সাপ্তাহিক টুকরো হাসিতে কল্যাণ গঙ্গোপাধ্যায় – ঊনপঞ্চাশ

টুকরো হাসি-ঊনপঞ্চাশ

চক্ষুরত্ন মহারত্ন

আমাদের ভবাদা মানে ভবতারণ দত্ত কোনোদিন আপনাদের বাড়িতে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে গিয়েছিলেন? যদি গিয়ে থাকেন তবে কোনো কথা হবে না। কেননা ভবাদার কাণ্ড তো তাহলে অবশ্যই দেখেছে।
যদি ভবাদা না গিয়ে থাকেন তাহলে অনেক কথা আছে। ভবাদাকে যারা নিমন্ত্রণ করেননি ও তাঁর কাণ্ড দেখেননি তাঁদের জন্য কিছু বলা।
নিমন্ত্রণ বাড়িতে গেলে একেবারে চুপচাপ বসে থাকা যায় না। চুপ করে থেকে শুধু খাওয়া-দাওয়া করে চলে এলে লোকজন ভাবতে পারে, এ আবার কেমন লোক! এইজন্য ভবাদা সৌজন্য রক্ষায় কথা বলেন। বলতেই থাকেন। অফিসের কারও বৌভাত, সেখানে গিয়ে ভবাদা সবার সঙ্গে অল্প-বিস্তর কথা বলে শেষ অবধি নতুন বউয়ের বাবাকে পাকড়াও করে তার কোথায় জন্ম তা থেকে শুরু করে যাবতীয় বৃত্তান্ত জেনে তবে ক্ষান্ত হন। এমন জানা তিনি জানেন যে অনেক গোপন কথা সেই মানুষটির স্ত্রী, পুত্র,কন্যা এমনকি জামাইও কোনোদিন জানতে পারবে না। এটা, ওটা,সেটা জানার আগ্রহের যেন কোনো শেষ নেই ভবাদার। শেষ নেই কথা বলারও।
খাওয়া-দাওয়া হয়ে গেছে এবার ফেরার পালা। সেদিনের বৌভাতের নায়ক অফিসের পুলিনকে ভবাদা জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তাহলে ভায়া অফিসে কবে জয়েন করছো?’
পুলিন চট করে জবাব দিতে পারল না। বিয়ে করার কি কম ধকল? সব মিটিয়ে কবে যে যাবে সেটা পরে ভাবা যাবে। হঠাৎ করে কি জবাব দেওয়া যায়?
আমরা ভবাদাকে টেনে নিয়ে এলাম। বললাম, ‘এখন চলুন দেখি।পুলিন তো আর বিয়ে করে বউ নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে না, আর চাকরিটাও ছেড়ে দিচ্ছে না। অফিসটাও মনে হচ্ছে বহুদিন থাকবে। পুলিনও একদিন নিশ্চয়ই জয়েন করবে। সেদিন তো দেখতেই পাবেন।’ ভবাদাকে বাগে আনতে আমাদেরও বাধ্য হয়ে কম কথাটা বেশি করেই বলতে হল!
এমনই হয়। অনুষ্ঠান বাড়ি ছাড়বার সময় ক্লাবের, আড্ডার বন্ধুরা জানতে চায়, ‘কবে আসছিস?’ যারা এক গ্লাসের বন্ধু তারা তো পারলে তখনই সঙ্গে করে নিয়ে যাবার চেষ্টা করে।
ভবাদা সভা ,সমিতি, বাসে, ট্রামে যেখানেই থাকুন না কেন চুপ করে থাকতে পারেন না। কথা তাঁকে বলতেই হবে।
বাসে একটি বাচ্চা ছেলে মায়ের কোলে বসে খুব কাঁদছিল। মা অনেক চেষ্টা করে কিছুতেই কান্না থামাতে পারছিল না। রেগে বাচ্চাটিকে বার বার বলছিল, ‘আজ বাড়ি চল তোমার হবে। বাবাকে বলে তোমায় মজা দেখাব। পিঠে দু’চার ঘা না পড়লে তুমি সাইজে আসবে না।’ একই কথা বার বার বলে যাচ্ছে।
ভবাদা বলল, ‘ওর বাবা কি খুব রগচটা মারকুটে লোক?’
‘কেন বলুন তো?’
‘এই যে বললেন বাড়িতে গেলে ওর বাবাকে দিয়ে ছেলের পিঠে দু’চার ঘা দেওয়াবেন।’
‘না না মারবে না। এমনি ভয় দেখাচ্ছি।’ মহিলার দন্ত বিকশিত।
‘মারবে না অথচ বাবার নাম করে ভয় দেখাচ্ছেন! এটা কি ঠিক শিক্ষা হচ্ছে?’
ভবাদার কথা শুনে বাচ্চাটির মা চটে গেল। বলল, ‘আপনি ফালতু এত ফটর ফটর করছেন কেন? কে আপনি?’
আমি তাড়াতাড়ি বাচ্চাটির মাকে বললাম, ‘উনি কে সেটা বোঝাতে গেলে অনেক সময় লাগবে। আবার কোনোদিন দেখা হলে তখন বলব।’
বাস থামিয়ে ভবাদাকে নিয়ে নেমে পড়লাম।
একটা অনুষ্ঠান থেকে ভবাদা আর আমি ফিরছি। মেট্রোর ভরসায় আড্ডা দিতে গিয়ে একটু রাত হল। স্টেশনে গিয়ে শুনি মেট্রোর চাকায় পিষ্ট হয়ে একজন স্বর্গে যাবার চেষ্টা করে সফল হয়েছে। রাস্তায় নেমে এলাম। চারিদিকে তাকিয়ে মনে হল জনসমুদ্র বুঝি একেই বলে। একটাও বাসে আমরা উঠতে পারছিলাম না। ভবাদা চটে ফায়ার। দেখলাম ওই ভিড়ের মধ্যে ভবাদা কানে মন্ত্র দেওয়ার মতো জনে জনে বোঝাতে শুরু করেছেন মেট্রোর চাকায় আরামে মরার উপকারিতা। বলেই যাচ্ছে।
আটকাতে গেলাম। বললেন, ‘এই মহান কাজটা আমাকে করতে দে। শ’দুয়েক লোককে যদি বোঝাতে পারি আর তাতে যদি কাজ হয় তাহলে দেখবি এরপরে রাস্তায় হাঁটবার সময় একটু হালকা বোধ করবি।’ ভবাদার এই সমাজসেবা কিছুতেই থামাতে পারলাম না।
এদিকে রাত বাড়ছে। একটা বাসেও উঠতে পারছি না। যখন রাত এগারোটা তখন ভবাদাকে নিয়ে কোনোরকমে একটা বাসে ঠেসে উঠলাম। ভিড়ের চাপে এমন অবস্থা দেখলাম ভবাদার তাতে কোনো হেলদোল নেই। পাশের লোকটিকে বোঝাচ্ছেন কিভাবে অন্যের পায়ের উপর না দাঁড়িয়ে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়।
আর একদিন রাতের বাসে আমাদের সামনে এসে দু’টি ছেলে মেয়ে বক বকম শুরু করল। ছেলেটি মেয়েটিকে বাস থেকে নামতে বলছে। মেয়েটি রাজি হচ্ছে না। বলছে, ‘গত দু’দিন রাত এগারোটায় বাড়ি ফিরেছি। আমার মা রাত করে বাড়ি ফেরা একদম পছন্দ করে না। মা আমাদের ভাই বোনদের খুব কড়া শাসনে রেখেছে। ছোটোবেলা থেকেই দেখেছি আমাদের বাড়িতে একটা ডিসিপ্লিন আছে। মা আমাকে ফোন করে কোথায় আছি কেমন আছি খোঁজ নেয়।’ এই রকম আরও নানান কথা।
ভবাদা আর চুপ করে থাকতে পারলেন না। বললেন, ‘শোনো মেয়ে, রাত এখন এগারোটা বাজতে চলল। মা এখনও যখন খোঁজ নেয়নি তখন মাঝরাতের আগে মনে হয় ফোন-ঠোন করবে না। তোমরা নেমে যাও। একটু বকবকানির হাত থেকে রেহাই পাই।’
মেয়েটি কটমট করে তাকাল ভবাদার দিকে। বলল, ‘কি অসভ্য লোকরে বাবা। অন্যের কথা শোনে।’
ভবাদা বললেন, ‘ কান তো আর চোখ না যে, ইচ্ছে করলেই বন্ধ করে ফেলব।’
মেয়েটি খুব রাগ দেখিয়ে ছেলেটির হাত ধরে ওই রাতে বাস থেকে নেমে গেল।
রমেশের বাবা মারা গেছেন। শ্রাদ্ধের নিমন্ত্রণ করেছে আমাদের। যাওয়ার ইচ্ছে ছিল না। শোকগ্রস্থ মুখ নিয়ে কেউ আমাদের জিজ্ঞাসা করবে আমরা ঠিকমতো খাচ্ছি তো? রান্না কেমন হয়েছে? এসব শুনতে ভালো লাগে না। এদিকে না গেলে রমেশ খুব কষ্ট পাবে। ভাববে তার এই অসময়ে অফিসের কেউ পাশে রইলাম না। অতএব যেতেই হল। ডায়মন্ডহারবার লাইনে বেশ কিছু স্টেশন পেছনে ফেলে একটা স্টেশনে নামলাম। স্টেশন থেকে অনেকটা পথ রিক্সা করে গেলাম। রমেশের বাড়ি যেতে গেলে এরপরেও আরও অনেকটা পথা হেঁটে যেতে হবে। নিতাই সঙ্গে না থাকলে হয়ত রমেশের বাড়ি চিনতে পারতাম না।
ভবাদাকে দেখে মনে হল বেশ খুশিতেই আছেন। কত বছর বাদে ধানক্ষেতে আলের উপর দিয়ে যাচ্ছেন। এইসব বলচিলেন আর ঘন ঘন পুলকিত হচ্ছিলেন। অবাক হয়ে বলছিলেন, ‘রমেশ এতদূর থেকে কলকাতার অফিসে যাতায়াত করে!’
আমিও মনে মনে একই কথা ভাবছিলাম। আমরা যাওয়াতে রমেশ খুশি হল।
খাওয়া-দাওয়ার পরে যখন ফিরে আসব তখন রমেশ এগিয়ে এল। ভাবলাম এই বুঝি ভবাদা রমেশের কাছে জানতে চাইবেন রমেশ কবে অফিসে জয়েন করবে। কী আশ্চর্য! তা হল না। ভবাদা রমেশের ন্যাড়া মাথার দিকে খানিকক্ষণ বিহ্বল হয়ে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন, ‘ন্যাড়া হয়েছ কেন?
‘বাবা মারা গেছেন তাই।’
‘ওহো তাই বলো। তা তিনি কোথায় তাঁকে তো দেখতে পাচ্ছি না।’
রমেশ কেমন হকচকিয়ে গেল। বুঝলাম ভবাদাকে কথায় পেয়েছে।
কাছে গিয়ে বললাম, ‘তিনি আর ফিরবেন না। স্বর্গলোকে গেছেন।’ ভবাদার কথার তোড় থামাবার জন্য বললাম, ‘এবার চলুন। এই লাইনে একটা ট্রেন চলে গেলে আবার এক ঘন্টার আগে মনে হয় আসবে না।’
ভবাদার আমার কথা শুনতে বয়ে গেছে। রমেশকে বললেন, ‘তোমার বাবার কি হয়েছিল?’
রমেশ বলল, ‘টানা বর্ষার জলে আমাদের ক্ষেতের সব ধান জলের তলায় থেকে নষ্ট হয়ে গেছে। বাবা ওই অবস্থা দেখে হা-হুতাশ করতে করতে সেখানেই বসে পড়ল।’
‘তারপর?’ ভবাদা জানতে চাইলেন। বললেন, ‘বসলে তো আর কেউ মরে না। তবে ছোটোবেলা থেকে শুনে আসছি লোকে বসতে পারলে নাকি শুতে চায়।’
রমেশ অবাক হয়ে তাকাল ভবাদার দিকে। বলল, ‘আপনি ঠিকই বলেছেন। বাবা শুয়েই পড়েছিল। অত ক্ষতি হল আমাদের। বাবা বার বার আত্মহত্যার কথা বলছিল। মহাজনের টাকা কি করে শোধ দেবে। তোলার টাকা না দিতে পারলে তো সন্ত্রাসের চোটে বাড়ি ছাড়া হতে হবে। এইসব ভেবে ক্ষেতের জলের উপর শুয়েই আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদছিল।’
‘তারপর? ভবাদা উত্তেজিত হয়ে জানতে চাইল।
তখনই জলের মধ্যে একটা বিষাক্ত সাপ বাবাকে ছোবল দিল। হাসপাতালে নিয়ে গেলাম। বাঁচাতেপারলাম না।’
‘হায় হায়। কি সাংঘাতিক।’ ভবাদা আরও উত্তেজিত। বলল, ‘তা কোথায় ছোবল দিয়েছিল?’
রমেশ বলল, ‘চোখের একটু উপরে। ভুরুর কাছে।’
‘চোখের উপরে ছোবল দিতে পারেনি তাহলে।’ ভবাদা যেন খুব নিশ্চিন্ত হলেন। বললেন চোখের উপরে ছোবল দিলে উনি মারাও যেতে পারতেন। খুব বাঁচা বেঁচে গেছেন। চক্ষু রত্ন মহা রত্ন।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।