ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৫৫)

সুমনা ও জাদু পালক

দুধরাজ সুমনা ও রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা কে নিয়ে চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে পৌঁছে গেল জোড়া ছাতিম গাছের থেকে একটু দূরে । ওখানে পৌঁছে দুধরাজ ধীরে ধীরে ডানা গুটিয়ে নিচে মরুভূমির বালির উপরে দাঁড়ালো খুব সন্তর্পণে, যাতে সুমনা বা রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার কোনরকম ঝাঁকুনি না লাগে।
সুমনা অবাক হয়ে দেখল, রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা তড়িঘড়ি করে দুধরাজের পিঠ থেকে নেমে একরকম প্রায ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেল ওই জোড়া ছাতিম গাছের কাছে। এই ছাতিম গাছ দুটো কি রকম অদ্ভুত যেন। একেতো এরকম ধুধু মরুভূমির দেশে যে ছাতিম গাছ হতে পারে,সেটা ভাবাই যায় না । তার উপরে গাছ দুটো পাশাপাশি যেন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খুব ভালো করে না দেখলে বোঝা যায় না যে দুটো গাছ আলাদা। তারপর আবার ডালপালাগুলো একটার সঙ্গে একটা এমনভাবে জড়িয়ে আছে, দেখে মনে হচ্ছে যেন, একে অপরের হাত ধরে আছে।
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা ছাতিম গাছ দুটোর কাছে পৌঁছে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল গাছ দুটোকে। সুমনা বিস্মিত হয়ে দেখল, চন্দ্রকান্তা গাছ দুটোকে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদছে। আর কি আশ্চর্য ওর চোখের জল গাছ দুটোর গায়ে লাগার সঙ্গে সঙ্গে গাছগুলোর ডালপালা পাতার মধ্যে প্রচন্ড জোরে আলোড়ন হতে শুরু করলো।
মনে হল, কেউবা বুঝি প্রচন্ড জোরে নাড়াচ্ছে গাছ দুটোকে।
সুমনা কৌতুহলী হলো। সে দুধরাজের পিঠ থেকে নেমে পায়ে পায়ে এগিয়ে গেল চন্দ্রকান্তার কাছে। কাছে গিয়ে আরো বিস্মিত হল। এতক্ষণ গাছের পাতাগুলো শুধু জোরে জোরে আন্দোলিত হচ্ছিল। এখন প্রত্যেকটা পাতা থেকে টুপটাপ করে জল পড়তে শুরু করল চন্দ্রকান্তার মাথায়। কিন্তু একি অদ্ভুত কান্ড। চন্দ্রকান্তার প্রায় কাছাকাছি দাঁড়িয়ে থাকলেও সুমনার মাথায় এক ফোঁটা জলও ঝরে পড়ছে না।
কিছুক্ষণ পরে জল ঝরে পড়া শেষ হয়ে গেল। একটা অদ্ভুত আওয়াজ যেন ভেসে আসতে শুরু করল গাছগুলোর ভেতর থেকে। খুব স্পষ্ট কোন শব্দ নয়, ফিসফিসানি আওয়াজ আর দীর্ঘশ্বাস ছাড়ার শব্দ।
সুমনা এবার গিয়ে চন্দ্রকান্তার পিঠে হাত রাখলো। ও চমকে পিছন ফিরে তাকালো। তখনো ওর দু চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু কপোল বেয়ে ঝরে পড়ছে মরুভূমির শুষ্ক বালুকণায়।
সুমনা খুব মৃদু স্বরে জিজ্ঞাসা করল, তুমি কাঁদছো কেন বন্ধু চন্দ্রকান্তা?
—— বন্ধু রাজকুমারী রত্নমালা, এই জোড়া ছাতিম গাছ ই হল আমার মা-বাবা। আগেই বলেছি না, জাদুকর হূডু আমার বাবার রাজ্যটাকে মন্ত্র বলে মরুভূমি বানিয়ে দিয়েছে। রাজ্যের সব লোকজনকে হয় কাঁটা গাছ,নয় ঝোপঝাড়,নয় কাঁটাওয়ালা খেজুর গাছে বদলে দিয়েছে। শুধু আমার মা আর বাবাকে ওসব কিছুই করতে পারেনি। কারণ আমার বাবা মহাদেবের একনিষ্ঠ ভক্ত আর আমার মা দেবী দুর্গার ভক্ত। বহুবার চেষ্টা করেও আমার মা-বাবাকে কাঁটা গাছ বা খেজুর গাছে পরিবর্তিত করতে না পেরে রেগে উঠেছিল হুডূ। রাজ্যের সব লোকজনকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল। তখন আমার মা ও বাবা প্রজাদের রক্ষা করার জন্য স্বেচ্ছায় গাছ হতে রাজি হয়েছিল, কিন্তু অন্য কোন গাছ নয়, ওঁরা স্বেচ্ছায় ছাতিম গাছের রূপ নিয়েছিল। আমার মা যে দেশের রাজকুমারী ছিলেন, সে দেশে প্রচুর ছাতিম গাছ ছিল ।আর ছাতিম ফুল মার খুব প্রিয়। মা তাই ছাতিম গাছ হতে চেয়েছিল।আর বাবা মা হাতে হাত রেখে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছাতিম গাছে পরিণত হয়েছিল।তাই আজো ওরা গাছ হয়েও ওভাবেই দাঁড়িয়ে আছে।
সুমনা চন্দ্রকান্তার পিঠে হাত দিয়ে বলল, চলো রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা,এবার হূডুর রাজ্যে যাই আমরা।
ওকে পরাজিত করে তোমার মা বাবা এবং তোমার রাজ্যকে আবার আগের রূপে ফিরিয়ে
দিই।
—– চলো বন্ধু।
আবার যাত্রা হলো শুরু। দুধরাজের পিঠে চেপে।
একদিন এক রাত উড়ে দুধরাজ চন্দ্রকান্তার বাবার রাজ্যের সীমানা অতিক্রম করল।
দিনের আলো ফুটে উঠতেই ওরা দেখতে পেল
সামনে বিশাল উঁচু নীল রঙের প্রাচীর।
কিন্তু প্রাচীরটার কাছাকাছি হতেই একটা ঝাঁঝালো গন্ধ ভেসে এলো ওদের নাকে। আরেকটু এগোতেই নীল রঙের ধোঁয়া ঘিরে ধরল ওদের। ওদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছিল। চোখ জ্বালা করছিল। মাথা ঘুরছিল। ওরা সবিস্ময়ে দেখল ,যেটাকে ওরা প্রাচীর ভাবছিল সেটা আসলে একটা পুরু নীল রংয়ের ধোঁয়ার স্তর।
দুধরাজ জোর করে ওই নীল ধোঁয়ার স্তর অতিক্রম করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে নিচে নেমে এল।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।