গল্পেরা জোনাকি তে রীতা পাল (ছোট গল্প সিরিজ)

ত্যাগি
আমার বয়স তখন বছর দশেক হবে। পড়া হয়ে গেছে বিভূতিভূষণের চাঁদের পাহাড়। আমরা সপরিবারে ঘাটশিলা ভ্রমণে গিয়েছিলাম। ঠাকুমা,বাবা-মা,কাকু-কাকিমা, আমরা তিন ভাইবোন,সবাই। প্রথমেই আমরা বিভূতিভূষণের বাড়ি পৌঁছালাম। এইখানে বসেই তিনি আরণ্যক,চাঁদের পাহাড় লিখেছিলেন। বাড়িটাকে সংগ্রহশালা করা হয়েছে। লেখকের পরিহিত জামা,ধুতি,বই, ব্যবহৃত জিনিস পত্র ইত্যাদি আছে। কিন্তু আমাদের মন তো পড়ে আছে চাঁদের পাহাড়ের দিকে। সেই ফুলডুংরি পাহাড়। পাহাড় কোথায় একটা ছোট্ট টিলা। তা হোক,আমরা তিন ভাইবোন দৌড়ে উঠে গেলাম টিলার চূড়ায়—-
সবকিছু ছবির মতো সাজানো লাগছিল। বুরুডি ড্যাম্প,ধারাগিরি ফলস দেখে সুবর্ণরেখা নদীর ধারে আসলাম বিকালে সূর্যাস্ত দেখব বলে। রাত মোহনা থেকে অসাধারণ লাগছিল সুবর্ণরেখা নদী। ঠাকুমা রামকৃষ্ণ মঠের দিক্ষিত। তাই আমাদের থাকার ব্যবস্থা মঠেই করা হয়েছে। সন্ধ্যায় ঠাকুমা সন্ধ্যারতি দেখতে গেছেন। আমরা ভাই বোনেরা চোর পুলিশ খেলছি। হঠাৎ পাশে ঘর থেকে ঠাম্মার কান্নার আওয়াজ ভেসে এল—
কি হয়েছে আমরা ভাই-বোনরা ঠিক বুঝতে পারছিলাম না! ঠাকুমা কেঁদে চলেছেন। বাবা,কাকা ঠাম্মা কে সান্তনা দিছেন কিন্তু ঠাম্মার একই কথা,“ওই আমার সমু।”
সবার মুখ থমথমে। রাতে মায়ের মুখে শুনলাম – বাবা-কাকার বড় ভাই মানে আমাদের জ্যেঠু,ঠাম্মার সমু,বছর কুড়ি আগে বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলেন। দাদু অনেক চেষ্টা করেও তার খোঁজ পাননি। আজ সন্ধ্যায় মঠে একজন সন্ন্যাসীকে দেখে ঠাকুমার সন্দেহ হয়। তিনি বলেন ওটাই আমাদের হারিয়ে যাওয়া জ্যেঠু। সন্ন্যাসী স্বীকার করেননি। কিন্তু মা কি ছেলেকে চিনতে ভুল করবে? মায়ের মন,একবার দেখতে চাইছেন। কিন্তু সেই মহারাজ আর দোর খুলছেন না। মঠের প্রধান মহারাজের কানে কথাটা গেল। তিনি ঠাম্মাকে ডেকে পাঠালেন। সুন্দর ভাবে বোঝালেল, “ সংসারের মায়া ত্যাগ করে তবেই সন্ন্যাসী হতে হয়। সবাই সেটা পারে না। উনার সাধনায় বাধা দেবেন না। সবই মায়ার খেলা। উনি এখন ভগবানে নিবেদিত প্রাণ। আপনি নতুন করে আর বাঁধনে বাঁধবেন না। ভেবে দেখুন কুড়ি বছরের শোকে অনেকটাই পলি জমে গেছে।” ঠাম্মা একবার দেখতে চাইলেন। কিন্তু উনি ততক্ষণে অন্য মঠে রওনা দিয়েছেন।
পরের দিন ট্রেনে উঠে দেখেছিলাম ঠাকুমার দু’চোখ তখনও কাউকে খুঁজে চলেছে।