকাযাত্রা শোনাই ? তারপর বয়ে চললো করতোয়ার কবিতা– নৌকাযাত্রা। মেয়েবেলা ছেলেবেলা সব কিছু মিলেমিশে যেন স্বপ্নের আহ্বান — আমি কেবল যাবো একটিবার ,সাতসমুদ্র তেরো নদীর পার। সমবেত হাততালির মধ্যে গাম্ভীর্যের ঘেরাটোপ ফেলে এগিয়ে এলো অমলেন্দু–ও রাজকন্যা,সেই ছোট্টবেলা থেকে এই বুড়ো বয়স পর্যন্ত আমারও নৌকাযাত্রা হয়ে ওঠেনি‌।আমাকে যদি মধুমাঝি বলে ডাকো,তবে আমিই তোমাকে নিয়ে যাবো সাতসমুদ্র তেরো নদীর পার –পেরিয়ে যাবো তিরপুর্ণির ঘাট, পেরিয়ে যাবো তেপান্তরের মাঠ…
মুহূর্তের মধ্যে বিষণ্ণ সন্ধ্যা বদলে গেলো নৌকাযাত্রার গানে গানে…মেঘলা গেয়ে উঠলো , এবং মেঘলার সঙ্গে সবাই মিলে সেই গানে যোগ দিলো– ক্যামেরার ওপ্রান্তে উন্মনার প্রৌঢ়া মা পর্যন্ত গুণগুণ করে উঠলেন সেই গানে , ঝাড়গ্রামের আকাশ বাতাস ক্যামেরার চোখ দিয়ে দেখলো,বাঁকুড়ার প্রত্যন্ত গ্রামে মাঝি মাল্লার পাগল করা গানে দুহাত তুলে নাচছে করতোয়া নামের একটি ছোট্ট মেয়ে–দে দোল দোল দোল , তোল পাল তোল,চল ভাসি সবকিছু ত্যাইগ্যা , মোর পানিতে ঘর বন্দরে আসি তোর লাইগ্যা আআআআ…
‌একসময় ক্যামেরা অফ হয়ে যায়।মেয়ের জন্য উদ্বেগ- আশঙ্কার মেঘ কেটে যেতেই ধীরে ধীরে সুরেলা স্তব্ধতা নেমে আসে। গুমোট ভাবটা সরে যায় নিমেষের মধ্যে। ঝাড়গ্রামের দিগন্তে দিগন্তে আজও যে সব শালজঙ্গল জেগে আছে ,যেন নীরব ভাষায় ওদের ডেকে বলছে–শোনো ,গাছেরা ঘুমিয়ে পড়েছে , জেগে ওঠবার উন্মুখ অপেক্ষায়। ঘুমিয়ে আছে বিস্মিত পলাশ কুঁড়ির প্রতিশ্রুতি। তোমরাও ঘুমিয়ে পড়ো বন্ধু। কেন জানিনা,উন্মনা জানতোই না পলাশের অন্য নাম যে কিংশুক! দূরের গভীর ও কাছের আবছা অরণ্য যেন বলছে–তোমাদের কবিতা যাপন শুনতে শুনতে আমরাও আজ পরিপূর্ণ ও সম্পূর্না। তাই ঘুমিয়ে পড়লাম। কাল মঙ্গলপ্রাতে , সুপ্রভাতে একটা ঝকঝকে টাটা সুমোর ডিগডিগ আওয়াজ ঘুম ভাঙিয়ে দেবে তোমাদের। তোমাদের দলটাকে নিয়ে যাবে ডুলুং নদী, চিল্কিগড় ছুঁয়ে, বেলপাহাড়ির দিগন্ত থেকে দিগন্তে…বাঁশপাহাড়ি ,আমলাশোলের অনাস্বাদিত রোমাঞ্চে। যাবে না প্রিয় বন্ধুদল ? বেলপাহাড়ির নাগরিক জনপদ ছাড়ালেই বিতত-বাংলার অরণ্য নীরবতা এদেশের সেই সব মানুষদের কাছে তোমাদের নিয়ে যাবে, যাঁদের নিয়ে কবি তারাপদ‌ রায় তাঁর দারিদ্র্যরেখা কবিতায় প্রকৃত কবির তীব্র অথচ নিমীলিত প্রতিবাদ এঁকেছেন। আচ্ছা,উন্মনার কানে কানে কে শুনিয়ে গেল এই কথাগুলো ? আসলে, এই শতাব্দীর শুরুতে আমলাশোলে অনাহারে মৃত্যুর ঘটনা আলোয় এসে যে সাড়া ফেলে দিয়েছিলো,আমলাশোলের সেই আকাশ বাতাস যেন আনন্দ বসন্ত সমাগমকে স্তব্ধ করে দিয়ে, বস্তুনিষ্ঠ প্রতিজ্ঞায় কেটে কেটে উচ্চারণ করলো–কাল তোমাদের শুধু পাহাড়,জঙ্গল ,ঝর্ণা ,নদীই দেখাবো না,আমলাশোলের পাহাড় জঙ্গলের গভীরে সেই গ্রামে নিয়ে যাবো , যেখানে মানুষ একদিন অনাহারের যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে , গাছের শিকড় বাকড় খেয়ে চিৎকার করে উঠেছিল–দুটো ভাত দে। যারা দারিদ্র্য জড়িয়ে ঘুম থেকে ওঠে আর দারিদ্র্যকে আলিঙ্গন করে ঘুমোতে যায় ; শুধু বেঁচে থাকাই যাদের কাছে একটা বিস্ময় — পাহাড় জঙ্গলের নিভৃতে সেইসব মানুষের কাছে তোমাদের নিয়ে যাবো।‌ তারা তোমাদের বিশ্বাস করবেনা। তাই কাছে যাবার চেষ্টা না করে দূর থেকেই দেখো। কিছুদিন আগেও ভয়াবহ আতঙ্কে ওসব জায়গায় যাওয়া যেত না। এখন রাস্তাঘাট ভালো হয়েছে।পর্যটকরাও যাচ্ছেন সেখানে।তবে দুঃখ একটাই,পর্যটকরা ক্যামেরার চোখ দিয়ে প্রকৃতিকে দেখেন , হৃদয়ের দৃষ্টি মেলে মানুষকে দেখবার চেষ্টা করেন না।উন্মনার চোখ পড়ে গেল কবি সাংবাদিক প্রলয়ের দিকে। তার চোখের কোলে আর ঠৌঁটের কোণে গুমরে গুমরে উঠছে বেদনার কম্পন। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে প্রলয় বিড়বিড় করে বলে চললো,কোনো কবিতার কয়েকটি অনিবার্য শব্দ ও বাক্য। ল্যাপটপ বন্ধ করে অমলেন্দু ওর পাশে বসে,প্রলয়কে জড়িয়ে ধরে বললো–বন্ধু, তুমি যে কবিতা উচ্চারণ করছো,তোমরা কি জানো তারাপদ রায়ের সেই দারিদ্র্যরেখা কবিতাটি আমাদের অর্থনীতি, সমাজনীতি আর তথাকথিত শিক্ষিত দুনিয়ার মুখোশ একটানে ছিঁড়ে ফেলেছে ! আমি সে কবিতার পুরোটা জানি। কিন্তু এই মুহূর্তে চাইবো,কবি প্রলয়, যে ওই দিগন্তের ভূমিপুত্র হিসেবে তাদের বেদনাকে,সমবেত যন্ত্রণাকে হৃদয় দিয়ে অনুভব করেছে,সেই বলুক এই কবিতাটি।কারণ আমাদের জানা দরকার,শোনা দরকার,বোঝা দরকার শতাব্দীর অন্যতম সেরা এই কবিতাটিকে। আমার প্রিয় কবি প্রলয়–তুমি বলো,আমরা শুনি। বিশেষ করে শেষটুকু।মানে আমি বলতে চাচ্ছি,এই কবিতার শেষেরও শেষটুকু তুমি উচ্চারণ করো। বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি নিয়েও, আধুনিকতার আলোকে আলোকিত হয়েও ,আমি জানি তুমি এখনও তোমার অনুভবের শিকড়-বাকড় আঁকড়ে পড়ে আছো।বলো প্রলয়,প্লিজ বলো।প্রলয় ঠান্ডা কফির শেষটুকু মুখে চালান করে দিয়ে কেমন যেন ঘোরের মধ্যে বলে উঠলো–অমলেন্দুদা, আপনার মতো স্মৃতিশক্তি আমার নেই ; তাই এ কবিতার পুরোটা হয়তো বলতে পারবো‌ না। কিন্তু শেষটুকু বলতে চেষ্টা করতে পারি। অমলেন্দু কেমন যেন অস্থির হয়ে প্রলয়কে ঝাঁকি দিলো–আঃ কবি, মানুষ ও প্রকৃতি ,সমাজ ও দশদিগন্ত উন্মুখ হয়ে আছে এই কবিতা শোনার জন্য।আর কথা না বাড়িয়ে তুমি বলো। তোমাকে বলতেই হবে।মন্ত্রমুগ্ধ ও সম্মোহিত কবি প্রলয় কেটে কেটে উচ্চারণ করলো তারাপদ রায়ের ‘দারিদ্র্যরেখা’র শেষটুকু–

চমৎকার !
আপনাকে ধন্যবাদ,বহু ধন্যবাদ!
আমার গরীবপনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার দারিদ্র্যের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
আমার নিঃস্বতার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ,
আমার বঞ্চনার জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
আমার সর্বহারাত্মের জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
আর সবশেষে ঐ ঝকঝকে লম্বা রেখাটি,
ঐ‌ উজ্জ্বল উপহারটির জন্যে আপনাকে ধন্যবাদ।
#
কিন্তু,
ক্রমশ,
আমার ক্ষুধার অন্ন এখন আরো কমে গেছে,
আমার লজ্জা নিবারণের কাপড় এখন আরো ছিঁড়ে গেছে,
আমার মাথার উপরের আচ্ছাদন আরো সরে গেছে।
#
কিন্তু ধন্যবাদ,
হে প্রগাঢ় হিতৈষী, আপনাকে বহু ধন্যবাদ!

পৃথিবীতে আজও সেই বিরল ক্ষণ রচিত হয়, যখন কথারা ফিরে যায়,যখন নীরবতা বাঙ্ময় হয়ে বলে–মিউজিক, হোয়েন ভয়েজ ডাই,ভাইব্রেটস্ স্টিল ইন মেমোরি…

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।