সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩৫)

সীমানা ছাড়িয়ে
তুই হেরোইনের নেশায় জীবন শেষ করিস না হিরু। বললো, অসীম। আমি বললাম কি করে জানলি তুই,যে ওটা নেশার জিনিস।
—- আমি আমাদের পাড়ায়একজনকে ওই নেশায় মরতে দেখেছি। তখন সকলের আলোচনায় বুঝেছি নেশার মারাত্মক প্রভাব
হিরুকে নিষেধ করতে হবে।
মুখ ঘুরিয়ে দেখা গেলো হিরু পাগলের মতো ছুটছে। একটা দোতলা বাসে চেপে পড়লো হিরু। তারপর ওর দেখা আর কোনোদিন পাইনি। নাটক শুরুতেই শেষের বাজনা বাজিয়ে অনিতা মহাসুখে ঘর করছে বিদেশে।
জয় ভাবছে, আর নিজের মনের সঙ্গে কথা বলে চলেছে।
পরে শুনেছিলো জয় চিরকালের মতো হিরু তাদের ছেড়ে চলে গেছে অচিন দেশে।সেই থেকে জয় মেয়েদের একটু এড়িয়ে চলতো ভয়ে। ভালোবাসার ভয়ে…।
আবার জয়, যার পাল্লায় পরেছে তার কবে যে পরিবর্তন হবে কে জানে। মনে মনে ভাবে অসীমের কথা, জানিস শতকরা আশি ভাগ মানুষ ভালো। তা না হলে পৃথিবী অচল হয়ে পরবে। সে ছেলে হোক কিংবা মেয়ে। আশি শতাংশ মানুষ সৎ মানুষ।
লতিকা বাজারে গেছে দুঘন্টা হয়ে গেছে। এর মধ্যে মেয়ে রুমা চলে এসেছে। মেয়ে বলছে, বাবা, আমি আজ স্কুলে যাবো না।
— ঠিক আছে, তোর মা আসুক বলবি।
—- তুমি একটু বলে দিও
—-বেশ বলে দেবো।
সংসারে কে যে কখন কোন রোলে অভিনয় শুরু করে দেয় বোঝা মুস্কিল। লতিকা সব ব্যাপারে স্বাধীন। তবু সবাইকে বলে বেড়ায়, জয় স্বামী হয়েও তাকে সন্দেহ করে।
জয় সব জানে, শোনে। কিন্তু ঝগড়া এড়িয়ে যায়। সংসারে যার সাথে সব সময় থাকতে হবে তার সাথে ঝগড়া করতে ভালো লাগতো না। তারপর মেয়ে বড়ো হয়েছে।
জয়ের মনে পরছে,তখন বিয়ে হয়েছে এক বছরও হয়নি। লতিকা বাপের বাড়িতে গেছে।
জয় দেখা করতে গিয়ে দেখে, লতিকা ঘরে কার সঙ্গে কথা বলছে। অন্ধকার ঘর। শ্বশুর, শ্বাশুড়ি অন্য ঘরে। জয় আর শ্বশুর বাড়িতে ঢোকে নি। লোকজন ডেকে এনে দেখে, দুজনে বিছানায় শুয়ে গল্প করছে। তারপর অনেক জল গড়িয়ে গেছে কিন্তু লতিকার স্বভাবের পরিবর্তন হয় নি। পরপুরুষের সঙ্গে বিছানায় গল্প করার অনুমোদন সেদিন গ্রামের লোকে দেয়নি। তার বেশি অসভ্য কথা ভাবতে জয়ের রুচিতে বাধে।
লতিকা এখনও মেয়েকে বাড়িতে রেখে প্রতিবেশিদের বাড়িতে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে। পুরুষ মানুষের সঙ্গে কথা বলতে তার বেশি ভালোলাগে। জয় বাধা দিয়েছে অনেকবার। কিন্তু ও কাজে ব্যস্ত থাকে। বেশি কিছু বলতে পারে না।
মেয়ে বড়ো হয়েছে। এবার তারও শখ আছে, আহ্লাদ আছে। মেয়ে বলে, বাবা আমি কার্তিক লড়াই দেখতে কাটোয়া যাবো। জয় বলেছিলো, নিশ্চয় যাবে।কার্তিক লড়াই দেখতে মেয়েটা কাটোয়া মামার বাড়ি চলে গেলো।
জয় বলছে, মেয়েটা নেই বাড়িটা ফাঁকা লাগছে। লতিকা বলে, বড়ো হয়েছে। পঁচিশ বছরের হলো। এবার বিয়ে দিয়ে দাও।
জয় বললো, তোমার তো অনেক জানা শোনা। সবাইকে বলে দেখতে পারো।
জয়ের মেয়ে রুমা বাবার মতো হয়েছে। সে সাদা সিধা। কোনোরকম চালাকি তার মধ্যে নেই। কার্তিক লড়াই দেখতে গিয়ে অনি র সঙ্গে তার প্রেম হয়েছে।অনিকে তার খুব ভালো লেগেছে। সে তাকে বিয়ে করতে চায়।রুমা বাড়ি এসেই বাবাকে বলছে,বাবা কাটোয়ার অনি বলে একটি ছেলেকে আমার ভালো লেগেছে।আমি তাকে বিয়ে করতে চাই।
—- ঠিক আছে তোর মাকে বলবো।
জয় রাজি। ছেলে স্কুলের শিক্ষক। কিন্তু লতিকা বলছে, আমি যেখানে ছেলে দেখেছি তাদের বড়ো ব্যাবসা। অল্টো গাড়ি আছে। ওখানেই বিয়ে হবে।কিন্তু মেয়ে বেঁকে বসেছে।
বেশ কয়েকদিন ধরে মেয়ের বিয়ে নিয়ে অশান্তি হচ্ছে জয়ের বাড়িতে।
জয় বললো, খুব স্পর্শকাতর ব্যাপার, একটু সাবধানে ম্যানেজ করবে,যদি কিছু করে বসে।
লতিকা বললো, যা করে করবে। আমি ওই ছেলের সাথেই বিয়ের ব্যবস্থা করবো।
যে ছেলেটিকে রুমা ভালোবাসে সে একটা বেসরকারি ফার্মের মালিক । তার নাম হারু। অপরের বিপদে আপদে এক ডাকে সকলে হারুর হেল্প পেয়ে থাকে। বন্ধুরা সকলেই হারুর বিয়ের ব্যবস্থা শুরু করে দিয়েছে। হারুর বন্ধুর লিষ্টে পুলিশ অফিসার থেকে আরম্ভ করে অল্টো গাড়ির মালিক লিপিকার পছন্দ করা জামাই অবধি আছে। হারু এখনও রুমার মায়ের অপছন্দের কথা জানে না। সমাজসেবার জন্য অনেক বড়ো বড়ো পুরস্কার হারু পেয়েছে। পুরস্কারের টাকাও সমাজসেবার কাজে লাগায়। কত বেকার ছেলে তার দয়ায় কাজ করে খায় তার হিসাব রাখে না হারু। মায়ের হারাধন ওরফে হারু রত্নধন হয়ে সমাজের ভালো কাজ করে।
রুমার মন খুব খারাপ। সাত আটদিন হারুর সাথে দেখা হয় নি। কিছুতেই মা রাজী হচ্ছে না। সে ভাবছে, বেঁচে থেকে লাভ নেই। কিন্তু বাবা আছে। তাকে কেন দুঃখ দেবো, এই কথা ভেবে সবকিছু ঈশ্বরের ইচ্ছার উপর ছেড়ে দিলো নিজের ভবিষ্যৎ ।
এদিকে হারু ভাবছে, রুমা কেন দেখা করছে না। মোবাইলে অন্য কথা বলে এড়িয়ে যাচ্ছে।
হয়তো লজ্জা পাচ্ছে। বিয়ের দিন ঠিক হবে তাই।লাজুক হয় ভদ্র স্বভাবের মেয়েরা।
বন্ধুরা বলছে, হয়, হয় এরকম হয়। তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে। হঠাৎ ওরা খবর পেলো অল্টো গাড়ির মালিকটি রোড অ্যাক্সিডেন্ট করে রাস্তায় পরে আছে। সঙ্গে সঙ্গে হারু বন্ধু বান্ধব ডেকে চলে গেলো স্পটে। এখন রাত সাতটা বাজে। মহুকুমা হাসপাতালে ভর্তি করে দেওয়া হলো। সে যাত্রা বেঁচে গেলো সে।
রুমার মা লতিকা এসেছে রুমাকে সঙ্গে করে,আহতকে দেখতে। তারা ফলমূল নিয়ে এসেছে। মেয়েকে নিয়ে ঘরে ঢুকেই দেখে,হারু তার বন্ধুদের নিয়ে বসে আছে। পুলিশএসেছে। লিপিকা শুনছে, পুলিশ জিজ্ঞাসা করছে, গাড়ির মালিক কে? শুয়ে শুয়ে আহত ছেলেটি বলছে,হারু সরকার। পুলিশ বলছে, তিনি কোথায়?
হারু হাত তুলে বললো,এই যে স্যার আমি।
পুলিশটি বললেন, ও আপনি। সমাজসেবক নামেই আপনাকে চিনি। নমস্কার নেবেন।আজকে আপনার নাম জেনে খুশি হলাম। নো প্রবলেম।
—-কি যে বলেন। মানুষ হয়ে মানুষেরএকটু সেবা করার চেষ্টা করি বন্ধুদের নিয়ে। এরাই আমার সব।
পুলিশ তাদের কাজ করে চলে গেলো।
লতিকা সব শুনেছে। হারুর মাথায় হাত বুলিয়ে বললো, তোমার মা রত্নগর্ভা। তোমার জন্যই অনেকে প্রাণ ফিরে পায়। রুমা দেখলো ওর মায়ের চোখটা জলে চিক চিক করছে। তারপর লিপিকা ফলমূল হারুর হাতে দিয়ে বললো,বাবা তোমার মা বাবাকে ব’লো আমরা দেখা করবো। হারু ঘাড় নেড়ে সায় দিলো।রুমার হাল্কা হাসিতে হারু নিশ্চিন্ত হলো।